সংকট কি ঘনীভূত হচ্ছে

আপডেট : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৭ এএম

সরকারবিরোধী এক দফা আন্দোলনের ঘোষণা, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সারের সংকট নিয়ে উত্তেজনা ও আশঙ্কা, সংসদে উত্তপ্ত বিতর্ক, রাস্তায় আন্দোলনে হুমকি-ধমকি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আর দ্রব্যমূল্য নিয়ে জনঅসন্তোষের মধ্যে যে কথাটি প্রবলভাবে উচ্চারিত হচ্ছে তা হলো, কোন পথে যাচ্ছে দেশ? কী হবে ভবিষ্যতে? গণঅভ্যুত্থানে যে আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা কি ক্ষয়ে যাচ্ছে? রাজনীতি কি সংসদ থেকে সংঘাতের দিকে গড়াচ্ছে? সংসদে উত্তপ্ত আলোচনা রাজপথে উত্তাপ তৈরি করবে। সংসদে পরস্পর পরস্পরকে প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় এমনকি পরস্পর গালাগাল করার মতো ঘটনা ঘটছে যা রাজনীতির মাঠে উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তুলছে। রাজনীতির এই অনিশ্চয়তার পাশাপাশি প্রতিদিন পত্রিকার পাতা খুললে প্রথমে নজর পড়ে কোন কোন এলাকায় গ্যাস থাকবে না, কতক্ষণ লোডশেডিং হবে, সারের দাবিতে

কৃষকরা কোথায় বিক্ষোভ করেছে, গুদাম ভেঙে সার নিয়ে গেছে, কোথায় অস্বাভাবিক হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে এগুলোর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে হামে সংক্রমণ আর মৃত্যুর সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যাওয়া, শিক্ষা-চিকিৎসার বেহাল দশা ও চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা। নারীর ওপর নিপীড়ন আর মাদ্রাসায় শিশু নির্যাতন, প্রবল আতঙ্ক ছড়াচ্ছে দেশে। যখন নিজেদের জীবনে এসব ঘটনা ঘটে, তখন হাহাকার করা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। বেদনা আর বিক্ষোভে মানুষ ভাবতে থাকে এসব হচ্ছে কী?    

দেশে সংকটের অনেক বিষয় থাকলেও, সব সংকট যেন কেন্দ্রীভূত হয়ে উঠছে বিদ্যুৎ-গ্যাস আর সার সংকটে। পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন বিদ্যুৎ চাহিদা স্বাভাবিক সময়ে সাড়ে ১১ হাজার থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াট, অতিরিক্ত গরমে সেই চাহিদা বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ থেকে সাড়ে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু প্রতিদিন বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৩-১৪ হাজার মেগাওয়াট। ঘাটতি থাকছে আড়াই হাজার মেগাওয়াটের বেশি। এই তথ্য সাধারণ মানুষ, বিশেষত ছোট শহর ও গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে কোনো তাৎপর্য বহন করে না। তারা দেখছেন, দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না, কারখানায় উৎপাদন বন্ধ, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে দফায় দফায় লোডশেডিং করা হচ্ছে। ছোটখাটো কারখানা অচল হওয়ার উপক্রম, কবে মুক্তি মিলবে সংকট থেকে সেটাই আলোচনার বিষয়। 

বিদ্যুৎ নিয়ে সংকট আকস্মিক বা অপ্রত্যাশিত নয়। দীর্ঘদিনের ভুল পরিকল্পনা, দুর্নীতি আর অবহেলার ফল এই সংকট। বিশ^ পরিস্থিতির কিছুটা প্রভাব আছে আর আছে সরকারের ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়ের অভাব। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশকে মূলত প্রাকৃতিক গ্যাস, জ্বালানি তেল, কয়লা ও সোলার এনার্জির ওপর নির্ভর করতে হয়। বর্তমানে বাংলাদেশে মোট বিদ্যুতের ৫১ শতাংশ উৎপাদন হয় প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, ২৬ শতাংশ উৎপাদন হয় ফার্নেস অয়েল থেকে ও বাকি অংশ উৎপাদন হয় অন্যান্য উৎস থেকে। যদিও বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও সহজলভ্য জ্বালানি হলো প্রাকৃতিক গ্যাস। বাংলাদেশের বিদ্যুতের ৮০ শতাংশ উৎপাদন হতো প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে, সংকটের কারণে বর্তমানে তা কমে ৫১ শতাংশে নেমেছে। এর অন্যতম প্রধান কারণ পেট্রোবাংলা নতুন কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করার উদ্যোগ না নেওয়া এবং আবিষ্কৃত গ্যাস ক্ষেত্রের গ্যাস উত্তোলনে পদক্ষেপ না নিয়ে আমদানির ওপর নির্ভর করা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস- এলএনজি) বাংলাদেশে ব্যবহার হয়। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গত পাঁচ-ছয় বছরে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্য দুই থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টার্মিনাল সংক্রান্ত জটিলতা। এক্সিলারেট এবং সামিট এই দুই টার্মিনালের মাধ্যমে সর্বোচ্চ ১১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা গেলেও এলএনজি কিনতে না পারা এবং টার্মিনালের ত্রুটি গ্যাস সংকটকে আরও তীব্র করেছে। তা ছাড়া কলকারখানা বৃদ্ধি, বাসাবাড়িতে বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধি, বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতির ব্যবহার ইত্যাদি কারণে প্রতি বছর বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুৎ উৎপাদন সে তুলনায় বৃদ্ধি পায়নি। বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু পূর্ণ সক্ষমতা তো ব্যবহার করা যায় না। অন্তত চাহিদা মেটানর মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলেও তো জ্বালানি লাগবে। গ্যাস, তেল, কয়লা সবই আমদানি করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়। আমদানিনির্ভর জ্বালানি সরবরাহ যে কত বিপদ তৈরি করে, তা হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে দেশের জনগণ।  ফলে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির খুব দ্রুত উন্নতি হবে তা মনে হচ্ছে না। সাময়িকভাবে সংকট মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করতে হলে কী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার সেই আলোচনা জরুরি। 

বিদ্যুতের সংকট যেমন আশঙ্কার জন্ম দিচ্ছে, তেমনি আরেকটি সংকট তীব্র হয়ে উঠছে। বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রধান খাদ্য ভাত, এর সঙ্গে গম, ভুট্টা, সবজি, ফল, মাছ, মাংস উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন, বিপণন সব কিছুর সঙ্গেই জ্বালানি যুক্ত। এক্ষেত্রে সারের প্রয়োজন সবচেয়ে তীব্র। সার সংকট হলে আতঙ্ক ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে সার মজুদের মোট পরিমাণ ৫১ দশমিক ৭১ লাখ টন। হিসাব অনুযায়ী চাহিদা মেটানোর পরও ১৫ দশমিক ৮৪ লাখ টন সার উদ্বৃত্ত থাকার কথা। সার নিয়ে এক আলোচনায় প্রতিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছেন, দেশে পর্যাপ্ত সার উৎপাদন, আমদানি ও মজুদ রয়েছে। তাহলে সংকট কেন? সংকট তাহলে ব্যবস্থাপনায়। প্রতি ইউনিয়নে তিনজন করে সারের ডিলার নিয়োগ করার কথা। অতীত সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া অনেক পরিবেশক (ডিলার) এখনো বহাল রয়েছে, আবার অনেকে পলাতক। প্রায় বিশ হাজারের মতো ডিলারের মধ্যে এখন প্রায় তিন হাজার ৭৫৯টি সারের ডিলার পয়েন্ট শূন্য। যারা আছেন তাদের বিরুদ্ধে মজুদ ও দুর্নীতির অভিযোগ আছে। বিক্ষুব্ধ হয়ে কৃষকরা হামলা এবং লুটপাট করার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছে। অতীতের অভিজ্ঞতা কিন্তু ভালো নয়। জনজীবনের সংকটে বিরক্ত মানুষ রাজনৈতিক বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। ফলে রাজনীতির মাঠ সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে এ শঙ্কা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ছে। বিরোধী দলের লংমার্চ এবং তা নিয়ে উত্তেজনার পারদ চড়েছে অনেকখানি। চট্টগ্রাম লংমার্চের পর আরও চারটি লংমার্চের পরিকল্পনা আছে তাদের। ছয় দফা দাবিকে এক দফায় রূপান্তরিত করার ঘোষণা যেমন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে, তেমনি ডিসেম্বরে আন্দোলন তীব্র হবে, এই কথাটা রাজনীতিতে নানা আলোচনার খোরাক সৃষ্টি করেছে। রাজনীতির উত্তাপের মধ্যে নীরবে দুটো ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। তার একটি হলো আত্মহত্যা অন্যটি শিক্ষার মানের অবনমন ও পরীক্ষায় কাক্সিক্ষত ফল লাভে ব্যর্থতা। সমাজে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে। নানা বয়সের মানুষের মধ্যে এ প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৫ বছরে আত্মহত্যা করেছেন ৭৬ হাজার ৩৬১ জন। অর্থাৎ বছরে গড়ে ১৫ হাজারের বেশি মানুষ আত্মহত্যা করছেন। ২০২৫ সালের হিসেবে শুধু শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে ৪০০ জনের বেশি। এ এক ভয়ানক বিপদের সংকেত।

অন্যদিকে ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় চাকরিতে নিয়োগের জন্য মনোনয়ন পেয়েছেন মোট ১ হাজার ৫২১ জন। উত্তীর্ণদের মধ্যে ১ হাজার ৩২০ জনকে ক্যাডার ও ২০১ জনকে নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। ৩ হাজার ৪৮৭টি ক্যাডার এবং ২০১টি নন-ক্যাডার পদে ৪৭তম বিসিএসের  ব্যবস্থা করেছিল পিএসসি। এই  বিসিএসে প্রথমবারের মতো আবেদনের বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ করা হয়। আবেদন করেছিল তিন লাখ ৭৪ হাজার ৭৪৭ জন। যোগ্য প্রার্থী পাওয়া গেল না বলে প্রায় ২ হাজার পদ খালি থেকে গেল। একদিকে আত্মহত্যা, অন্যদিকে অকৃতকার্যতা দুটোই বিপজ্জনক দেশের জন্য। রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশ এখন এক সংকটে। একদিকে ইরান যুদ্ধের পরিস্থিতি, মার্কিনিদের নানা তৎপরতা, মক্কা জোট, হরমুজ প্রণালি নিয়ে সংকট ও তেল সরবরাহ, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অর্থনৈতিক, সামরিক পরিস্থিতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, মিয়ানমারের ভূমিকা, বাংলাদেশের চীনের সঙ্গে সম্পর্ক এক জটিল পরিস্থিতির জন্ম দিচ্ছে। এ সময়ে তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, আইনশৃঙ্খলার অবনতি, কারখানা বন্ধ ও বেকারত্ব সরকারের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

অর্থনৈতিক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে, বিশ্বব্যাপী তেলের দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য নতুন সংকট তৈরি করছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি জটিলতার নানা মাত্রা তৈরি করবে। দেশ যখন বিভিন্ন ধরনের সংকটে, তখন গণভোটের রায় বাস্তবায়ন সংবিধান সংস্কারের দাবিতে বিরোধী দলের আন্দোলন সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। ইতিমধ্যেই নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য কর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি করছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে শক্তি পরীক্ষার পাশাপাশি আন্দোলন যদি এক দফার দিকে ধাবিত হয়, তাহলে রাজনীতির মাঠে কি সহিংসতা ফিরে আসবে? সহিংস রাজনীতির আশঙ্কা  যেমন বাড়ছে, তেমনি সংকটের তীব্রতা মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। কারণ উত্তেজনার মধ্যে কোন পক্ষ যে স্বার্থসিদ্ধি করবে তা বোঝা মুশকিল। কিন্তু জনগণ যে সংকটে থাকবে সেটা সুনিশ্চিত।

লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত