উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড হাইগেট আসনে টানা চতুর্থবারের মতো বিজয়ী হয়েছেন বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি টিউলিপ সিদ্দিক। কনজারভেটিভ পার্টির ডন উইলিয়ামসকে প্রায় ১৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে হারিয়েছেন তিনি।
এবার নির্বাচনে টিউলিপসহ ৩৪ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক ভোটে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এর মধ্যে লেবার পার্টির প্রার্থী হয়েছিলেন আটজন। তাদের মধ্যে টিউলিপসহ জয় পেয়েছেন চারজন। অন্য তিনজন হলেন রুশনারা আলী, রূপা হক এবং আফসানা বেগম। তারা চারজনই আগের বছর জয়ী হয়েছিলেন। তবে প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের এমপি হওয়া টিউলিপের চতুর্থ রুশনারা আলী জিতেছেন টানা পঞ্চমবারের মতো। এর আগে রূপা হক তিনবার এবং আফসানা একবার নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বিবিসি জানাচ্ছে, গত বৃহস্পতিবার দিনভর ভোটগ্রহণের পর গভীর রাতে আসা ফলাফলে দেখা যায়, লেবার পার্টির প্রার্থী টিউলিপ ২৩ হাজার ৪৩২ ভোট (৪৮.৩ শতাংশ) ভোট পেয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ডন উইলিয়ামস পেয়েছেন ৮ হাজার ৪৬২ ভোট (১৭.৪ শতাংশ)। আর গ্রিন পার্টির লরনা রাসেল পেয়েছেন ৬ হাজার ৫৩০ ভোট (১৩.৭ শতাংশ)।
অন্যদিকে পঞ্চমবারের মতো জয় পাওয়া রুশনারা আলী টাওয়ার হ্যামলেটসের বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসন থেকে মোট ভোট পেয়েছেন ১৫ হাজার ৮৯৭টি। তার নিকটতম স্বতন্ত্র প্রার্থী আজমল মাশরুর পেয়েছেন ১৪ হাজার ২০৭ ভোট।
পশ্চিম লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন রূপা হক। তিন মোট গণনাকৃত ভোটের ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ পেয়েছেন। আর পূর্ব লন্ডনের পপলার অ্যান্ড লাইমহাউজ আসন থেকে জয়লাভ করেছেন আফসানা বেগম। তবে তার ভোটের সংখ্যা বা হার জানাতে পারেনি বিবিসি।
গতকাল জয়ের প্রতিক্রিয়ায় টিউলিপ সিদ্দিক বলেন, সবাইকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আপনাদের দোয়ায় আমি চতুর্থবার নির্বাচিত হলাম। আমাদের বাংলাদেশি কমিউনিটি আমাকে সবসময় সাপোর্ট করে। আমি খুব গ্রেটফুল, এবারও ওনারা আমাকে সাপোর্ট করেছেন।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার মেয়ে টিউলিপ ২০১৫ সালে লেবার পার্টি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জয়ী হন। পরের দফায় ২০১৭ সালের নির্বাচনে তিনি পুনর্নির্বাচিত হন। এরপর নির্ধারিত সময়ের তিন বছর আগেই ২০১৯ সালের শেষে যুক্তরাজ্যে সাধারণ নির্বাচন হয়। তাতে কনজারভেটিভ পার্টির জনি লুককে ১৪ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে হারান টিউলিপ।
এর আগে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিরোধী দল লেবার পার্টির এমপি হিসেবে ছায়া সরকারে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করা টিউলিপ এবার লেবার সরকারের মন্ত্রী হতে পারেন বলেও জোর আলোচনা আছে।
একদিকে পারিবারিক পরিচয়, অন্যদিকে লন্ডনের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে প্রার্থিতার কারণে টিউলিপ সবসময়ই ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। ৪১ বছর বয়সী টিউলিপ সিদ্দিককে পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণেই অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর ছোট মেয়ে শেখ রেহানা ও শফিক সিদ্দিকীর মেয়ে টিউলিপ লন্ডনের মিচামে জন্মগ্রহণ করেন। টিউলিপের শৈশব কেটেছে বাংলাদেশ, ভারত ও সিঙ্গাপুরে। লন্ডনের কিংস কলেজ থেকে পলিটিকস, পলিসি ও গভর্মেন্ট বিষয়ে তার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি রয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল গ্রেটার লন্ডন এবং সেভ দ্য চিলড্রেনের সঙ্গে কাজ করেন টিউলিপ, যিনি মাত্র ১৬ বছর বয়সে লেবার পার্টির সদস্য হন। ২০১০ সালে ক্যামডেন কাউন্সিলে প্রথম বাঙালি নারী কাউন্সিলর নির্বাচিত হন টিউলিপ। ২০১৩ সালের জুলাইয়ে স্থানীয় পার্টির সদস্যদের ভোটে টিউলিপ তৎকালীন হ্যাম্পস্টেড অ্যান্ড কিলবার্ন আসন থেকে লেবার পার্টির হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার টিকিট পান।
এদিকে তার দলের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রার্থীদের নিয়ে তিনি বলেন, আমি চাই যে, আমাদের আরও তিনটি বোন যে আছে রূপা, রুশনারা, আফসানা সবাই যেন জয়ী হয়, আমরা সবাই যেন লেবার গভর্নমেন্টে সার্ভ করতে পারি।
টিউলিপের প্রত্যাশামতোই ওই তিনজন জয় পেয়েছেন। পঞ্চমবারের মতো জয় পেয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রুশনারা আলী। লন্ডনের বাংলাদেশি অধ্যুষিত টাওয়ার হ্যামলেটসের বেথনাল গ্রিন অ্যান্ড বো আসনে ২০১০ সাল থেকে এর আগে টানা চারবার এমপি নির্বাচিত হন তিনি। ২০১০ থেকে আন্তর্জাতিক উন্নয়নবিষয়ক ছায়ামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন রুশনারা আলী। এরপর তিনি ২০১৩ সালের অক্টোবরে ছায়া শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত হন।
রুশনারা আলীর জন্ম বাংলাদেশের সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার ভুরকি গ্রামে। ছোটবেলায় মা-বাবার সঙ্গে লন্ডনে যান তিনি। তিনি অক্সফোর্ডের সেন্ট জনস কলেজ থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
টিউলিপ সিদ্দিক ও রুশনারা আলীর পর যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রূপা হক এবং আফসানা বেগমেরও জয়ের খবর পাওয়া গেছে। এর আগে রূপা তিনবার এবং আফসানা একবার নির্বাচিত হয়েছিলেন। তারা চারজনই বিজয়ী দল লেবার পার্টির হয়ে নির্বাচনে লড়েছেন।
ব্রিটিশ সরকারের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে পশ্চিম লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসনে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন রূপা হক। তিনি মোট গণনাকৃত ভোটের ৪৬ দশমিক ৮ শতাংশ পেয়েছেন। লেবার পার্টির মনোনয়নে ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো এমপি নির্বাচিত হন রূপা এরপর টানা তিনবার তিনি এমপি নির্বাচিত হয়েছেন। এবারও লেবার পার্টির টিকিটেই জয়লাভ করেছেন।
২০১৬ সালের অক্টোবরে লেবার পার্টির ছায়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পান রূপা হক। তাকে সর্বদলীয় সংসদীয় মিউজিক গ্রুপের ভাইস চেয়ার এবং ক্রসরেলের সর্বদলীয় সংসদীয় পদে নিযুক্ত করা হয়েছিল। আর পূর্ব লন্ডনের পপলার অ্যান্ড লাইমহাউজ আসন থেকে লেবার পার্টির মনোনয়নে এবারের নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন আফসানা বেগম।