চালকের আসনে হেলপার, ট্রাকে পিষ্ট ৬ প্রাণ

দিনাজপুরে বেপরোয়া গতির একটি ট্রাকের সঙ্গে ঘটা আলাদা দুটি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে শিশুসহ ছয়জন। এ সময় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন। তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা। গতকাল শুক্রবার সকালে দিনাজপুর-গোবিন্দগঞ্জ আঞ্চলিক সড়কে সদর উপজেলার শশরা ইউনিয়নের চকরামপুর ও জালিয়াপাড়া এলাকায় দুর্ঘটনা দুটি ঘটে। দুর্ঘটনার সময় ট্রাকটি চালকের সহকারী (হেলপার) চালাচ্ছিলেন বলে জানা গেছে।

এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত সময়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ৯ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাবনার ঈশ্বরদীতে প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশের গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পাঁচ বন্ধু নিহত হন। এ ঘটনায় আহত আরও দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

দিনাজপুরের দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন ট্রাকের চালক ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার মিত্রপট্টি গ্রামের মৃত সুরা মিয়ার ছেলে হাসু মিয়া (২৮), নাবিল পরিবহনের বাসের সুপারভাইজার দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার সেতাবগঞ্জ মিলরোড এলাকার মৃত লক্ষণ বাহাদুরের ছেলে রাজেশ বাহাদুর (৩০), বাসটির যাত্রী পীরগঞ্জ উপজেলার দানেশ আলীর ছেলে মোহাম্মদ আলী (৫২), বোচাগঞ্জ উপজেলার জাহিদের মেয়ে বিভা (১০), চিরিরবন্দর উপজেলার খোচনা গ্রামের মমিনুলের পাঁচ মাসের মেয়ে সায়মা মেহনাজ এবং ভ্যানচালক সদর উপজেলার বিষ্ণুপুর গ্রামের স্বদেশ রায় (২৩)।

জানা গেছে, গতকাল সকাল ৬টার দিকে চকরামপুর গ্রামে ঢাকা থেকে রানীশংকৈলগামী নাবিল পরিবহনের একটি বাসের সঙ্গে বিপরীতমুখী আম বোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলে ট্রাকের চালক হাসু ও বাসের সুপারভাইজার রাজেশ নিহত হন। আহতদের উদ্ধার করে দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সায়মা, বিভা ও মোহাম্মদ মারা যান। আহত ২৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এর আগে চকরামপুর থেকে এক কিলোমিটার পূর্বে জালিয়াপাড়া এলাকায় ট্রাকটি ধান বোঝাই একটি ভ্যানকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে ভ্যানচালক স্বদেশ রায় গুরুতর আহত হন। এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বেলা ১১টায় মারা যান তিনি।

জানা গেছে, ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল থেকে আমবোঝাই ট্রাকটি ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। বৃহস্পতিবার রাত ৩টায় রানীশংকৈল থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে আসে। কিন্তু চালক হাসু মিয়া ট্রাকটি চালানোর জন্য হেলপার কাউসার আলীকে দায়িত্ব দেন।

দিনাজপুরের পুলিশ সুপার শাহ ইফতেখার আহমেদ বলেন, ‘দুর্ঘটনাটি ঘটার পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ আমরা জানতে পেরেছি। এর মধ্যে অন্যতম চালকের আসনে হেলপারকে বসানো হয়েছিল এবং হেলপারের আসনে চালক বসে ছিল। গাড়িটি বেপরোয়া গতিতে চলছিল বলে আমরা জানতে পেরেছি।’

এই দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জানে আলমকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

পাবনার ঈশ্বরদীর দুর্ঘটনায় নিহতরা হলেন ঈশ্বরদীর দাশুড়িয়া ইউনিয়নের আজমনগর গ্রামের রেজাউল হোসেনের ছেলে জিহাদ (১৭), কবির আনোয়ারের ছেলে বিজয় (২৩), ইলিয়াস হোসেনের ছেলে শিশির (১৮), মাসুম হোসেনের ছেলে সিফাত (১৭) ও ভাড়ইমারী গ্রামের ওয়াজ আলীর ছেলে শাওন (১৫)। আহতরা হলেন একই গ্রামের জেটুর ছেলে শাহেদ (১৬) ও সুমন আলীর ছেলে নাঈম (১৭)। বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে ঈশ্বরদী-পাবনা মহাসড়কের দাশুড়িয়ায় পাবনা সুগার মিলের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

স্বজন ও স্থানীয়রা জানান, নিহতদের মধ্যে বিজয় হোসেন ঢাকার একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানির প্রাইভেট কার চালাতেন। ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে এসে সেই গাড়িতে আরও ছয় বন্ধুকে নিয়ে ঘুরতে বের হন। পথে পাবনা সুগার মিলের সামনে প্রাইভেট কারটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি গাছের সঙ্গে সজোরে ধাক্কা লাগে। এতে প্রাইভেট কারটি দুমড়ে-মুচড়ে গেলে ঘটনাস্থলেই গাড়িতে থাকা জিহাদ, বিজয় ও শিশির নিহত হন। আহত চারজনকে উদ্ধার করে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সিফাত ও শাওনের মৃত্যু হয়। শাহেদ ও নাঈমের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ বন্ধু নিহত হওয়ার ঘটনায় এলাকায় শোকের মাতম চলছে। গতকাল বাদ জুমা নিহত চার বন্ধু জিহাদ, বিজয়, শিশির ও সিফাতের জানাজা দাশুড়িয়া ইউনিয়নের আজমনগর কেন্দ্রীয় মসজিদ মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাজারো মানুষ অংশগ্রহণ করেন। অন্যদিকে একই সময় ভাড়ইমারী গ্রামের শাওনের জানাজা ভাড়ইমারী সরদারপাড়া কেন্দ্রীয় কবরস্থানসংলগ্ন মাঠে হয়। সেখানেও শত শত মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার বগাদিয়ায় কাভার্ড ভ্যানের চাপায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা আরোহী ভাই-বোন নিহত হয়েছে। নিহতরা হলেন মো. ইয়াছিন (১৭) ও বিউটি আক্তার (২৪)। তারা উপজেলার বজরা ইউনিয়নের বগাদিয়া গ্রামের মৃত বশির উল্যার সন্তান। গতকাল দুপুরের দিকে উপজেলার বেগমগঞ্জ-সোনাইমুড়ী সড়কের বগাদিয়া উত্তর ব্রিজ সংলগ্ন মদিনা মসজিদের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

জানা গেছে, নিহত বিউটি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। সকালে ছোট ভাই ইয়াছিনকে নিয়ে ডাক্তার দেখাতে সোনাইমুড়ী বাজারে যান। বেলা পৌনে ১টার দিকে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাযোগে ভাই-বোন বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন। অটোরিকশাটি বেগমগঞ্জ-সোনাইমুড়ী সড়কের বগাদিয়া উত্তর ব্রিজের কাছে পৌঁছালে পেছনে না দেখে আকস্মিক অটোরিকশাচালক রিকশাটি বাম দিক থেকে ডান দিকের সড়কে ঢুকিয়ে দেন। এ সময় পেছনে থাকা বেগমগঞ্জগামী কাভার্ভ ভ্যান তাদের চাপা দেয়।

খাগড়াছড়ির মানিকছড়িতে চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি সড়কে গরমছড়ি এলাকার বাসের ধাক্কায় ওষুধ কোম্পানির বিক্রয় প্রতিনিধি মোটরসাইকেলচালক সুমেত চাকমা নিহত হয়েছেন। তিনি রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলার ৩ নম্বর ঘাগড়া ইউনিয়নের ছোটনাভাঙ্গা গ্রামের অরুণ কুমার চাকমার ছেলে। গতকাল বেলা ২টার দিকে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

ইজিবাইকের ধাক্কায় আরাফাত হোসেন (৭) নামে এক মাদ্রাসাশিক্ষার্থী মৃত্যু হয়েছে। গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টার দিক যশোরের মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ-পুলেরহাট সড়কের কোদলাপাড়া মাদ্রাসা মোড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত আরাফাত কোদলাপাড়া গ্রামের মনিরুল ইসলাম মিস্ত্রির ছেলে।

সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি।