যোদ্ধা-চিকিৎসক থেকে এখন ইরানের প্রেসিডেন্ট

কট্টর রক্ষণশীল সাইদ জালিলিকে হারিয়ে ইরানের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত মাসুদ পেজেশকিয়ান। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভির বরাতে সিএনএন জানিয়েছে, শুক্রবার দ্বিতীয় দফার ভোটগ্রহণ শেষে সাড়ে তিন কোটি ভোট গণনা করা হয়েছে। এর মধ্যে পেজেশকিয়ান পেয়েছেন ১ কোটি ৬৩ লাখ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সাইদ জালিলি পেয়েছেন ১ কোটি ৩৫ লাখ ভোট। তিনি ইরানের ১৪তম প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটির নবম প্রেসিডেন্ট হচ্ছেন।

দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, শুক্রবারের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাওয়ায় পেজেশকিয়ান ইরানের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন।

গত মে মাসে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর নতুন নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়। ২৮ জুন প্রথম দফার নির্বাচনে কোনো প্রার্থী সংগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এগিয়ে থাকা দুই প্রার্থী পেজেশকিয়ান ও জালিলির মধ্যে থেকে একজনকে বেছে নিতে শুক্রবার দ্বিতীয় দফা ভোট হয়। প্রথম দফা নির্বাচনে ভোট পড়ার হার ছিল ৪০ শতাংশ, যা ইরানের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। তবে এ দফায় ভোট পড়ার হার ৪৯ দশমিক ৮ শতাংশ।

ভোটের ফলাফলে সাবেক হৃদরোগ চিকিৎসক পেজেশকিয়ানের জয়ের খবর আসতে থাকায় রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে তার সমর্থকদের উৎসবে মেতে উঠতে দেখা দেছে সামাজিক মাধ্যমে আসা বিভিন্ন ভিডিওতে। ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, তরুণ সমর্থকরা পথে পথে নেচে-গেয়ে আনন্দ করছেন, অনেককে উচ্চ শব্দে হর্ণ বাজিয়ে এবং পেজেশকিয়ানের নির্বাচনী সবুজ পতাকা নেড়ে গাড়ি চালাতেও দেখা গেছে।

ইরানের কুখ্যাত নীতি পুলিশের সমালোচক হিসেবে পরিচিত সাবেক হৃদরোগ সার্জন পেজেশকিয়ান ঐক্য এবং সংহতির পাশাপাশি বিশ্বের সঙ্গে ইরানের দূরত্ব ঘোচানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আলোচনায় আসেন।

তিনি ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি নবায়নে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সঙ্গে নতুন করে গঠনমূলক আলোচনা শুরু করার কথাও বলেছেন। ওই চুক্তি অনুযায়ী পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিলের বিনিময়ে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণে সম্মত হয়েছিল।

অন্যদিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাইদ জালিলি ছিলেন স্থিতিশীলতার পক্ষে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সমর্থক জালিলি সবসময়ই দেশটির ধর্মীয় গোষ্ঠীর শক্ত সমর্থন পেয়েছেন। পশ্চিমাদের কঠোর সমালোচক জালিলি পারমাণবিক চুক্তি নবায়নেরও বিরোধী।

প্রাথমিক বিভিন্ন জরিপে ধারণা করা হয়েছিল, প্রথম দফার নির্বাচনের চেয়ে বেশি মানুষ শুক্রবার দ্বিতীয় দফায় ভোট দেবেন। প্রথম দফায় যারা ভোট দেননি, ভোটারদের এমন বড় একটি অংশ জালিলির প্রেসিডেন্ট হওয়া ঠেকাতে দ্বিতীয় দফায় পেজেশকিয়ানকে ভোট দিতে উৎসাহী হয়ে উঠেছিলেন। এই ভোটারদের শঙ্কা ছিল, জালিলি প্রেসিডেন্ট হলে ইরানের সঙ্গে বহির্বিশ্বের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হবে এবং তিনি আরও নিষেধাজ্ঞা ও বিচ্ছিন্নতা ছাড়া ইরানকে আর কিছুই দিতে পারবেন না।

মাসুদ পেজেশকিয়ানের জন্ম ১৯৫৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ইরানের উত্তরপশ্চিমাঞ্চলীয় পশ্চিম আজারবাইজান প্রদেশের মাহাবাদ শহরে। হাইস্কুল শেষে প্রথম ডিপ্লোমা অর্জনের পর পেজেশকিয়ান সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। তার পোস্টিং হয় ইরানের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলীয় শহর জাবোলে। এখানে থাকাকালেই তিনি প্রকৃতি বিজ্ঞানে দ্বিতীয় ডিপ্লোমা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৬ সালে তাব্রিজ মেডিকেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

পেজেশকিয়ান এই বিশ্ববিদ্যালয়ে তার পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং জেনারেল সার্জারির বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। আশির দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নেন ও চিকিৎসক হিসেবে কাজ করেন। যুদ্ধক্ষেত্রে চিকিৎসাকর্মীদের মোতায়েনের দায়িত্ব ছিল তার।

১৯৯৩ সালে তিনি ইরান মেডিকেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কার্ডিয়াক সার্জারির বিশেষজ্ঞ হিসেবে স্বীকৃতি পান। পরে তিনি হার্ট সার্জারির বিশেষজ্ঞ হয়ে ওঠেন। তিনি পাঁচ বছর তাব্রিজ মেডিকেল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে দায়িত্বপালন করেন।

১৯৯৪ সালে এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী ও এক সন্তান হারান। পরে আর বিয়ে করেননি। দুই ছেলে ও অপর এক মেয়েকে নিয়েই থাকেন তিনি। ইরানের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির প্রশাসনে ২০০১ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্বপালন করেন।

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের অষ্টম পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো আইন পরিষদ মজলিশের সদস্য হন। এরপর থেকে আইনপ্রণেতা হিসেবে বিভিন্ন পার্লামেন্টে ছিলেন তিনি। তিনি সংখ্যালঘু আজেরি সম্প্রদায়ের সদস্য হিসেবে নিজ সম্প্রদায়ের মানুষের অধিকার নিয়ে সোচ্চার।

দশম পার্লামেন্টে তিনি ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বপালন করেন। চলতি বছরের প্রথম দিকে সর্বশেষ পার্লামেন্ট নির্বাচনেও তিনি মজলিশের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন পূর্ব আজারবাইজানের প্রাদেশিক রাজধানী তাব্রিজ থেকে।

এর আগে দুবার তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রথমবার ২০১৩ সালে ইরানের সাংবিধানিক কাউন্সিলের বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে প্রয়াত আলি আকবার হাশেমি রাফসানজানির পক্ষে নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেন।

দ্বিতীয় বার ২০২১ সালে আবার প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেবার সাংবিধানিক কাউন্সিল তাকে মনোনয়ন দেয়নি।

চলতি বছর মাসুদ পেজেশকিয়ান ন্যায়বিচার নামের একটি প্ল্যাটফর্ম থেকে ফের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ান। তাদের স্লোগান ছিল ইরানের জন্য ঐক্য ও সংহতি।

বিশ্লেষকদের ধারণা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের তীব্র টানাপড়েনে একটা শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুঁজে বের করবেন পেজেশকিয়ান। অবশ্য ইরানের চূড়ান্ত ক্ষমতা সর্বোচ্চ নেতা খামেনির হাতে, তাই সংস্কারবাদী পেজেশকিয়ান প্রেসিডেন্ট হলেও দেশটির নীতিতে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আসবে না।