১৯৭২ সালে দেশের অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কোটাব্যবস্থা চালু করা হয়। ওই সময় সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়োগ হতো কোটায়, যা পরবর্তী সময়ে ক্রমান্বয়ে কমিয়ে ৫৫ শতাংশ করা হয়। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিল করা হয়। চলতি বছর হাইকোর্ট আবার সে পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে রায় দিলে আন্দোলনে নামেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনকারীদের ভাষ্য, বৈষম্য দূর করার জন্য কোটাব্যবস্থা চালু হয়েছিল। এখন নিজেই এটা বৈষম্য সৃষ্টি করছে। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, বর্তমান কোটাপ্রথা সংবিধানবিরোধী এবং চরম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা।
তবে কোটা বাতিল করে হাইকোর্টের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের বিভিন্ন সংগঠন। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে কোটা বাতিল করে জারি করা ২০১৮ সালের পরিপত্রকে অবৈধ, অসাংবিধানিক ও বাংলাদেশের চেতনার পরিপন্থী বলে আখ্যা দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ মঞ্চ। সংগঠনটির সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ‘২০১৮ সালের পরিপত্র নিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা আবেগের বশে দিয়েছিলেন। রাষ্ট্র আবেগের বশবর্তী হয়ে ঘোষণা দিতে পারে না। তার জন্য আইন আছে, সংবিধান আছে।’ তিনি বলেন, ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা অবশ্যই যৌক্তিক। মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল না হলে ‘সর্বাত্মক আন্দোলন’ গড়ে তুলে রাষ্ট্রকে তা মেনে নিতে বাধ্য করবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
সরকারি তথ্য বলছে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ২০ শতাংশ পদে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ করা হতো। বাকি ৮০ শতাংশ পদে কোটায় নিয়োগ হতো। ১৯৭৬ সালে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ ৪০ শতাংশে বাড়ানো হয়। ১৯৮৫ সালে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির পদে ৪৫ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের নিয়ম চালু করা হয়। বাকি ৫৫ শতাংশ অগ্রাধিকার কোটায় নিয়োগ দেওয়া হয়। এই অগ্রাধিকার কোটার মধ্যে রয়েছে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, ১০ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ জেলা কোটা ও ৫ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। পরে ১ শতাংশ পদ প্রতিবন্ধী প্রার্থীদের দিয়ে পূরণের নিয়ম চালু করে মোট কোটা দাঁড়ায় ৫৬ শতাংশ। শুরু থেকেই মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিল। পরে এ কোটায় মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এবং তারপর নাতি-নাতনি যুক্ত করা হয়। আন্দোলনকারীরা বলছেন, বর্তমান কোটাব্যবস্থা বৈষম্যমূলক। এজন্য তারা চাচ্ছেন বিদ্যমান প্রাধিকার কোটা সংস্কার করে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ করা হোক। তাদের ভাষ্য, গত ৫৪ বছরে এসব জনগোষ্ঠী যথেষ্ট অগ্রসর হয়েছে। নারীরা শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে সমতা অর্জন করেছেন। স্বয়ং নারীরাও চান না তাদের জন্য কোটা থাকুক। এ ছাড়া পোষ্য কোটাকে অযৌক্তিক ও সংবিধানের চেতনাবিরোধী বলছেন তারা। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের বড় একটি অংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটার সংস্কার চান। তাদের দাবি, স্বাধীনতার এত বছর পর তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য ৩০ শতাংশ কোটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
কোটাকে চাকরির সুযোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ও বৈষম্য মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থায় বিসিএসের মেধা তালিকা থেকে ৪৪ শতাংশ নিয়োগ হয়, বাকি ৫৬ শতাংশ আসে কোটা থেকে। নন-ক্যাডার প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকরির ক্ষেত্রেও একই কোটা পদ্ধতির অনুসরণ করা হয়। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরির ক্ষেত্রে কোটার অবস্থা আরও ভয়াবহ। এ ক্ষেত্রে মেধা তালিকা থেকে ৩০ শতাংশ এবং ৭০ শতাংশ পূরণ করা হয় কোটা থেকে। এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ শতাংশ নারী এবং ২০ শতাংশ পোষ্য কোটা রয়েছে, যা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী ২৫ লাখের বেশি বেকারের সঙ্গে তামাশা।
চলমান বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘কোর্ট এবং ছাত্রসমাজকে মুখোমুখি করে সরকার কেন দায়িত্বহীন ভূমিকা পালন করছে? নির্বাহী বিভাগ এর দায় এড়াতে পারে না। ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী যেখানে আমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে কোটা থাকবে না, সেই কোটা এখন কেন ফিরে এলো এর জবাব আমরা চাই।’ তিনি বলেন, ‘শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতেই নয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতেও কোটার বৈষম্য দূর করতে হবে। আমাদের এ আন্দোলন শুধু প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির কোটার জন্য নয়, সব গ্রেডের কোটা বাতিল করতে হবে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি চাকরিতে কোটার ব্যবস্থা থাকবে এটা সংবিধানের কোথাও বলা হয়নি। সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদের ১ ধারায় ‘নিয়োগ লাভে যে সুযোগের সমতা’র নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, কোটা কার্যক্রমের মাধ্যমে তার ব্যত্যয় ঘটেছে। এর পরপরই ২৯ অনুচ্ছেদের ২ ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’ সংবিধানে অনগ্রসর সম্প্রদায়ের জন্য ৩-এর ‘ক’ ধারায় যে বিশেষ বিধানের কথা বলা হয়েছে, তা কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নয়। সুতরাং মুক্তিযোদ্ধা কোটার যে সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছিল, সেটিও স্থায়ী নয়। সময়ের পরিক্রমায় সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথায় সংবিধানে বলা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে কোটার ব্যবস্থা থাকবে এটা সংবিধানের কোথাও বলা হয়নি। চাকরিসংক্রান্ত সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে বলা আছে, সেখানে বলা হয়েছে সবার সুযোগের অধিকার সমান। শুধু যারা নারী, শিশু এবং সমাজের অনগ্রসর শ্রেণির জন্য রাষ্ট্র বিশেষ ব্যবস্থা করতে পারবে এটা বলা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের কোথাও অনগ্রসর বলা হয়নি, তাদের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বলা হয়েছে। ঢালাওভাবে তাদের অনগ্রসর বলা মানে তাদের অপমান করা। যারা পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা আছে কিংবা যারা নিহত হয়েছে তাদের পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার কথা বলা আছে। আর্টিকেল ১৫ তাদের সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে কিন্তু চাকরি দেওয়ার কথা কোথাও বলা নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটা কোটার ব্যবস্থা করা হয়েছিল ঠিক, তবে সেখানে বলা হয়েছিল এটা অস্থায়ী আইন। সে সময় শুধু যারা যুদ্ধ করে আসছেন তাদের জন্য করা হয়েছিল। কিন্তু তাদের ছেলেরা কি মুক্তিযুদ্ধ করেছে, নাতিরা কি মুক্তিযুদ্ধ করেছে? তাহলে তারা কেন এই কোটা পাবে? তাহলে আপনি শুধু সরকারি চাকরি নয়, সবকিছুতেই মুক্তিযোদ্ধা কোটা রাখেন। এটা একটা দুর্নীতিবান্ধব ব্যবস্থা, এটা একটা সংবিধানবিরোধী ব্যবস্থা এবং চরম বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা। তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন করা যৌক্তিক।’
পরিপত্রটা বাতিল না করে সংশোধন করার পরামর্শ দিয়ে আসিফ নজরুল বলেন, ‘পৃথিবীর কোন আইনে আছে সরকার একটি পরিপত্র সংশোধন করতে পারবে না। সংশোধন করে আপনি মুক্তিযোদ্ধা কোটা ৩০ শতাংশ থেকে বড়জোর ১০ শতাংশ করেন, একবার মাত্র কোটার ব্যবহার করা যায়, সে ব্যবস্থা করা যায় এবং কোটার পরেও যদি পদ শূন্য থাকে সেখানে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ করা হবে। আমার মনে হয় না এরপরও কেউ আপত্তি জানাতে পারবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, ‘কোটা কখনোই মেধার বিকল্প হতে পারে না। মুক্তিযোদ্ধারা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের অবদানের স্বীকৃতি এবং সম্মান জানানোর অন্য আরও অনেক বিকল্প আছে। সে বিকল্পগুলো বংশ পরম্পরায়ও চলতে পারে। কিন্তু তা না করে চাকরিতে বংশ পরম্পরায় ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল রাখা অযৌক্তিক। কারণ, এর ফলে বেকার সমস্যা যেমন প্রবল হবে, তেমনি তুলনামূলকভাবে যোগ্য ও মেধাবীরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। এটি এক ধরনের বৈষম্যও বটে। মুক্তিযুদ্ধের মূলচেতনা সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের সঙ্গেও তা সংগতিপূর্ণ নয়।’