আজ রাতেই ফিরছেন প্রধানমন্ত্রী

চীনে চার দিনের সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামীকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় রওনা দিয়ে দুপুরে ঢাকায় ফেরার কথা থাকলেও তিনি আজ রাতেই রওনা দিচ্ছেন। গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ এ কথা জানিয়েছেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সব আনুষ্ঠানিকতা অপরিবর্তিত রয়েছে, শুধু ১১ জুলাই সকালের পরিবর্তে আজ বুধবার রাতে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে তিনি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন। 

এর আগে প্রধানমন্ত্রী চীনা ব্যবসায়ীদের পারস্পরিক স্বার্থে বিশ্বের সবচেয়ে উদার বিনিয়োগব্যবস্থার সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগের সময় এবং আমি আত্মবিশ্বাসী যে আমাদের হাতে হাত মিলিয়ে একসঙ্গে আমরা দুর্দান্ত কিছু অর্জন করতে পারি।’

গতকাল মঙ্গলবার শেখ হাসিনার চীন সফরের দ্বিতীয় দিন বেইজিংয়ে ‘বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, ব্যবসা এবং বিনিয়োগের সুযোগ’ শীর্ষক এক শীর্ষ সম্মেলনে তিনি এ আহ্বান জানান। বেইজিংয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস, বিআইডিএ, বিএসইসি এবং সিসিপিআইটি চায়না ওয়ার্ল্ড সামিট উইং, শাংরি-লা সার্কেল, বেইজিংয়ে এই সম্মেলনের আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী চীনা ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশের মূল খাতগুলো বিবেচনা করার জন্য উৎসাহিত করে বলেন, ‘আমরা আমাদের অবকাঠামো, জ্বালানি এবং লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগকে স্বাগত জানাই।’

তিনি বাংলাদেশের সম্ভাব্য খাত আইসিটি, পর্যটন, কৃষি প্রক্রিয়াকরণ শিল্প এবং উন্নয়ন খাতে বৃহত্তর পরিমাণে বিনিয়োগ করার জন্য চীনা উদ্যোক্তাদের এবং বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, চীনা বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ জ্বালানি খাতে। জলবায়ু-সহনশীল স্মার্ট ফার্মিং চীনের সঙ্গে ক্রয়-ব্যাক ব্যবস্থাসহ কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে সহযোগিতার সুযোগ উন্মুক্ত করে।’

সরকারপ্রধান বলেন, ‘তারা তিনটি বিশেষ পর্যটন অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করছে, যেখানে চীন রিয়েল এস্টেট এবং আতিথেয়তা খাতে বিনিয়োগ করতে পারে। আমি চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ অন্বেষণ করার আহ্বান জানাচ্ছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সবুজ প্রযুক্তিতে অসংখ্য সুযোগ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার লক্ষ্যে পুঁজিবাজারের আরও উন্নয়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। আমরা একটি শক্তিশালী বন্ড বাজার বিকাশে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছি। আমরা ডেরিভেটিভ পণ্য প্রবর্তনের দ্বারপ্রান্তে রয়েছি, যা আমাদের আর্থিক বাজারকে আরও বৈচিত্র্য ও প্রসারিত করবে।’

বাংলাদেশ ডিজিটাল যুগকে উন্মুক্ত বাহুতে আলিঙ্গন করছে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, তার সরকার সক্রিয়ভাবে আইসিটি সেক্টরের প্রবৃদ্ধি জোরদার করছে, স্টার্টআপদের জন্য প্রণোদনা দিচ্ছে, টেক পার্কে বিনিয়োগ করছে এবং উদ্ভাবনা ও উদ্যোক্তাকে উৎসাহিত করে এমন একটি ইকোসিস্টেম গড়ে তুলছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের তরুণ উদ্যোক্তারা বিশ্ব মঞ্চে তাদের অবস্থান তৈরি করছে এবং আমরা আপনাদের এই আকর্ষণীয় যাত্রায় শরিক হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি।’

শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ ও চীনের বেশ কয়েকটি কোম্পানির মধ্যে ১৬টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বিনিময় হয়েছে।

চীনের ভাইস মিনিস্টার অব কমার্স লি ফেই, চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন গ্রুপ কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান ওয়াং টংঝু, এইচএসবিসি চায়নার প্রেসিডেন্ট ও সিইও মার্ক ওয়াং, হুয়াওয়ের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সাইমন লিন, বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. জসিম উদ্দিন এবং বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান লোকমান হোসেন মিয়া অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

স্বাগত বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবায়াত-উল ইসলাম।

প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন

এদিকে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম নিয়ে গতকাল সন্ধ্যায় বেইজিংয়ের সেন্ট রেজিস হোটেলে প্রেস ব্রিফিং করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি জানান, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থেকে চীন সর্বোচ্চ সহযোগিতা দেবে। গতকাল বিকেলে বেইজিংয়ের গ্রেট হলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে চাইনিজ পিপলস পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্সের (সিপিপিসিসি) জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান ওয়াং হুনিং এ প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সিপিপিসিসির জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যানের অত্যন্ত আন্তরিক পরিবেশে এ বৈঠকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে গুরুত্বারোপ করেন তারা। দলীয় নেতাদের পারস্পরিক সফরের বিষয়েও ঐকমত্য হয়। ওয়াং হুনিং বলেন, চীনের কমিউনিস্ট পার্টি এবং আওয়ামী লীগ উভয়েরই অভিন্ন লক্ষ্য জনগণের কল্যাণ।

এদিন সকালে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং নিবাস সেন্ট রেজিস হোটেলের পার্লাররুমে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকের (এআইআইবি) প্রেসিডেন্ট জিন লিকুন সৌজন্য সাক্ষাতের ওপর আলোকপাতকালে হাছান মাহমুদ জানান, প্রধানমন্ত্রী এআইআইবিকে বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়ন, নদী খনন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ উপযোগী খাতে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। এআইআইবির প্রেসিডেন্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়য়ন-অগ্রগতিকে অভূতপূর্ব বলে বর্ণনা করেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী এর আগে দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেইজিংয়ের সাংগ্রিলা সার্কেলে ‘সামিট অন ট্রেড, বিজনেস অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট অপরচুনিটিজ বিটুইন বাংলাদেশ অ্যান্ড চায়না’ সম্মেলনে যোগদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রায় ৯০ জন ব্যবসায়ী প্রতিনিধি ও চীনের শতাধিক ব্যবসায়ী এ সম্মেলনে যোগ দেন এবং বাংলাদেশ ও চীনের বেশ কয়েকটি কোম্পানির মধ্যে ১৬টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চীনের ঐতিহ্যবাহী তিয়েন আনমেন স্কয়ারে শ্রদ্ধা নিবেদন ও রাতে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস আয়োজিত নৈশভোজে যোগ দেন।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সব অনুষ্ঠান অপরিবর্তিত রয়েছে। শুধু ১১ তারিখ সকালের পরিবর্তে আজ বুধবার (১০ জুলাই) রাতে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী ঢাকার উদ্দেশে রওনা হবেন।

বুধবার সফরের শেষ দিন প্রধানমন্ত্রী গ্রেট হলে চীনের প্রিমিয়ার অব দ্য স্টেট কাউন্সিল লি শিয়াংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন ও দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলসহ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন। এরপর প্রায় ২০ থেকে ২২টির মতো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং কয়েকটি প্রকল্প উদ্বোধনের ঘোষণার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার সম্মানে আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন। বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্রেট হল অব দ্য পিপলে চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন।

উল্লেখ্য, চীনের প্রিমিয়ার অব দ্য স্টেট কাউন্সিল লি ছিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোমবার বেলা ১১টায় বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটযোগে চীনের স্থানীয় সময় বিকেল ৬টায় বেইজিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। সেখানে প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনারসহ যথাযথ সম্মাননায় অভ্যর্থনা জানানো হয়।

অর্থমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা, বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী, পররাষ্ট্র সচিব, অন্যান্য সচিবসহ উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়েছেন।