৩১৬ কোটি গচ্চা দিয়ে ফের আবাসনের খোঁজ

১৬ বছরেও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নতুন কোনো আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেনি। অনন্যা-২ ও বায়েজিদ নামের দুটি আবাসন প্রকল্পের বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুমোদন পেলেও সেগুলো বাস্তবায়ন না করে পিছু হটেছে সিডিএ। অনন্যা-২ প্রকল্পে ৩১৬ কোটি টাকা খরচের পর তা বাতিল করে মন্ত্রণালয়ের ভর্ৎসনাও পেয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। আগের প্রকল্পগুলো ফলপ্রসূ হয়নি। এখন নতুন করে আবাসনের খোঁজ চলছে; কিন্তু তা টিকবে কি না সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ ইউনুছ সিডিএ চেয়ারম্যান হিসেবে গত এপ্রিলে দায়িত্ব নিয়ে চট্টগ্রামে নতুন আবাসন প্রকল্প গ্রহণের কাজ শুরু করেছেন। ইতিমধ্যে নগরীর পতেঙ্গা মুসলিমাবাদ সাগরপাড়, ডিটি বায়েজিদ সংযোগ সড়কের ফৌজদারহাট, পাঁচলাইশের হামিদচর ও কর্ণফুলী নদীর ওপারে আনোয়ারার চাতুরি চৌমুহনী এলাকায় সমীক্ষণ কাজ চালানো হয়েছে।

কোথায় নতুন আবাসন প্রকল্প নেওয়া হবে? একটি না একাধিক প্রকল্প নেওয়া হবে? সেগুলো কি আগের মতো ডিপিপি অনুমোদনের পর হোঁচট খাবে? কিংবা যেসব আবাসন প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ দেওয়ার পরও মানুষ বাড়িঘর নির্মাণ করছে না সেগুলোর মতো হবে? এমন অনেক প্রশ্ন সিডিএ কর্মকর্তা, সাধারণ নগরবাসী ও পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। সিডিএ সর্বশেষ ২০০৮ সালে নগরীর পাঁচলাইশ ও হাটহাজারীর কুয়াইশ মৌজার কৃষিজমি ভরাট করে ১৭০০ আবাসিক প্লট বরাদ্দ দিয়েছিল। নদীবাহিত পলি জমে এলাকাটি গড়ে ওঠায় প্রায় ১২০ ফুট নিচে গিয়ে শক্ত মাটির স্তর পাওয়া যায়। এ কারণে প্লট বরাদ্দপ্রাপ্তরা সেখানে বাড়ি নির্মাণে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এর আগে ১৯৯৫ সালের দিকে কর্ণফুলী নদীর ওপারে মইজ্জারটেকে কর্ণফুলী আবাসিক প্রকল্পে পানির উৎস না থাকায় প্লট বরাদ্দপ্রাপ্তরা বাড়ি নির্মাণ করছেন না। ১৯৮৪ ও ২০১৪ সালে প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয় ফৌজদারহাট সিলিমপুর আবাসিক এলাকায়। নগরী থেকে বেশ দূরের ওই আবাসিক এলাকায় ভালো যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায়, পানি ও গ্যাস সুবিধার অভাবে মানুষ বাড়ি নির্মাণ করছে না।

সর্বশেষ ২০১৭ সালে ৩ হাজার প্লট তৈরির লক্ষ্যে অনন্যা আবাসিক এলাকা-২ নামে কুয়াইশ মৌজায় একটি আবাসন প্রকল্প করার জন্য কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর ও সার্ভে বাবদ প্রায় ৩১৬ কোটি খরচ হলেও কাঠাপ্রতি মূল্য ১৫ লাখ টাকা নির্ধারিত হওয়ায় কাক্সিক্ষত সাড়া মেলেনি বলে তা বাতিল করতে হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে নগরীর বায়েজিদ আরেফিন নগর এলাকায় ১৯ দশমিক ৬৫ একর জায়গায় ৩৫৭ কোটি ৮২ লাখ ৫২ হাজার টাকায় ১৬৭টি প্লটের একটি প্রকল্পে। সেখানে প্রতি কাঠার দাম নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩৫ লাখ। কাঠাপ্রতি দাম বেশি হওয়ার কারণে এ প্রকল্পটিও বাতিল করতে হয়েছে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি ও চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নগরাঞ্চল বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রাশিদুল হাসান বলেন, ‘কোনো এলাকায় আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে ওই এলাকার মাটির স্তর কেমন তা যেমন জানা থাকতে হবে, একই সঙ্গে সেখানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করতে হবে। শহর থেকে দূরে করলে যাতায়াত ব্যবস্থা এবং স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, পোস্ট অফিস ও ব্যাংকের ব্যবস্থা থাকতে হবে অথবা এসবের ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই সেখানে মানুষ বাড়ি নির্মাণ করবে।’

একই মন্তব্য করেন বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের প্রেসিডেন্ট স্থপতি আশিক ইমরান। তিনি বলেন, ‘অনন্যা আবাসিক এলাকায় ছয়তলার বাড়ি করতে যদি ১২০ ফুট নিচ পর্যন্ত পাইলিং করতে হয়, তাহলে মাটির নিচেই চলে যাবে প্রায় দেড় কোটি টাকা। এ কারণে প্লট গ্রহীতারা বাড়ি নির্মাণে উৎসাহিত হবেন না। এ রকমটাই ঘটছে। তাই আবাসন প্রকল্পের স্থান নির্বাচনে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়গুলো বিবেচনা করে প্লটের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে রাখা যাবে কি না তা ভাবতে হবে।’

নতুন আবাসন প্রকল্পের বিষয়ে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে সিডিএ চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, ‘আমি একটা নয়, একাধিক আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। তবে আগের অভিজ্ঞতার আলোকে আমি সয়েল টেস্ট (মৃত্তিকা পরীক্ষণ), কৃষিজমি না পতিত জমি তা দেখে, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা এবং যাতায়াত ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই স্থান চূড়ান্ত করব।’

তিনি বলেন, ‘আমার লক্ষ্য নগরকে সম্প্রসারিত করা। সেই লক্ষ্যে নগরীর প্রান্তিক এলাকায় কিংবা উপজেলা সদরগুলোয় আবাসন প্রকল্প নেওয়ার মাধ্যমে ওই এলাকাগুলো উন্নত করাই আমার পরিকল্পনা।’

কাঠাপ্রতি মূল্য বেশি হওয়া প্রসঙ্গে সিডিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘মৌজা মূল্যের তিন গুণ ক্ষতিপূরণ হিসেবে পরিশোধ করতে হয়। ওই মূল্যের সঙ্গে উন্নয়ন খরচ, স্কুল, কলেজ, খেলার মাঠ, মসজিদ, কবরস্থানসহ নাগরিক সুযোগ-সুবিধার জায়গা রাখতে গিয়ে এ বাবদ একটা মূল্য যোগ করে কাঠাপ্রতি মূল্য বেশি পড়ে যায়।’

সিডিএ নগরীতে ১৯৬৩ সালে কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকা (৫৮টি প্লট), ১৯৬৫ সালে আগ্রাবাদ আবাসিক এলাকা (৩৯১টি প্লট), ১৯৭৩ সালে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা (৭৫৯টি প্লট), ১৯৭৭ সালে কর্নেলহাট আবাসিক এলাকা (১৬৮টি প্লট), ১৯৮৪ ও ২০১৪ সালে সিলিমপুর আবাসিক এলাকা (৯৮৫টি প্লট), ১৯৯৫ সালে কর্ণফুলী আবাসিক এলাকা (৫১৭টি প্লট), ২০০০ সালে চান্দগাঁও চন্দ্রিমা আবাসিক এলাকা (১৮১টি প্লট), ২০০২ সালে চান্দগাঁও আবাসিক এলাকা দ্বিতীয় পর্যায় (৮৩টি প্লট), ২০০৬ সালে কল্পলোক আবাসিক এলাকা প্রথম পর্যায় (৪২৩টি প্লট), ২০০৭ সালে কল্পলোক আবাসিক এলাকা দ্বিতীয় পর্যায় (১৩৫৬টি প্লট) এবং ২০০৮ সালে অনন্যা আবাসিক এলাকা (১৭৪৮টি প্লট) বাস্তবায়ন করেছে।