স্কুলছাত্রদের চেয়েও সঞ্চয় কম কৃষকের

স্বাধীনতা অর্জনে যেমন কৃষকের নিয়ামক ভূমিকা ছিল, তেমনি স্বাধীনতা অর্জনের পরও কৃষকরাই ছিলেন দেশের অর্থনীতির মূল ভিত। কিন্তু খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যে কৃষক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন, তাদেরই নেই আর্থিক নিরাপত্তা। কৃষকের উৎপাদিত ফসল নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগীরা কোটি কোটি টাকা আয় করলেও তাদের সঞ্চয় তলানিতে। গড়ে তাদের সঞ্চয় মাত্র ৬৩৭ টাকা, যেখানে স্কুলছাত্রদের সঞ্চয় গড়ে ৫৫০০ টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি কৃষিনির্ভর ছিল একদা। তাদের হাত ধরেই দেশ সমৃদ্ধির পথে পা বাড়ায়। শিল্পায়নের কারণে দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান কমে এখন ১১ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ন্যায্যমূল্য না পাওয়া, কৃষিজমি কমে যাওয়া ও প্রযুক্তিগত কারণে অনেক কৃষক পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। তবু দেশে কৃষকের সংখ্যা ২ কোটি ৫৬ লাখ। কয়েক দশকে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হলেও, বিভিন্ন পেশায় সচ্ছলতা এলেও কৃষির দৃশ্যমান ভবিষ্যৎ তিমিরাচ্ছন্ন।

প্রান্তিক কৃষক, অতি-দরিদ্র মানুষ, মুক্তিযোদ্ধা এবং পোশাকশ্রমিকদের সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় নো-ফ্রিল ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগ করে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একজন কৃষক মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ পান। এর বাইরে কৃষক হিসেবে আলাদাভাবে সঞ্চয়ের সুযোগ তাদের নেই। ১ কোটি ৪ লাখ কৃষক নো-ফ্রিল হিসাবের মাধ্যমে ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এসব হিসাবের পরিমাণ পর্যাপ্ত হলেও কৃষকের গড় সঞ্চয় মাত্র ৬৩৭ টাকা। যে কৃষকরা হিসাবের বাইরে রয়েছেন, তাদের আমলে নিলে গড় সঞ্চয় ৩০০ টাকারও কম।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মার্চের শেষে কৃষকের নো-ফ্রিল ব্যাংক হিসাব সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪ লাখ ২ হাজার ৪৫৭। গত ডিসেম্বরে ছিল ১ কোটি ৩ লাখ ৬২ হাজার ৬০৩টি। হিসাব বেড়েছে ৩৯ হাজার ৭৫৪টি। অন্যদিকে চলতি বছর মার্চ শেষে আমানত প্রায় ৬৬৩ কোটি টাকা, গত ডিসেম্বরে ছিল ৫৯২ কোটি টাকা। আমানত বেড়েছে প্রায় ৭১ কোটি টাকা। আমানত বেড়ে ৬৬৩ কোটি টাকা হলেও হিসাবধারী প্রতি কৃষকের সঞ্চয় ৬৩৭ টাকা মাত্র। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে কৃষকের সংখ্যা ২ কোটি ৫৬ লাখ। ৬৬৩ কোটির বিপরীতে ২ কোটি ৫৬ লাখ কৃষকের সঞ্চয় ধরলে প্রতি কৃষকের সঞ্চয় দাঁড়ায় মাত্র ২৫৯ টাকা। দেশে স্কুলশিক্ষার্থীদের ৪০ লাখ ব্যাংক হিসাবেও প্রায় ২ হাজার ২০০ কোটি টাকা আমানত রয়েছে। প্রতি শিক্ষার্থীর আমানত প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ স্কুলছাত্রের চেয়েও কৃষকের সঞ্চয় কম।

দেশে এখন ব্যাংক খাতে আমানতের পরিমাণ ১৮ লাখ কোটি টাকারও বেশি। জনপ্রতি আমানতের পরিমাণ এক লাখ টাকারও বেশি। আমানতের এ চিত্রে কৃষক প্রায় নেই বলা চলে। তবে কৃষকের সঞ্চয় তলানিতে থাকলেও বাংলাদেশের জাতীয় সঞ্চয় বাড়ছে। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মাথাপিছু জাতীয় সঞ্চয় ৯৩ হাজার ৭২৫ টাকা, আগের অর্থবছরে ছিল ৭৮ হাজার ৭১৫ টাকা।

  1. গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কৃষকের সঞ্চয় করার সক্ষমতা খুব বেশি নেই। জমাতে চাইলেও খুব বেশি জমাতে পারেন না। কারণ তাদের আয় কম। তার ওপর রয়েছে মূল্যস্ফীতির প্রভাব। ব্যাংকের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কম। সঞ্চয়ও কম।’ কৃষকদের বিশেষ ঋণ প্রদানের নির্দেশনা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের কমপক্ষে ২ শতাংশ কৃষিঋণ হিসেবে দেওয়ার কথা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট

কৃষিঋণের স্থিতি ৫৬ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা। যদিও এসব ঋণের বড় অংশই পান ফসল উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন এমন ব্যবসায়ীরা। প্রকৃত কৃষকরা অপাঙ্ক্তেয়ই থাকেন।

প্রতিবছর কৃষিতে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেয় সরকার। এ নীতি কৃষকদের আর্থিক সংকট কাটাতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদরা। তারা বলছেন, অর্থনীতির মেরুদ- হিসেবে ভূমিকা রাখলেও কৃষক বরাবরই বঞ্চিত, উপেক্ষিত। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক যেসব নীতি নেয়, তার সুফল প্রান্তিক কৃষকদের কাছে পৌঁছায় না। সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ঘাটতির কারণে প্রকৃত কৃষকরা বঞ্চিতই থাকছেন।

এ বিষয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. জাহাঙ্গীর আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও আয়ের মধ্যে ফারাক খুব কম। তাদের সঞ্চয় খুব একটা থাকে না। তাদের কাছে যে অল্প-স্বল্প টাকা থাকে, তা তারা নিজের কাছেই রাখেন। আর মূল্যস্ফীতির একটা বড় প্রভাব আছে। কৃষি উপকরণের উচ্চমূল্যের নিরিখে কৃষক তার পণ্যের দাম পান না। নিত্যপ্রয়োজন মেটাতেই তাদের হিমশিম খেতে হয়। ব্যাংকে টাকা রাখবেন কীভাবে? এটাই বাস্তবতা।’

তিনি বলেন, ‘কৃষকের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য সরকার কৃষিঋণের ব্যবস্থা করলেও তার সুবিধা খুব বেশি কৃষক পান না। কিছু ঋণ সরাসরি কৃষকের কাছে গেলেও বেশিরভাগ যায় এনজিওর মাধ্যমে কিংবা বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে। কৃষকের কাছে সরাসরি যায় না। যেগুলো বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে কিংবা অন্যান্য মাধ্যমে যায় সেসব ঋণ প্রকৃত কৃষক পান না। ওই ঋণগুলোয় খেলাপি বেশি হয় আর দুর্নাম হয় কৃষকের। এসব ঋণ যেন প্রকৃত কৃষকের কাছেই যায় এবং ঋণটা সত্যি সত্যি কৃষি খাতে ব্যয় করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে কৃষকের ভাগ্য বদলাতে পারে।’

২০১০ সালে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং সুবিধা দিতে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দিয়েছিল সরকার। এগুলোকে নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টস (এনএফএ) বলা হয়। এসব অ্যাকাউন্টের ন্যূনতম ব্যালান্স বা সার্ভিস চার্জ বা ফি নেই। সমাজের সব স্তরের মানুষের আর্থিক সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন উদ্যোগের আওতায় এসব অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। কৃষকরা ছাড়াও এসব হিসাবের আওতায় থাকেন পোশাকশ্রমিক, অতিদরিদ্র মানুষ, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধাভোগীরাসহ অনেকে। এর মধ্যে কৃষকদের হিসাব ও আমানত সবচেয়ে বেশি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর মার্চ প্রান্তিকে স্বল্প আয়ের মানুষের হিসাব সংখ্যা বেড়েছে ২৮ হাজারেরও বেশি। আমানত বেড়েছে ২২৫ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শেষে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে খোলা স্বল্প আয়ের মানুষের ব্যাংক হিসাবে আমানতের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৪৬৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা। আর চলতি বছর মার্চ শেষে আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৭৯১ কোটি ১০ লাখ টাকা। তিন মাসে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকা দিয়ে খোলা হিসাবে আমানত বেড়েছে ২২৫ কোটি ৭ লাখ টাকা বা ৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শেষে ব্যাংকগুলোয় নো-ফ্রিল অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৬৯ লাখ ৮৩ হাজার ৫৬০টি। আর চলতি বছর মার্চ শেষে অ্যাকাউন্ট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ৭২ লাখ ৬৩ হাজার ৮৬১টিতে। তিন মাসে অ্যাকাউন্ট বেড়েছে ২৮ হাজার ৩০১টি। চলতি বছর মার্চ শেষে ১০, ৫০ ও ১০০ টাকার হিসাবধারীদের ২০০ কোটি ও ৫০০ কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিম থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ছিল ৭৬৪ কোটি ৪১ লাখ টাকা। চলতি বছর মার্চ শেষে এসব হিসাবের মাধ্যমে পাওয়া প্রবাসী আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬৮৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা।