বন্ধু সাজেদুলের প্রলোভনে চক্রে সাখাওয়াত!

পরীক্ষার আগেই প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে সেগুলো পড়ে ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন অন্তত ১২ জন। এই ১২ জন প্রশ্নপত্র নিয়েছিলেন বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) সাবেক গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীর কাছে থেকে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে দেওয়া জবানবন্দিতে সাবেক এই গাড়িচালক এ কথা বলেছেন। স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, তার থেকে প্রশ্নপত্র নিয়ে অনেকেই বিসিএস ক্যাডার হয়েছেন। সর্বশেষ ৪৬তম বিসিএসের প্রিলিতে অন্তত ১২ জন পাস করেছেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি ও আদালত সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন ফাঁস করে আসছিল। অনেকেই তাদের কাছ থেকে প্রশ্ন কিনেছেন, এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। তাদের মধ্যে যারা এখন বিভিন্ন জায়গায় কর্মরত তাদের অনেকের নামই উঠে আসছে। জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতদের দেওয়া এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত ৫ জুলাইয়ের পিএসসির অধীনে হওয়া রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস করেন পিএসসির অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলাম। আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সাজেদুল ইসলাম বলেছেন, এ পরীক্ষাটির জন্য চার সেট প্রশ্নপত্রে খসড়া করা হয়। যা রক্ষিত ছিল পিএসসির এক সদস্যের কক্ষে তালাবদ্ধ একটি ট্রাংকে। ঝাড়ুদার যখন ওই কক্ষ পরিষ্কারের জন্য তালা খোলেন। সেই সুযোগে ঢুকে পড়েন অফিস সহায়ক সাজেদুল। তালা ভেঙে চার সেট প্রশ্নের ফটোকপি করে নেন। বিষয়টি যাতে ওই পিএসসি সদস্য বা অন্যকেউ বুঝতে না পারেন সেজন্য অন্য এমন একটি তালা ওই ট্রাংকে লাগিয়ে দেন, যেটা যেকোনো চাবি দিয়ে তা খোলা যায়। অবশ্য এর আগে অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, ঝাড়ুদার তালা ভেঙে প্রশ্নপত্র সরাতেন।

প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে গত ৬ ও ৭ জুলাই পিএসসির উপপরিচালক মো. আবু জাফর ও জাহাঙ্গীর আলমসহ ১৭ জনকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করে সিআইডি। গত ৯ জুলাই রাজধানীর পল্টন থানায় সিআইডি বাদী হয়ে মামলা করার পর তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে তোলা হয়। সেখানে আবেদ আলীসহ ছয়জন আসামি প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন।

বন্ধু সাজেদুলের প্রলোভনে চক্রে সাখাওয়াত : প্রশ্ন ফাঁস চক্রে গ্রেপ্তারদের মধ্যে যারা স্বীকরোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম সাখাওয়াত হোসেন। ৩০ বছর বয়সী এই যুবক রাজধানীর পল্টনে পানির ফিল্টারের ব্যবসা করতেন। পরিবার নিয়ে মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে থাকেন। বাংলাদেশ রেলওয়ের সহকারী প্রকৌশলী পদে নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় সাখাওয়াত ও তার ছোট ভাই সাইম হোসেনসহ (২০) ১৭ জনকে আটক করে সিআইডি। পরে নিজের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন সাখাওয়াত।

তিনি আদালতকে বলেন, সাজেদুলের সঙ্গে তার পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে। রেলওয়ে প্রকৌশলী পদের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার দুদিন আগে সাজেদুল পল্টনে তাদের একটি গুদাম ব্যবহারের অনুমতি নেন। পরে সেখানে ৪০ থেকে ৪৫ জন চাকরিপ্রার্থীর থাকার ব্যবস্থা করেন। তাদের ওই কক্ষে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করেন। চুক্তিবদ্ধ শিক্ষার্থীরা যাতে প্রশ্নপত্র অন্য কাউকে দিতে না পারেন সেজন্য তাদের ফোন রেখে দেওয়া হয়েছিল। এর আগে সাজেদুল মাঝেই মাঝেই আসতেন সাখাওয়াতের কাছে। আলাপে আলাপে তার কাছে চাকরিপ্রত্যাশীদের সন্ধান চাইতেন। চাকরিপ্রত্যাশীদের এনে দিতে পারলে মোটা অঙ্কের টাকা দেওয়ার কথাও বলতেন।

পিএসসির ঢাকা ও সিলেট কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের নাম আসছে : পিএসসির পরীক্ষা-শাখা (নন-ক্যাডার), তথ্যপ্রযুক্তি শাখা, ইউনিট-১২ ও পিএসসি সিলেট আঞ্চলিক কার্যালয়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম আসছে। পিএসসির ডেসপাস রাইডার খলিলুর রহমান ও অফিস সহায়ক সাজেদুল ইসলামের জবানবন্দিতে তাদের নাম জানা যাচ্ছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রেপ্তার হওয়া পিএসসির ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীই নন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত হিসেবে পিএসসির আরও পাঁচ কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম এসেছে। যারা বিভিন্ন সময় ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসে জড়িত ছিলেন। তাদের মধ্যে মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাও আছেন। আবার অফিস সহায়ক ও গাড়িচালকও আছেন।

মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করবে সিআইডি : বিসিএস ও অন্যান্য সরকারি চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে পিএসসির ঊর্ধ্বতন তিন কর্মকর্তাসহ ১৭ জনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সূত্র জানায়, গ্রেপ্তারকৃতদের ব্যাংক হিসাব জব্দ-সংক্রান্ত চিঠি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহীর কাছে পাঠানো হয়েছে। এ-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংক হিসাব জব্দ থাকবে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে সিআইডি সূত্রে  জানা গেছে।