কোটা সংস্কার নিয়ে চলমান আন্দোলনের সমাধান আদালত থেকেই আসবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, সরকারি চাকরিতে কোটার বিষয়টি যতক্ষণ পর্যন্ত আদালত থেকে সমাধান না হয়, ততক্ষণ সরকারের কিছু করার থাকে না। আর আন্দোলনে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড হলে আইন নিজস্ব গতিতে চলবে।
দেশকে জঙ্গিবাদমুক্ত করেছেন, এবার দুর্নীতিমুক্ত করবেন বলেও দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
সম্প্রতি চীন সফর নিয়ে গতকাল রবিবার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে কোটা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। চীন সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলন হলেও দুর্নীতি, বিসিএসের প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোটা আন্দোলন থেকে শিক্ষকদের আন্দোলন, তিস্তা প্রকল্প, সাংবাদিকদের ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন এবং সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলাসহ বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর দেন প্রধানমন্ত্রী।
কোটার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উচ্চ আদালত যখন কোনো রায় দেন, তখন আমাদের কিছু করার থাকে না। যারা আন্দোলন করছে তারা তো আইন মানবে না, আদালত মানবে না, সংবিধান কী, তা তারা চেনে না। একটি কাজ করতে গেলে যে নীতিমালা বা ধারা থাকে, একটি সরকার কীভাবে চলে, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা এদের নেই, কোনো জ্ঞান নেই। হ্যাঁ, পড়াশোনা করছে, ভবিষ্যতে এরাই তো দেশ চালাবে, নেতৃত্ব দেবে। এ ধারণাগুলো দরকার। আমাদের সংবিধান কী বলে, তা মেনে চলা উচিত।
শেখ হাসিনা বলেন, রায়ের বিরুদ্ধে এখন এই মুহূর্তে আমার তো দাঁড়ানোর কোনো অধিকার নেই। সংবিধানও বলে না, পার্লামেন্ট বলে না, কার্যপ্রণালি বিধিও বলে না। যতক্ষণ পর্যন্ত আদালত থেকে সমাধান না হয়, ততক্ষণ আমাদের এখানে কিছু করার থাকে না। এটিই হলো বাস্তবতা, এ বাস্তবতা তাদের মানতে হবে। না মানলে কিছু করার নেই। তিনি বলেন, রাজপথে আন্দোলন করছে, করতেই থাকবে। তবে কোনো ধ্বংসাত্মক কাজ করতে পারবে না। যতক্ষণ তারা শান্তিপূর্ণভাবে করে যাচ্ছে, কেউ কিছু বলছে না। এর বাইরে যখন কিছু করবে, পুলিশের গায়ে হাত দেওয়া বা পুলিশের গাড়ি ভাঙা বা আক্রমণ, এসব যদি কিছু করতে যায়, তখন আইন তার আপন গতিতে চলবে। এখানে আমাদের কোনো কিছু করার নেই।
মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা বিষয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-নাতিপুতিরা কেউ মেধাবী নয়? যত রাজাকারের বাচ্চা-নাতিপুতিরা মেধাবী? মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিরা কোটা সুবিধা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে? মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে, মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে কথা বলার অধিকার কে দিয়েছে?’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি তাদের এত ক্ষোভ কেন? মুক্তিযোদ্ধাদের অপরাধটা কী? নিজের জীবন বাজি রেখে, নিজের পরিবার-সংসার সব বাদ দিয়ে যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল, খেয়ে না খেয়ে, কাদা মাটিতে রোদ-বৃষ্টি-ঝড় সব উপেক্ষা করে যুদ্ধ করে এ দেশ স্বাধীন করেছে। মুক্তিযোদ্ধারা বিজয় এনে দিয়েছিল বলেই সবাই উচ্চপদে আসীন, আজকে বড় গলায় কথা বলতে পারছে। নইলে পাকিস্তানিদের বুটের লাথি খেয়ে মরতে হতো।’
মুক্তিযোদ্ধার এক নাতনি কোটায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এখন চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলন করছে জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তুই চলে আয়, তোর পড়াশোনার দরকার কী? মুক্তিযোদ্ধার নাতি হিসেবে কোটায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে এখন বলে, কোটা লাগবে না।’
প্রধানমন্ত্রী কোটা তুলে দেওয়ার পর কী অসুবিধা হয়েছে তা তুলে ধরে বলেন, ‘কোটা নিয়ে এর আগে আন্দোলনের একপর্যায়ে ২০১৮ সালে সরকার ৯ম থেকে ১৩তম গ্রেডে সব ধরনের কোটা বাতিল করেছিল। কোটা বাদ দিলে কী অবস্থা হয়। ফরেন সার্ভিসে মাত্র দুজন মেয়ে এবং পুলিশ সার্ভিসে চারজন মেয়ে সুযোগ পেয়েছে।’
আমার বাসায় কাজ করেছে, পিয়ন ছিল, এখন ৪০০ কোটি টাকার মালিক : পিএসসির এক গাড়িচালক কীভাবে অঢেল সম্পদের মালিক হলো? সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার বাসার একজন পিয়ন ছিল, সেও নাকি ৪০০ কোটি টাকার মালিক! হেলিকপ্টার ছাড়া নাকি চলে না। পরে তাকে ধরা হয়েছে। খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। ড্রাইভার কীভাবে এত কোটি কোটি টাকার মালিক হলো, সেটা কীভাবে বলব? তাদের অপকর্ম আমরা ধরছি বলেই তো এখন জানতে পারছেন। এতদিন তো আপনারা জানতে পারেননি।’
সরকার কঠোর হওয়ার কারণেই দুর্নীতিবাজরা ধরা পড়ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর আগে কেউ দুর্নীতির বিরুদ্ধে এভাবে অভিযান করেনি। এর আগে জঙ্গিবাদমুক্ত করেছি। দুর্নীতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। এসব জঞ্জাল সাফ করতে হবে। আমরা ব্যবস্থা নিয়েছি বলেই জানতে পেরেছেন।’
নানা খাতে দুর্নীতির চিত্র সামনে আসছে। ভবিষ্যতে দুর্নীতির বিষয়ে অবস্থান কী হবে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতিবাজদের ধরলেই সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, এটা বিশ্বাস করি না। আমার দায়িত্ব, অনিয়মগুলো ধরে দেশকে একটা অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। দুর্নীতি নিচের দিকে বেশি হচ্ছে। দুর্নীতি এমন পর্যায়ে ছিল, কাজই করা যেত না। সেখান থেকে পরিস্থিতি তো বদলেছে। হাত যখন দিয়েছি, ছাড়ব না। আপন-পর জানি না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সই থাকবে।’
প্রশ্নপত্র ফাঁস করে চাকরিতে প্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব : প্রশ্নপত্র ফাঁস করে বিসিএসসহ অন্যান্য সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, যখন ধরা পড়েছে, তদন্ত হবে, বিচার হবে। যারা বেনিফিশিয়ারি, যদি তাদের খুঁজে বের করা যায়, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেব। নেব না কেন? তাদের চাকরি করার কোনো অধিকারই থাকবে না। তিনি বলেন, খুঁজে বের করবে কে? সাংবাদিকরা যদি চেষ্টা করেন, খুঁজে বের করে দেন, ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘হাত যখন দিয়েছি আমি ছাড়ব না। যেখানেই হোক, যে-ই হোক, কেয়ার করি না। এখানে আপন-পর কোনো কিছু আমি জানি না। আমি যখন জিরো টলারেন্স বলেছি, জিরো টলারেন্স আমি করে ছাড়ব।’
সমালোচনায় কিচ্ছু যায় আসে না, অভ্যস্ত হয়ে গেছি : প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের প্রাপ্তি নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত নেতিবাচক সংবাদ নিয়ে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা।
এ বিষয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘আমি বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিই না। আমি এটায় অভ্যস্ত হয়ে গেছি। যারা এ কথাগুলো বলে বেড়াচ্ছেন, তারা কি জেনেবুঝে বলছেন, নাকি শুধু আমাকে হেয় করার জন্য বলছেন, সেটাই প্রশ্ন।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘সমালোচনাকারীরা বলতে বলতে এত বেশি বলে... যারা বলছে বলতে দেন। সমালোচনায় আমার কিছু যায় আসে না।’
এ সফরে বিভিন্ন সমঝোতা স্মারকের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২১টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হলো, ৭টি ঘোষণা এলো। তারপরও একটি পক্ষ বলছে এ সফরে নাকি কোনো প্রাপ্তি নেই। তিনি বলেন, ‘চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ভালো। তার আগে ভারত গেলাম, সেখানে বলা হয়েছিল ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে এসেছি। চীনে গেলাম, বলে কিছুই দেয়নি। এগুলো বলেই আসছে। এটা এক ধরনের লোকের মানসিক অসুস্থতা বলে মনে করি।’
তিস্তা প্রকল্প আমি চাচ্ছি, এটা ভারত করে দিক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প নিয়ে ভারত ও চীন দুই দেশেরই আগ্রহ আছে। তবে তিনি চান তিস্তা প্রকল্প ভারতই বাস্তবায়ন করুক। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিস্তা প্রকল্প আমাদের করতে হবে। এ নিয়ে চীন-ভারত দুই দেশই আমাদের প্রস্তাব দিয়েছিল। এর মধ্যে চীন সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে। ভারতও সম্ভাব্যতা যাচাই করবে। দুই দেশের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে যেটা আমাদের জন্য যুক্তিযুক্ত হবে, সেটা আমরা করব।’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘তবে আমি এখানে বেশি প্রাধান্য দেব যে, এটা ভারত করুক। কারণ তিস্তার পানিটা ভারত আটকে রেখেছে। তাদের কাছ থেকে যদি আমাদের আদায় করতে হয় তাহলে এ প্রজেক্টের মাধ্যমে করতে হবে। কাজ তাদেরই করা উচিত। তারা প্রজেক্ট করে যখন যা প্রয়োজন তারা দেবে। এটা তো একটা ডিপ্লোমেসি।’
সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সংসদ উপনেতা বেগম মতিয়া চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত এবং বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী ড. আহসানুল ইসলাম টিটু, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম ও ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মো. নাঈমুল ইসলাম খান সংবাদ সম্মেলনটি সঞ্চালনা করেন।