যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাচনী প্রচারের সময় রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনা আগামী ৫ নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গতিপথ পাল্টে দিতে পারে। রাজনৈতিক সহিংসতার দুঃখজনক এ ঘটনা অনিবার্যভাবে নির্বাচনী প্রচারে প্রভাব ফেলবে, যেমনটা ঘটেছিল সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্টের সঙ্গে।
১৯১২ সালে রুজভেল্টের ওপর যখন গুলি করা হয়, তখন তিনিও পুনর্নির্বাচিত হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। মিলওয়াকিতে নির্বাচনী প্রচারণার সময় রুজভেল্টের বুকে গুলি করা হলেও প্রাণে বেঁচে যান তিনি। আশ্চর্যজনকভাবে, দুদিন পর রিপাবলিকান কনভেনশনে অংশ নিতে সেই মিলওয়াকি শহরেই যাওয়ার কথা ট্রাম্পের। তার আগেই গুলিতে আহত হলেন তিনি।
রাইস ইউনিভার্সিটির ইতিহাসবিদ ডগলাস ব্রিঙ্কলির মতে, থিওডোর রুজভেল্ট যেখানে গুলি খেয়েছিলেন, সেই মিলওয়াকি শহরে গিয়ে ট্রাম্প সম্ভবত সবচেয়ে বড় মঞ্চ পাবেন। এর সঙ্গে একমত পোষণ করেন সাবেক রিপাবলিকান কৌশলবিদ স্টিভ শ্মিটও। তার কথায়, এ হত্যাচেষ্টার রাজনৈতিক পরিণতি হবে অপরিসীম। এটি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উপকৃত করবে, যিনি রুজভেল্টের মতো ঠিক একইভাবে গুলি খাওয়ার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিহাস বলছে, শনিবারের ঘটনায় ট্রাম্পের জনসমর্থন অবশ্যই বাড়বে। ১৯৮১ সালে রোনাল্ড রিগ্যান গুলিতে আহত হওয়ার পর তার জনসমর্থন একলাফে ৮ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। একই রকম ঘটতে পারে ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও।
ভ্যানটেজ পয়েন্ট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের চিফ ইনভেস্টমেন্ট অফিসার নিক ফেরেস বলেছেন, ‘এবারের নির্বাচনে ভূমিধস জয় দেখা যেতে পারে। এ ঘটনায় (ট্রাম্পকে হত্যাচেষ্টা) সম্ভবত অনিশ্চয়তা কমবে।’
এদিকে হামলার ঘটনায় সহানুভূতি পাওয়ার চেষ্টা করছেন ট্রাম্পের ছেলেমেয়েরা। হামলার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্পের রক্তাক্ত মুষ্টিবদ্ধ ছবি শেয়ার করে তার ছেলে এরিক ট্রাম্প লিখেছেন, ‘এ যোদ্ধাকেই আমেরিকার প্রয়োজন।’
মেয়ে ইভানকা ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, ‘আমি আমাদের দেশের জন্য প্রার্থনা করছি। আমি তোমাকে ভালোবাসি বাবা, আজ এবং সবসময়। আমার বাবা আমেরিকাকে বাঁচানোর জন্য কখনোই লড়াই বন্ধ করবেন না।’
ট্রাম্পের আরেক মেয়ে টিফানি আরিয়ানা ট্রাম্প সামাজিকমাধ্যমে লেখেন, ‘আমার বাবাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। রাজনৈতিক সহিংসতা কখনো সঠিক উত্তর হতে পারে না।’ ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে আরিয়ানা ট্রাম্প লেখেন, ‘আজ আপনি দেখেছেন, আমার বাবা কেমন যোদ্ধা। আমার বাবা আপনার জন্য এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবেন।’
ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনার জন্য বাইডেনের দিকে আঙুল তুলেছেন ট্রাম্পের কয়েকজন নিকটতম মিত্র ও সমর্থক। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ও রিপাবলিকান পার্টির নেতা মাইক কলিন্স বলেন, ‘এ হামলার উসকানিদাতা বাইডেন।’
ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের সম্ভাব্য রানিংমেটদের সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছেন সিনেটর জেডি ভান্স। তিনি মনে করেন, বাইডেনের নির্বাচনী বক্তব্য ট্রাম্পের ওপর হামলার মতো ঘটনা ঘটাতে সরাসরি প্রভাব রেখেছে। একই ধরনের বক্তব্য এসেছে আরও কয়েকজন রিপাবলিকান রাজনীতিকের দিক থেকেও। তাদের একজন বলেন, ‘ইতিমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি, এ ঘটনা কেন্দ্র করে যুদ্ধের রেখা আঁকা হচ্ছে, যা খুব কুৎসিত লড়াইয়ে পরিণত হতে পারে।’
নির্বাচনী বিতর্কে বাইডেন খারাপ পারফরম্যান্স করলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাজ্যগুলোয় বাইডেন ও ট্রাম্পের মধ্যে খুব কম পরিমাণে ব্যবধান দেখা গেছে। জরিপে দেখা গেছে, গত মাসে বাইডেনের দুর্বল বিতর্কের পারফরম্যান্সে ট্রাম্পও কিছুটা উচ্ছ্বসিত। যদিও ভোটারদের মধ্যে ফল তুলনামূলকভাবে কোনো পরিবর্তন হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত একটি এনপিআর/পিবিএস নিউজআওয়ার/মারিস্ট জরিপে দেখা যায়, বাইডেন ৫০ শতাংশ জনপ্রিয়তা নিয়ে ট্রাম্পের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। যেখানে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ছিল ৪৮ শতাংশ। তবে ট্রাম্পের ওপর হামলার ঘটনা নভেম্বরের নির্বাচনে একটি পার্থক্য তৈরি করতে পারে।
রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর গুলির ঘটনার পর এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে এগুলো বন্ধ করতে বলেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের সহিংসতার কোনো স্থান নেই। এটা অসুস্থ মানসিকতা। সবার উচিত এ ঘটনার নিন্দা জানানো।’
হামলার ঘটনায় বিবিসির নর্থ আমেরিকা এডিটর সারাহ স্মিথ বলেন, “হামলায় ট্রাম্পের আহত হওয়া এবং রক্তাক্ত অবস্থায় মুষ্টিবদ্ধ হাত ওপরে তুলে ‘ফাইট, ফাইট’ বলে হার না মানার অঙ্গীকার এবং সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টদের মাধ্যমে মঞ্চ থেকে তাড়াহুড়ো করে চলে যাওয়ার অসাধারণ এসব ছবি কেবল ইতিহাস তৈরিই নয়, এসব ছবি আগামী নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গতিপথও পরিবর্তন করতে পারে।”
বিবিসির নর্থ আমেরিকা করেসপন্ডেন্ট অ্যান্থনি জার্চার বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর হামলা দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যাম্পেইনকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে যখন কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা হয় তখন রাজনৈতিক মেরূকরণ ও ত্রুটিপূর্ণ কার্যক্রম দেখা যায়। যখন কোনো অস্ত্র কোনো ব্যক্তির ইচ্ছায় ব্যবহৃত হয় তখন এটি ইতিহাসের গতি-প্রকৃতি পাল্টে দিতে পারে। শনিবারের হামলার ঘটনার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র এবং এর রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতির ওপর কতটা হবে তা অনুমান করা কঠিন। কিন্তু এখন একটা বিষয় পরিষ্কার, নির্বাচনের বছরে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি নতুন মোড় নিল।