আর্থিক খাতের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখতে ব্যাংক ও ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিভিন্ন ধরনের পরিদর্শন চালায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর এই পরিদর্শনে প্রাপ্ত ফলাফলের ভিত্তিতে বিভিন্ন শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হতো। কিন্তু আর্থিক খাতে অনিয়ম না কমলেও ধীরে ধীরে এই পরিদর্শন কার্যক্রম সীমিত করে ফেলছে। এক বছরের ব্যবধানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন কমেছে ৪৭ শতাংশ। গ্রাহকদের অভিযোগ নি®পত্তির পরিমাণও কমছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, ঋণ কেলেঙ্কারি আর ঋণ বিতরণে পরিচালকদের অব্যাহত হস্তক্ষেপের মধ্যেই দেশের ব্যাংক খাতে পরিদর্শন কমিয়ে এনেছে আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক, যা খুবই হতাশাজনক। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনীহা প্রকাশ পাচ্ছে।
বর্তমান গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার ব্যাংকগুলো শৃঙ্খলার মধ্যে আনার প্রতিশ্রুতি দিলেও এর বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। উল্টো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়মিত পরিদর্শনগুলোর মধ্যেও হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। এমনকি গ্রাহকদের অভিযোগ নি®পত্তির জন্য তৈরি করা বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস ডিপার্টমেন্টের (এফআইসিএসডি) পরিদর্শনগুলোর জন্য এখন অনুমতি নিতে হচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। ফলে আমানতকারীদের অভিযোগ নি®পত্তিও কমেছে অনেকাংশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে ১৮টি, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২১টি। বিশেষায়িত ব্যাংকে কোনো বিশেষ পরিদর্শন হয়নি। আগের অর্থবছরে হয়েছিল একটি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শন হয়েছে ৫০টি, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১১৪টি। ইসলামি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোয় বিশেষ পরিদর্শন হয়েছে ২১টি, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৯টি। বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকে বিশেষ পরিদর্শন হয়েছে একটি, যা আগের অর্থবছরে হয়েছিল দুটি।
পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি অনিয়ম হওয়া আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিশেষ পরিদর্শন বেশি কমেছে। এগুলোয় বিশেষ পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে মাত্র চারটি। আর আগের অর্থবছরে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিশেষ পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল ১২টি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে এফআইসিএসডি কর্তৃক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় মোট ১৭৯টি বিশেষ পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছিল। আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিশেষ পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে ৯৪টি। সেই হিসাবে ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিশেষ পরিদর্শন কার্যক্রম কম পরিচালিত হয়েছে ৮৫টি বা ৪৭ শতাংশ। অথচ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রতিনিধিদল ব্যাংক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি ও ঋণ কেলেঙ্কারি ঠেকাতে ব্যাংকগুলোয় পরিদর্শন বাড়ানোর তাগিদও দিয়েছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য ও এর ওপর করা পরিদর্শনের প্রতিবেদনগুলো গ্রাহকদের জন্য উন্মুক্ত করতেও পরামর্শ দিয়েছে আইএমএফ।
তথ্য বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ বিভাগের কর্মকর্তাদেরও এখন কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে। কোনো গ্রাহক কিংবা অন্য কোনো ভুক্তভোগীর কাছ থেকে অনিয়ম-জালিয়াতির অভিযোগ এলেও তারা এখন স্বাধীনভাবে এগুলোর সমাধান করতে পারছেন না। ছোট ছোট কেসের সমাধান করতেও এখন ডেপুটি গভর্নরের (ডিজি) অনুমোদন নিতে হচ্ছে। আগে যেখানে সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরিচালকের অনুমতিতেই এসব বিষয় সুরাহা করতেন কর্মকর্তারা। এসব কারণে এখন কাজ করতে গিয়ে পদে পদে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ফলে কর্মকর্তাদের মধ্যে কাজে অনীহা, ক্ষোভ ও এক ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সাংবাদিকদের প্রবেশে বিধিনিষেধ আরোপের পর থেকেই এ ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। সাংবাদিক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর বিভিন্ন তথ্য প্রকাশও সীমিত করে ফেলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
মূলত, ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অনিয়ম শনাক্তকরণে কাজ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের এফআইসিএসডি। এ ছাড়া এফআইসিএসডি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের একমাত্র ডিপার্টমেন্ট, যেখানে গ্রাহকসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীও তাদের ব্যাংক লেনদেন-সংক্রান্ত যেকোনো অভিযোগ জানাতে পারেন। গ্রাহকরা ই-মেইল, অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপস, বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট, ডাক এবং কুরিয়ার পরিষেবার মাধ্যমেও তাদের অভিযোগ দাখিল করতে পারেন এফআইসিএসডিতে। মূলত তফসিলি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ জালিয়াতি ও অনিয়ম চিহ্নিতকরণে বিশেষ পরিদর্শন করে থাকে এফআইসিএসডি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রতিবেদন বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের চেয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে অভিযোগ বেশি এলেও সমাধান হয়েছে আগের তুলনায় কম। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এফআইসিএসডি মোট ১০ হাজার ৫৪২টি অভিযোগ গ্রহণ করে, যার মধ্যে সমাধান করেছে ৮ হাজার ৬৮২টি বা ৮২ শতাংশ। আর আগের অর্থবছরে অভিযোগ এসেছিল ৬ হাজার ৯২৩টি। সমাধান করা হয়েছিল ৬ হাজার ৩২৯টি বা ৯১ দশমিক ৪২ শতাংশ। সেই হিসাবে পরের অর্থবছরে অভিযোগ বেশি এসেছে ৩ হাজার ৬৫৯টি। সদ্য বিদায়ী ২০২৩-২৪ অর্থবছরে অভিযোগের সমাধান আরও কমেছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার যোগ দেওয়ার পর থেকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় পরিদর্শনের হার কমে আসছে। এমনকি বিভিন্ন গণমাধ্যমে কিছু ব্যাংকের ঋণ জালিয়াতি নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশের পর সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের গণহারে নোটিস করার ঘটনাও ঘটেছে। এতে কর্মকর্তাদের মধ্যে আতঙ্ক ও ক্ষোভ বিরাজ করছে, যা দিন দিন বাড়ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি প্রতিবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। এরপর ওই বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তাকে ব্যাপকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। এমনকি তাদের মোবাইলসহ ডিভাইস নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় অন্য বিভাগের কর্মকর্তারাও ক্ষুব্ধ।
খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় বিশেষ পরিদর্শনের পরিসংখ্যানই বলছে ব্যাংক খাতে সুশাসন নেই। পরিদর্শন কম হলেও অনিয়ম-জালিয়াতি কিন্তু কম হচ্ছে না। বিশেষ পরিদর্শন যত কমবে, অনিয়ম তত বাড়বে। তাই ব্যাংক খাতকে শৃঙ্খলায় আনতে পরিদর্শন, তদারকি ও নজরদারি আরও বৃদ্ধি করতে হবে।
কর্মকর্তারা জানান, এখন সব কাজেই গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নররা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছেন। আগে কোনো ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে কোনো ফাইলের কাজ করাতে হলে নির্বাহী পরিচালকরা সংশ্লিষ্ট বিভাগের পরিচালকদের মাধ্যমে যুগ্ম বা সহকারী পরিচালকদের দিতেন। এখন গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নররা সরাসরি যুগ্ম পরিচালকদের ফাইল রেডি করতে বলছেন। তারা যেভাবে চাচ্ছেন, সেভাবেই প্রতিবেদন তৈরি করতে হচ্ছে।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র সাইফুল ইসলাম বলেন, ব্যাংকের কোনো বিষয় পরিদর্শন করতে গেলে একটা নিয়মের মধ্যে যেতে হয়। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি নীতিমালা আছে। কোন বিষয়ের জন্য কার অনুমতি নেবে তা উল্লেখ আছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ অনেক জটিলতা এড়াতে গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নরদের জানায় এটা সব ক্ষেত্রে নয়।