চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠা-নামা করলেও কাস্টমস জটিলতায় প্রায় বন্ধ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা এবং তা নিরসনে সরকারের পদক্ষেপে পাঁচ দিনে প্রায় ১ হাজার ১০৮ কোটি টাকার রাজস্ব হারিয়েছে বন্দর-কাস্টমস। মূলত ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় থমকে আছে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে গত সোমবার সনাতন (ম্যানুয়াল) পদ্ধতিতে আমদানি পণ্য ছাড়ের নির্দেশনা দেওয়ার পর ইতিমধ্যে জ¦ালানি তেল ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লাবাহী ১৩টি জাহাজ ভেড়ানোর অনুমোদন দিয়েছে কাস্টমস। তবে কোনো রপ্তানি পণ্য জাহাজীকরণ করা যায়নি।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৮টা থেকে চট্টগ্রাম কাস্টমস অফিসের অভ্যন্তরীণ কম্পিউটারগুলোয় অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড (পণ্যের আমদানি-রপ্তানির আধুনিক শুল্কায়ন পদ্ধতির আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার) চালু করা হয়েছে স্থানীয়ভাবে। আর তা শুধু চট্টগ্রাম কাস্টমসের কাছে সীমাবদ্ধ থাকায় নতুন কোনো পণ্য অন্তর্ভুক্তি করা যাচ্ছে না। ফলে পণ্যের জাহাজীকরণ বন্ধ রয়েছে।
কাস্টমসের কম্পিউটারগুলোয় সকাল থেকে অ্যাসাইকুডা চালু করা প্রসঙ্গে সহকারী কমিশনার সুলতানুল আরেফিন গতকাল বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ম্যানুয়াল পদ্ধতি বা সেমি ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে আমরা কিছু আমদানি পণ্য ছাড়ের ব্যবস্থা করেছি। এ ছাড়া ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে মাতারবাড়ী ও চট্টগ্রাম বন্দরে ভেড়ার জন্য ১৩টি জাহাজকে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব জাহাজের বেশিরভাগ মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য কয়লাবাহী ও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের জ্বালানি তেলবাহী ছিল।’
তিনি বলেন, ‘পচনশীল আমদানিপণ্যগুলো রেফার কনটেইনারে (ফ্রিজার কনটেইনার) রয়েছে বলে সেগুলো নিরাপদ। তবে বন্দরের জেটিতে কনটেইনারের সংখ্যা বেড়ে জট বাড়তে পারে বলে আমরা পণ্য ছাড়ের চেষ্টা করছি।’
কিন্তু কাস্টমসের অভ্যন্তরীণ কম্পিউটারে অ্যাসাইকুডা সার্ভিস চালু করায় এখন থেকে কি ব্যবসায়ীরা এই সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারবেন? এই প্রশ্নের জবাবে সুলতানুল আরেফিন বলেন, ‘এটা শুধু আমাদের অফিসের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাইরের কম্পিউটারে এই সফটওয়্যার খোলা যাবে না। এতে অভ্যন্তরীণভাবে অর্ধ সমাপ্ত থাকা কাজগুলো আমরা এগিয়ে নিতে পারব, তবে নতুন তথ্য ইনপুট করা যাবে না।’
কনটেইনারজটের বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, বন্দরের ইয়ার্ডে ৫৩ হাজার একক কনটেইনার রাখার জায়গা থাকলেও গতকাল পর্যন্ত ৪১ হাজার ৬২০ একক কনটেইনার জমা হয়েছে। কনটেইনার ডেলিভারি না হলে বন্দরে জটের পরিমাণ বাড়বে।
দেশব্যাপী ইন্টারনেট না থাকায় গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে শুক্রবার থেকে। চট্টগ্রাম কাস্টমস এই বন্দর থেকে গত জুনে ৬ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা, মে মাসে ৬ হাজার ৫০২ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় করে। গড় হিসাবে প্রতি মাসে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়। প্রতিদিন গড়ে ২১৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় হয়। এই হিসাবে পাঁচ দিনে (শুক্রবার থেকে মঙ্গলবার) ১ হাজার ৮৩ কোটি ৩০ লাখ টাকার রাজস্ব হারিয়েছে চট্টগ্রাম কাস্টমস।
বন্দর সূত্র বলছে, চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন গড়ে ৯ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডেলিং হয়ে থাকে। প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ে বন্দরের চার্জ ৪৫ মার্কিন ডলার। সেই হিসাবে কনটেইনার হ্যান্ডেলিংয়ে বন্দরের রাজস্ব আদায় হয় ৪ লাখ ৫ হাজার মার্কিন ডলার (প্রতি ডলার ১১৭ টাকা হিসাবে ৪ কোটি ৭৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা)। বর্তমানে রপ্তানিপণ্য জাহাজীকরণ হতে না পারায় কনটেইনার হ্যান্ডেলিং কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। ফলে এক দিনে কনটেইনার হ্যান্ডেলিং বাবদ বন্দরের আয় কমেছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা ও বাল্ক পণ্যেও প্রায় সমপরিমাণ রাজস্ব হারিয়েছে। ফলে প্রতিদিন বন্দরের আয় কমেছে প্রায় পাঁচ কোটি টাকা। গত পাঁচ দিনে এই সংখ্যা প্রায় ২৫ কোটি টাকা হতে পারে। তাহলে পাঁচ দিনে বন্দর ও কাস্টমসের ক্ষতি প্রায় ১ হাজার ১০৮ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুল আলম সুজন বলেন, ‘টার্মিনাল অপারেটর সিস্টেম নামে বন্দরের নিজস্ব সফটওয়্যার রয়েছে, যা অনলাইননির্ভর। এ ছাড়া সিটিএমএস পদ্ধতি (২০০৪-০৫ সালে চালু হয়েছিল) রয়েছে কাস্টমসের সঙ্গে যুক্ত। অপরদিকে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্যের ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার পর কনটেইনারে ভর্তি করার অনুমতি পাওয়া যায়। এভাবে প্রায় সাত থেকে আটটি ধাপের পর পণ্যটি জাহাজীকরণের জন্য উপযোগী হয়। এর সব কটি ধাপ অনলাইনের মাধ্যমে হয়ে থাকে। আবার ব্যাংকের টাকা জমা দেওয়ার কাজটিও অনলাইনে হয়ে থাকে। এগুলোর সঙ্গে কাস্টমসের অ্যাসাইকুডা (পণ্য আদান-প্রদানের একটি আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার) সফটওয়্যারও রয়েছে। তাই অনলাইন ছাড়া আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চালু করা অনেকটা অসম্ভব হলেও বর্তমানে ম্যানুয়ালি পদ্ধতিতে কিছু আমদানি পণ্য খালাস করা হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়ে থাকে। প্রতিবছর প্রায় ৩২ লাখ একক কনটেইনার পণ্য হ্যান্ডেলিং করে এই বন্দর। বর্তমানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) ও জেনারেল কার্গো বার্থের (জিসিবি) পাশাপাশি পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) পরিচালনায় রয়েছে সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে।