দখল-দূষণের কারণে কমতে শুরু করেছে সোনারগাঁয়ের মেঘনা নদীর মাছ। প্রতি বছর এ নদী থেকে যে পরিমাণ মাছ আহরণ করা হতো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা ক্রমেই কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া এ নদীতে কয়েক প্রজাতির মাছ প্রায় বিলুপ্তির পথে। মেঘনায় মাছ কমে যাওয়ায় এখানকার জেলেরা তাদের পেশা বদল করে চলে যাচ্ছেন অন্য পেশায়। মাছ ছাড়াও মেঘনায় অন্যান্য জলজ প্রাণী হুমকির মুখে পড়েছে। মেঘনায় দূষণ বাড়ায় এই নদীতীরবর্তী জনগোষ্ঠীর ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বিভিন্ন পানিবাহিত রোগ ও চর্মরোগে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকে।
উপজেলার বারদী, বৈদ্যেরবাজার, পিরোজপুর ও শম্ভুপুরা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত মেঘনা নদী এ অঞ্চলের কৃষিকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি মৎস্য চাহিদাও পূরণ করে আসছে। যে চারটি ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে মেঘনা নদী প্রবাহিত হয়েছে সেসব ইউনিয়নে প্রায় অর্ধশত শিল্পকারখানা রয়েছে। এসব শিল্পকারখানা থেকে দূষিত বর্জ্য ফেলা হচ্ছে মেঘনায়। ফলে মেঘনার দূষণ ক্রমেই বাড়ছে।
বৈদ্যেরবাজার মাছঘাটের প্রবীণ মাছ বিক্রেতা বকুল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে মাছ ধরা ও মাছ বিক্রির সঙ্গে আমি জড়িত। আগে মেঘনা নদীর তীরে রামগঞ্জ গ্রামে প্রায় এক হাজার বর্মণ পরিবারের পেশা ছিল মাছ ধরা। এছাড়া আশপাশের গ্রাম ও নুনেরটেক এলাকায় আরও প্রায় তিন হাজার জেলে নিয়মিত মেঘনায় মাছ ধরে জীবন চালাত। এখন মেঘনায় আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না, নদীর চারদিকে শিল্পকারখানা হওয়ায় কারখানার দূষিত বর্জ্য সরাসরি মেঘনা নদীতে ফেলা হচ্ছে। ফলে মাছের পরিমাণ কমে গেছে। সবাই পেশা বদলে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন। এখন সব মিলিয়ে হাজার দেড়েক জেলে মেঘনায় মাছ ধরার পেশায় জড়িত আছে।’
নানা প্রজাতির মাছের জন্য মেঘনার সুনাম রয়েছে। বিশেষ করে মেঘনার বড় আকারের আইড়, রুই, কাতল, বোয়াল, চিতল, চিংড়ি, বাইম ও ইলিশ ক্রেতাদের বেশি আকর্ষণ করে। পাশাপাশি মেঘনা নদীর ছোট মাছের চাহিদাও অনেক। এখানকার বাইলা, পাবদা, টেংরা, পোয়া, কাঁচকি, কাজলি ও পুঁটি সুস্বাদু হওয়ায় স্থানীয়রা ছাড়াও ঢাকা থেকে অনেকেই মাছ কেনার জন্য মেঘনা তীরে এসে থাকেন। মেঘনার মাছ বিক্রির জন্য সোনারগাঁয়ে মেঘনাতীরবর্তী মোট পাঁচটি মাছের বাজার রয়েছে। তবে এখন মেঘনায় জেলেরা তেমন একটা মাছ না পাওয়ায় এসব বাজার আর আগের মতো জমজমাট নেই।
মেঘনায় মাছ ধরা জেলে নকুল চন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘এখন থেকে ১০/১৫ বছর আগেও মেঘনায় অনেক মাছ পাওয়া যেত। দিন দিন মেঘনার মাছ কমে যাচ্ছে। মাছের পাশাপাশি নদীতে আগে অনেক শুশুক দেখা যেত এখন সেগুলোও হারিয়ে গেছে। বেশ কয়েক প্রজাতির মাছ এখন আর জালে ধরা পড়ছে না। এগুলোর মধ্যে রিঠা, বোয়াল, বাঘাইড় অন্যতম।
সোনারগাঁ উপজেলার সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর সোনারগাঁয়ের মেঘনা নদী থেকে মৎস্য আহরণের পরিমাণ তিনভাগের এক ভাগ কমেছে। এর কারণ হিসেবে তিনি জানান, মেঘনায় কলকারখানার দূষিত বর্জ্য ফেলার কারণে মাছের প্রজনন কম হচ্ছে এজন্য মাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। মেঘনার কিছু কিছু মাছের প্রজাতি এখন বিলুপ্ত প্রায়। এগুলোর মধ্যে পাবদা, টেংরা, চিতল, গজার, বোয়াল, রিঠা বাঘাইড়সহ প্রায় ১০ প্রজাতির মাছ এখন মেঘনায় তেমন একটা পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যান্য মাছও এখন দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে অনেক জেলেই তাদের বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, আগে নদীর সঙ্গে আশপাশের খাল-বিলের সংযোগ ছিল। মাছ আগে সব জায়গায় বিচরণ করত। এখন সব খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের বিচরণক্ষেত্র নষ্ট হয়েছে। ফলে মাছের পরিমাণও কমে যাচ্ছে।