সরকারি চাকরির বাঁকবদল

বড় পরিবর্তন ঘটে গেছে সরকারি চাকরিতে। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে এই পরিবর্তন অনুমিত ছিল। কিন্তু তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে আচমকা বদল। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মনোযোগের কেন্দ্র ছিল প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে। তাদের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণিতে কোটা সংস্কারের দাবি ছিল নামমাত্র। এ নিয়ে অতীতে কখনোই বড় আন্দোলন হয়নি। আন্দোলনকারীদের দাবির মুখে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সঙ্গে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি থেকেও কোটা প্রায় তুলে দেওয়া হয়েছে।

সরকারের বর্তমান ও সাবেক সচিবরা এবারের কোটা সংস্কারকে সরকারি চাকরির বাঁকবদলের ইতিহাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, এই সংস্কার অবিশ্বাস্য। এত বড় পরিবর্তন তারা তাদের চাকরিজীবনে দেখেননি। সরকার চাপের মুখে এই সংস্কার আনলেও, তা অনিবার্য ছিল। এত বড় এবং জটিল কোটার বহর তারা পৃথিবীর কোনো দেশে খুঁজে পাননি। এই সংস্কারের ফলে ইতিবাচক পরিবর্তনের রাস্তা তৈরি হয়েছে বলেও মনে করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে সরকারের একজন সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোটাযুগ প্রায় শেষ হয়ে গেছে। কারণ ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পূরণ করা সম্ভব না। মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানরা চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা পার করেছেন। চাকরিতে প্রবেশ উপযোগী মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পাওয়াটা বিরল হতে পারে। তবে কার্যত কোটা শেষ হচ্ছে না। কারণ বিভিন্ন দপ্তরে কোটা বহাল আছে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক পদে ৬০ শতাংশ নারী নিয়োগ করতে হয়। রেলওয়েসহ আরও অনেক দপ্তরে পোষ্য কোটা রয়েছে। এসব কোটা ভিন্ন আইন বা বিধি দিয়ে নির্ধারিত। যতক্ষণ পর্যন্ত ওইসব আইন বা বিধি পরিবর্তন না হবে, ততক্ষণ তা কার্যকর থাকবে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব ও লোকপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সাবেক রেক্টর একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন নিও পাবলিক ম্যানেজমেন্টের যুগ। এই ম্যানেজমেন্ট দোকানের মতো। টাকা দিয়ে পণ্য নিতে হবে। সরকারও তাই। তবে সরকারকে বছরের শেষ বা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে টাকা বা কর দিতে হয়। নিও ম্যানেজমেন্টের জন্য কোয়ালিটি (মানসম্পন্ন) জনবল দরকার। সরকারের লোকজন শর্ত ঠিক করবে। কাজ করবে বেসরকারি সেক্টর। বেসরকারি সেক্টরের কাজ বুঝে নিতে চৌকস পাবলিক সার্ভেন্ট দরকার।

সাবেক এই সচিবের মতে, কোটা সংস্কারের বিষয়টি বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কোটা সংস্কার মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো। এই শ্রেণির কোটা সংস্কারের দাবি বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীরা করলেও কার্যত তা ছিল নামমাত্র। এ ক্ষেত্রে সরকার সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুসরণ করেছে। সরকারের হাতে ক্ষমতা থাকলেও তার প্রয়োগ করেনি।

গতকাল মঙ্গলবার জারি করা কোটা-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির চাকরিতে। এই দুই শ্রেণির চাকরিতে শতভাগ কোটা ছিল। গতকাল তা সাত ভাগে নামিয়ে আনা হয়েছে। এই দুই শ্রেণির চাকরিতে মেধাবীদের কোনো কোটাই ছিল না। গতকাল জারি করা প্রজ্ঞাপনে তা ৯৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিল ৩০ শতাংশ। নতুন প্রজ্ঞাপনে মুক্তিযোদ্ধা শ্রেণিকে একটু বিস্তৃত করা হয়েছে। শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদেরও এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নতুন করে তাদের কোটা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ শতাংশ। এই শ্রেণির চাকরিতে নারী কোটা নির্ধারিত ছিল ১৫ শতাংশ। নতুন ব্যবস্থায় তা শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। অনাথ ও প্রতিবন্ধী কোটা ১০ থেকে নামিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। আনসার ও ভিডিপি সদস্যদের জন্য ১০ শতাংশ চাকরি সংরক্ষিত ছিল, যা বাতিল করা হয়েছে। ৩০ শতাংশ জেলা কোটাও বাতিল করা হয়েছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে মেধা কোটা ছিল ৪৫ শতাংশ। তা বাড়িয়ে ৯৩ শতাংশ করা হয়েছে। এই দুই শ্রেণির চাকরির মুক্তিযোদ্ধা কোটাও আরও একটু বিস্তৃত করে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫ শতাংশ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতিবন্ধী কোটা ১ শতাংশ থাকলেও তা ছিল আলাদা। অর্থাৎ কোনো কোটায় পর্যাপ্তসংখ্যক প্রার্থী না পেলে সেই কোটা থেকে ১ শতাংশ যোগ্য প্রতিবন্ধীদের দিয়ে পূরণ করার বিধান ছিল। শর্তসাপেক্ষের সেই কোটা এবার সরাসরি কোটায় পরিণত হয়েছে। তবে এর সঙ্গে তৃতীয় লিঙ্গকেও যোগ করা হয়েছে। এই দুই শ্রেণির জন্য ১ শতাংশ কোটা সংরক্ষিত করা হয়েছে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নারী কোটার ক্ষেত্রে সুবিবেচনা করা হয়নি। এই ক্ষেত্রে আরও একটু সহনশীল হওয়া যেত। যদিও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কিছু নারী তাদের কোটার বিলোপ চেয়েছেন। আমি মনে করি, এখনো নারী কোটা তুলে দেওয়ার সময় আসেনি। নারীরা যে পিছিয়ে আছে তা একটা সরকারি অফিসে ঢুকলেই বোঝা যায়। অনেক অফিস আছে যেখানে ১-২ শতাংশ নারীকর্মী। অনেক ক্ষেত্রে নারীরা এগিয়ে থাকলেও সামগ্রিকভাবে তারা পিছিয়ে আছেন। একজন পুরুষ প্রার্থী পাঁচ থেকে সাতবার বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেন। কিন্তু খুব কম নারীর পক্ষেই দুবারের বেশি তিনবার বিসিএসে বসার সুযোগ হয়। সংসার সামাল দিয়ে তাদের পক্ষে চাকরিতে আসার রাস্তা এখনো সাবলীল না।’

একটি অধিদপ্তরের প্রধান অর্থাৎ মহাপরিচালক গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোটা সংস্কারের ফলে চাকরিতে নিয়োগ অনেক সহজ হবে। কোটার দোহাই দিয়ে অনিয়ম করা সহজ ছিল। এখন সেই রাস্তা বন্ধ হবে। মেধাবীরা সহজেই চাকরি পাবেন। সরকারের অনেক সচিব বা মন্ত্রী তাদের দপ্তরে বিপুলসংখ্যক পদ শূন্য থাকার পরও নিয়োগ দিতেন না। কারণ নিয়োগ দিতে গেলেই অনিয়ম করতে হবে। মন্ত্রী বা সচিব হিসেবে তাদের বদনাম হবে। এই ভয়ে তারা নিয়োগ দিতেন না। তা ছাড়া অনেক দপ্তরপ্রধান তদবির সামাল দিতে না পারার ভয়েও নিয়োগ থেকে দূরে থাকতেন।

কোটা সংস্কারের পর জেলা কোটা তুলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে এক জেলা থেকে অনেক বেশি কর্মকর্তা নিয়োগ পাবেন। আবার অনেক জেলা থাকবে শূন্য। এ বিষয়ে জানতে চাইলে জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া বলেন, কিছু জেলা এগিয়ে থাকবে। কারণ কিছু জেলা সুযোগ-সুবিধায় অন্য জেলা থেকে এগিয়ে। সুযোগ-সুবিধায় অনগ্রসর জেলা একটু পিছিয়ে থাকলেও এসব ছোটখাটো সমস্যা একসময় দূর হয়ে যাবে।

স্বাধীনতার পর সরকার সংবিধান প্রবর্তনের আগেই চাকরিতে কোটা পদ্ধতি প্রবর্তন করে। মুক্তিযোদ্ধা এবং বীরাঙ্গনা নারীদের সরকারি চাকরিতে নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়ার জন্য ১৯৭২ সালে কোটাপদ্ধতি চালু করা হয়। পরে সংবিধানেও পশ্চাৎপদ ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর সমতাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতেও এ কোটা পদ্ধতির বিষয়টি উল্লেখ করে। ধাপে ধাপে এই কোটাব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়। সরকারি চাকরিতে ১৯৭২ সালে কোটায় নিয়োগ হতো ৮০ শতাংশ। ১৯৭৬ সালের ৮ এপ্রিল প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণিতে মেধা কোটা ২০ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশে উন্নীত করা হয়। ১৯৮৫ সালের ২৮ জুলাই মেধা কোটা ৫ বাড়িয়ে ৪৫ শতাংশ করা হয়।