শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেওয়া হবে

সরকারি চাকরির সব গ্রেডে কোটা নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে গতকাল মঙ্গলবার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। একই সঙ্গে কোটা আন্দোলন নিয়ে সহিংস পরিস্থিতি ও সার্বিক বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে এক সংবাদ সম্মেলনে। এতে বলা হয়েছে, আন্দোলনকারী সাধারণ শিক্ষার্থীদের মামলার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে। ছাত্রছাত্রীদের সুরক্ষা ও শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করবে সরকার। আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার দেখভাল করা হবে। তবে আন্দোলনে সহিংসতার দায় আক্রমণকারীদের।

গতকাল মঙ্গলবার আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হকের গুলশানের বাসভবনে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন সরকারের তিন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রী। আনিসুল হকসহ আরও উপস্থিত ছিলেন জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে আনিসুল হক কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায়, আন্দোলন, সহিংস পরিস্থিতি, গত রবিবার আপিল বিভাগের রায়ের আলোকে প্রজ্ঞাপন জারি এবং সার্বিক পরিস্থিতিতে সরকারের অবস্থান বিস্তারিত তুলে ধরেন। এই প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে সরকারের তরফে করণীয় তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘কোটা সংস্কারের যে রায় আপিল বিভাগ দিয়েছেন, তা কিন্তু আমরা প্রতিপালন করেছি। একটা কথা ছিল আগের যে সহিংসতা হয়েছে তার জন্য একটা বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা। সেখানে বিচার বিভাগীয় তদন্তের জন্য এক সদস্যবিশিষ্ট একটা কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। কমিটি কাজ করা শুরু করেছে। অবস্থা একটু শান্ত হলে তিনি (তদন্ত কমিটির প্রধান) স্পটগুলো ঘুরে দেখবেন।’

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘এই যে সহিংসতা হয়েছে, এতে সাধারণ ছাত্রছাত্রী যারা আহত হয়েছেন, তাদের চিকিৎসার ব্যাপারে সরকার দেখভাল করবে। আর আমরা জানতে পেরেছি যে মামলার (শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে) ব্যাপারে ওনাদের (আন্দোলনের সমন্বয়ক) বক্তব্য আছে। আমরা এটা বলতে পারি, মামলার তথ্যাদি যদি ওনারা আমাদের দেন, তাহলে সাধারণ ছাত্রছাত্রী যারা এই কোটা বিরোধী আন্দোলন করছিলেন তাদের ব্যাপারে যদি কোনো মামলা হয়ে থাকে, সেগুলো অবশ্যই দেখব।’ তিনি আরও বলেন, ‘শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং ছাত্রছাত্রীদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার পরিবেশ সরকার তৈরি করবে।’

কোটা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি ও প্রাণহানি নিয়ে দেশ-বিদেশে বিভিন্ন মাধ্যমে নেতিবাচক আলোচনা প্রসঙ্গে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেহেতু শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মধ্যে সহিংসতা ঢোকানোর পরিকল্পনা আগে থেকেই হয়েছে। তাদের প্রস্তুতি ছিল যে তারা ডেটা সেন্টার জ্বালিয়ে দেবে। ইন্টারনেট থেকে দেশকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেটের অনুপস্থিতিতে আমরাও বিপদে পড়েছি। আমরাও কিন্তু বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারিনি। আমরা যখন পারিনি, তখন তাদের যে সিন্ডিকেট তারা গুজব ছড়াচ্ছে। আর যেহেতু তারা জানত তাদের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাংলাদেশে এ ধরনের পরিস্থিতি করবে, কাজেই তারা কিন্তু ব্যাকআপ (বিভিন্ন মাধ্যম) রেখেছিল। তারা কিন্তু এগুলো পাঠিয়েছে বিদেশে। এরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। ছাত্রদের সঙ্গে আমাদের যে শান্তিপূর্ণ আলোচনা ও সমাধান, সেটা কিন্তু বিভিন্ন মাধ্যমে নেই।’

সহিংসতার প্রস্তুতির পরেও দেশের প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থা ব্যর্থ হয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যেহেতু বিষয়টি সাবজুডিস ম্যাটার, সরকার ধৈর্য ধরতে বলেছিল। এখন তাই তো হলো। একটু ধৈর্য ধরলে তাদের আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা যে কর্মকা- করল, এটা আমরা গ্রহণ করতে পারছি না।’

আরেক প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘টিভি ভবনে হামলা হয়েছে, বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা হয়েছে। যখন আপনি আক্রান্ত হবেন, তখন আত্মরক্ষার্থে ফাইটব্যাক করতে হবে। আক্রমণকারীদের ফাইটব্যাক করতে গিয়ে সংঘর্ষ হয়েছে। সে সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। কাজেই হতাহতের জন্য আক্রমণকারীরাই দায়ী।’

একই প্রশ্নে আনিসুল হক বলেন, ‘আমরা অবশ্যই ধৈর্য ধরেছি। ধৈর্য ধরার কারণ হচ্ছে তারা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। আমরা এখনো চাইছি যে এই কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বাড়ি ফিরে যাক এবং এই ষড়যন্ত্র মোকাবিলার মতো যথেষ্ট শক্তি সরকারের আছে।’

কোটা আন্দোলন নিয়ে সহিংসতার ঘটনার বিচার কোন আইনে হবে, কিংবা দ্রুত বিচার আইনে হবে কি না এমন প্রশ্নে আনিসুল হক বলেন, ‘আইন যেটা লঙ্ঘন করা হয়েছে, সেই আইনে বিচার হবে। তদন্ত প্রতিবেদন আসুক, তারপর দেখা যাবে কোন আইনে বিচার হবে।’

আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কতজন শিক্ষার্থী মারা গেছে এবং নিহতদের পরিবারের বিষয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ থাকবে কি না এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশ্যে যখন ভাষণ (বুধবার) দেন, তখন তিনি বলেছেন। তখন যারা মৃত্যুবরণ (মঙ্গলবার ৬ জন) করেছিল, সেই হতাহতের ব্যাপারে তিনি বলেছেন ব্যবস্থা নেবেন। আমরা সে পথেই আছি।’

একই প্রশ্নে শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তথাকথিত আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যটা আমরা পরে দেখতে পেয়েছি। সেই আন্দোলনে কতটুকু আসলে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিল এবং দেশের কোন কোন জায়গায় শিক্ষার্থী ছিল এবং শিক্ষার্থীদের পেছনে কারা ছিল, সেটা নিরূপণ করছি। আর নিহত শিক্ষার্থীর সংখ্যাটা বলা যাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর। তবে এর আগেই আমরা একটা অ্যাসেসমেন্ট করছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যেটা দেখছি কিছুটা আছে তথ্য, কিছু আছে অপতথ্য এবং কিছুটা আছে গুজব। এই যে তথ্যের বিভ্রাট, সেটাকে ব্যবহার করে জনমনে সার্বক্ষণিক একটা আবেগ উত্তেজনা বা সেটাকে ব্যবহার করে নাশকতামূলক কাজগুলোর ক্ষেত্রে যে বিবেচনা, সেটা আমরা করছি। এগুলো সঠিকভাবে নিরূপণের পরেই জানা যাবে আসলে কারা কারা শিক্ষার্থী ছিলেন এবং কোন কোন প্রতিষ্ঠানের ছিলেন।’

সামনে পরিস্থিতির কোনো অবনতি হবে কি না এমন প্রশ্নে আনিসুল হক বলেন, ‘সমস্যার সমাধান যেহেতু করে দিয়েছি, আমাদের বিশ্বাস নতুন করে আর কোনো সমস্যা তৈরি হবে না এবং এই পরিস্থিতির অবনতি হবে না। যদি কোনো অপশক্তি পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করে, সেটার ব্যাপারে আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেব।’ জনজীবনে যখন স্বস্তি আসবে, তখনই কারফিউ প্রত্যাহার করা হবে বলে জানান তিনি।