গেল সপ্তাহে মোবাইলে এক সপ্তাহ মেয়াদি ইন্টারনেট ডেটা কিনেছিলেন রাজধানীর উত্তরা এলাকার বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম। মাত্র এক দিন ওই ডেটা ব্যবহারের পরদিনই মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ। এরই মধ্যে তার ডেটার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। এখন অব্যবহৃত ওই ডেটার কী হবে সেই প্রশ্ন আমিরুলের।
অন্যদিকে রাজধানীর ডেমরা এলাকার বাসিন্দা উৎপল রায়ের মোবাইলে এখনো ৪৭৩৭ এমবি ডেটা অবশিষ্ট রয়েছে, যার মেয়াদ শেষ হবে আগামীকাল বৃহস্পতিবার। এ সময়ের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট চালু না হলে তার ডেটাও থাকবে অব্যবহৃত। আবার চালু হলেও স্বল্প সময়ে এত ডেটা ব্যবহারও সম্ভব নয়। যদিও দুই-এক দিনের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট চালুর সম্ভাবনা নেই বলে জানা যাচ্ছে।
আমিরুল আর উৎপলের মতো কয়েক কোটি গ্রাহকের প্রশ্ন তাদের মোবাইল ইন্টারনেটের অব্যবহৃত ডেটার কী হবে?
এদিকে চলমান পরিস্থিতির কারণে বিভিন্ন ব্যাংকে যেসব গ্রাহক সময়মতো ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারেননি, তাদের কোনো ধরনের জরিমানা কিংবা বাড়তি টাকা দেওয়া লাগবে না বলে ব্যাংকগুলো আশ^স্ত করে বার্তা পাঠিয়েছে। তবে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহকদের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি অপারেটররা।
কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে গত ১৬ জুলাই সন্ধ্যা থেকে বিভিন্ন বিশ^বিদ্যালয় এবং গুরুত্বপূর্ণ কলেজ এলাকায় মোবাইল ইন্টারনেটের ফোরজি সেবা সীমিত করা হয়। পরদিন ১৭ জুলাই থেকে সারা দেশে বন্ধ করে দেওয়া হয় ইন্টারনেট সেবা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিটিআরসির নির্দেশে অপারেটররা এ পদক্ষেপ নেয়।
বর্তমানে দেশে মোবাইল ইন্টারনেট গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারের জন্য ৭ এবং ৩০ দিন মেয়াদের পাশাপাশি আনলিমিটেড ডেটা কেনার সুযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আনলিমিটেড ডেটা কেনার গ্রাহক খুবই কম। সবচেয়ে বেশি ডেটা কেনা হয় সাত দিন মেয়াদি। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষরা এক সপ্তাহ মেয়াদি এ ডেটা কিনে থাকেন। মোবাইলে ডেটা থাকার পরও মেয়াদ শেষ হলে তা আর ব্যবহার করা যায় না।
তবে মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একই প্যাকেজের ডেটা কিনলে নতুন ডেটার সঙ্গে আগের ডেটা যোগ হয়ে যায়। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার পর এটি আর যোগ হয় না। এ ক্ষেত্রে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গ্রাহক। জানতে চাইলে মোবাইল অপারেটর রবির চিফ করপোরেট অফিসার শাহেদ আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, এ বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ইন্টারনেট চালু হলে তখন আলোচনার মাধ্যমে বিবেচনা করা হবে বিষয়টি। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই গ্রাহকদের স্বার্থ দেখা হবে।
যোগাযোগ করা হলে গ্রামীণফোনের পক্ষ থেকে এক খুদে বার্তায় দেশ রূপান্তরকে জানানো হয়, ‘এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। গ্রাহকদের সাময়িক এ অসুবিধার জন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’
একইভাবে মোবাইল অপারেটর বাংলালিংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তারা বিষয়টি নিয়ে কোনো ধরনের আলাপ-আলোচনা করতে পারেননি। ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। সে ক্ষেত্রে গ্রাহকের স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি প্রাধান্য পাবে।
একমাত্র রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটক এ বিষয়ে কী চিন্তাভাবনা করছে, সেটি জানা সম্ভব হয়নি।
অপারেটররা বলছেন, তাদের ইন্টারনেটের ডেটার মেয়াদ এবং অব্যবহৃত টাকার কী হবে তা জানতে প্রতিদিন অসংখ্য গ্রাহক তাদের কলসেন্টারে ফোন করছেন। কিন্তু গ্রাহকদের আপাতত দুঃখ প্রকাশ ছাড়া কিছুই বলতে পারছেন না।
একাধিক মোবাইল অপারেটরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে তারা জানান, ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় গ্রাহকের পাশাপাশি তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর মাঝামাঝি কোনো অবস্থানে থেকে একটা সমাধান করা যায় কি না, সেটা তারা বিবেচনা করবেন। সে ক্ষেত্রে তারা দেখবেন, কতগুলো গ্রাহকের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এরপর সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বন্ধ থাকা সময়ের জন্য ডেটার মেয়াদ যদি বাড়াতে হয় তাহলে সেটিও তাদের সিস্টেমে হালনাগাদ করার প্রয়োজন পড়বে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির এক কর্মকর্তা গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা আমরা কিছু করতে পারব না। অপারেটররা একটা ব্যবস্থা করবে। এ ক্ষেত্রে তারা (অপারেটররা) গ্রাহকের স্বার্থ দেখবে বলে আশা করি।’
সাবেক ডাক ও টেলিযোযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রাহকের স্বার্থরক্ষা করা সরকারের পাশাপাশি অপারেটরদেরও দায়িত্ব। সুতরাং কোনো গ্রাহক ক্ষতিগ্রস্ত হলে বিটিআরসি সেটা বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারে। যেহেতু এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, সুতরাং ওই সময়ের অব্যবহৃত ডেটার মেয়াদ বাড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
রাজধানীর নিউ ইস্কাটন এলাকার একজন মোবাইল গ্রাহক আবু নোমান হাদী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সাধারণ মানুষ একটা কঠিন সময় পার করছে। ডেটা থাকার পরও তা নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে ব্যবহার করতে না পারার দায় তো গ্রাহকের নয়। তাহলে কেন লাখ লাখ গ্রাহক আর্থিক ক্ষতির শিকার হবেন। সরকারকে এর সুরাহা করা উচিত।’
প্রায় এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে দেশ জুড়ে ইন্টারনেট অচল থাকায় গুরুত্বপূর্ণ নানা কাজে ব্যাঘাত ঘটার পাশাপাশি অনলাইনে যোগাযোগ এবং তথ্য আদান-প্রদান পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে কখন ইন্টারনেট চালু হবে সেই অপেক্ষায় আছেন দেশের বেশিরভাগ মানুষ।