সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে (সব গ্রেডে) কোটার হার নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। গতকাল মঙ্গলবার এ প্রজ্ঞাপন জারি হয়। এতে সর্বোচ্চ আদালতে রায়ের আলোকে কোটার হার নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক। গতকাল তার গুলশানের বাসভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য গণমাধ্যমকে অবহিত করেন তিনি। জনপ্রশাসনমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন, শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, সরকার আদেশ জারি করছে যে, সমতার নীতি ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর প্রজাতন্ত্রের কর্মে প্রতিনিধিত্ব লাভ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অর্থাৎ সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত/আধা- স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, স্বশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ এবং বিভিন্ন করপোরেশনের চাকরিতে/কর্মে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সব গ্রেডে নিম্নরূপভাবে কোটা নির্ধারণ করা হলো। ক) মেধাভিত্তিক ৯৩%; খ) মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য ৫%; গ) ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ১% এবং ঘ) শারীরিক প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের জন্য ১%।
এতে আরও বলা হয়, নির্ধারিত কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে সংশ্লিষ্ট কোটার শূন্য পদ সাধারণ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা হবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি-১ শাখার ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর তারিখের পরিপত্র (কোটা বাতিলসংক্রান্ত পরিপত্র)সহ আগে জারি করা এ সংক্রান্ত সব পরিপত্র/প্রজ্ঞাপন/আদেশ/নির্দেশ/অনুশাসন রহিত করা হলো। এ আদেশ (প্রজ্ঞাপন) অবিলম্বে কার্যকর হবে বলে প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়।
প্রসঙ্গত, গত রবিবার প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ এক রায়ে কোটার হার নির্ধারণ করে আদেশ দেয়। তবে রায়ে বলা হয়, এ নির্দেশনা (কোটার হার নিয়ে) ও আদেশ সত্ত্বেও সরকার প্রয়োজন ও সার্বিক বিবেচনায় আদালত কর্তৃক (আপিল বিভাগ) নির্ধারিত কোটা বাতিল, সংশোধন বা সংস্কার করতে পারবে। আনিসুল হক কোটার নতুন এ হারকে সংস্কার হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, ‘সরকার সর্বোচ্চ আদালত আপিল বিভাগের রায় প্রতিপালন করেছে। আপিল বিভাগের রায়ের একটা দাড়ি, কমা, সেমিকোলন বদলানোর ক্ষমতা আমাদের নেই। যেহেতু সেটা নেই, তারা (আপিল বিভাগ) যেভাবে দিয়েছে আমরা সেভাবেই এটা প্রতিপালন করেছি।’
বিভিন্ন দপ্তরে কন্টাকচুয়াল নিয়োগের বিষয়টি এখানে আসবে কি না, এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘প্রজ্ঞাপনে কিন্তু বলা হয়েছে, সব গ্রেডে এবং পরিষ্কারভাবে চারটা ক্যাটাগরি করে দেওয়া হয়েছে। যেহেতু এটা আপিল বিভাগের রায়, তাই এর বাইরে সরকার যেতে পারবে না। আমাদের এ ধরনের কোনো অভিপ্রায়ও নেই।’ সরকারি চাকরির কিছু বিজ্ঞপ্তিতে আবেদনের শেষ সময় ৩১ জুলাই উল্লেখ করা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে কী পরিস্থিতি হবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্রজ্ঞাপনে কিন্তু স্পষ্ট বলা হয়েছে, এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর হবে। আমার মনে হয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় শেষ লাইনটাকে (প্রজ্ঞাপনের শেষ নির্দেশিকা) গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে দেখবে।’
ভবিষ্যতে কোটার হার নিয়ে সংস্কার বা পরিবর্তনের ব্যাখ্যা সংক্রান্ত প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আদালত যে বিষয়টা দৃষ্টিতে নিয়েছে সেটা হচ্ছে, কোটার ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া কিন্তু পলিসি ম্যাটার এবং আদালত সে পলিসি ম্যাটারের মধ্যে হস্তক্ষেপ করতে চায় না।’ তিনি বলেন, ‘সর্বোচ্চ আদালত অত্যন্ত বিচক্ষণ ও সুদূরপ্রসারী একটা রায় দিয়েছে। তার কারণ হচ্ছে, আদালত যদি নির্দেশ দিয়ে শেষ করে দিত তাহলে ভবিষ্যতের পরিপ্রেক্ষিতে যদি বদলাতে হতো তাহলে রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) করতে হতো। তখন রিভিউয়ে সময় চলে যেত। সর্বোচ্চ আদালত এটা বলেছে ভবিষ্যতের জন্য। এখন ভবিষ্যতে যদি কোনো সময় প্রয়োজন হয় যে, এটা পরিবর্তন, বাতিল করে দেওয়া বা এটা আরেকটু কমানোর প্রয়োজন হয়, তাহলে সেটা আমরা করব।’
এক প্রশ্নে আনিসুল হক বলেন, ‘কোটা নিয়ে কখনো কোনো আইন ছিল না। এটি সরকারের নীতিনির্ধারণী (পলিসি ম্যাটার) বিষয় এবং প্রজ্ঞাপন বা পরিপত্রের দ্বারাই বলা হতো।’ মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের সন্তান (নাতি-নাতনি) কোটার সুবিধায় আসবে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে তার কিছুই আমরা বদলাতে পারব না।’ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সংস্কার করেছি। এখন জনগণের প্রতি তাদেরও একটা কর্তব্য আছে যেটা তাদের করা উচিত। সেটা হলো, নিজ নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে গিয়ে তাদের পড়াশোনা করা উচিত।’
নারী কোটা নেই। আপিল বিভাগের রায় ও সরকারের প্রজ্ঞাপনের মধ্য দিয়ে কোটার সমস্যার সমাধান হয়ে গেল কি না, এমন প্রশ্নে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘নারীরাই তো এ আন্দোলনের সময় বলেছে, তারা যথেষ্ট ক্ষমতাবান। তাদের কোটার দরকার নেই। এখন আপিল বিভাগ যদি সেটা শুনে থাকে তাহলে তো আমাদের কিছু করার নেই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করি, কোটা সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে যে বক্তব্য দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল, যে সমস্যা তৈরি হয়েছিল সেটা দূর করা হয়েছে।’