সরকারের ভাষা এবং ভূমিকায় পরিবর্তন আনতে হবে

অর্থনীতিবিদ, সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। সম্প্রতি সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ জটিল পরিস্থিতি নিয়েছে। ইতিমধ্যে এই আন্দোলনে মাত্র তিনদিনে শিক্ষার্থী, সাংবাদিকসহ প্রায় শতাধিক নিহত হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কারফিউ জারি হয়েছে। সার্বিক বিষয় নিয়ে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী। 

দেশ রূপান্তর : দেশের পরিস্থিতি তো আপনি জানেনই। কোটা সংস্কার আন্দোলন এখন যে পরিস্থিতিতে উপনীত হয়েছে, এই আন্দোলন কোন দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ : আন্দোলনটি তো কোটা সংস্কারের দাবি থেকে অনেক দূর চলে গিয়েছে সরকারের কারণে। আন্দোলনটি হঠাৎ করে নয়, বেশ কিছুদিন আগে কোটা সংস্কারের মতো একটি যুক্তিসংগত দাবি নিয়ে শুরু হয়েছিল। কিন্তু গত ছয় বছর ধরে এই বিষয়ে সরকারের ভূমিকা ছিল খুবই অযৌক্তিক। প্রধানমন্ত্রী যে রাগ হয়ে কোটাই বাতিল করেছিলেন, সেটাও ভুল ছিল। যুক্তিসংগতভাবে কোটা সংস্কার করে ফেললে আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি হতো না। 

এখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি, যারা কোনো দল করে না, এই ধরনের ছেলেমেয়েরাই তো সংখ্যাগরিষ্ঠ, যারা কখনো কোনো আন্দোলনের মধ্যে থাকে না, যতই ইস্যু আসুক তাদের অনেকে তো কখনো কথাই বলে না, মিছিলেও কোনোদিন যায় না। এই ছেলেমেয়েরাই আজ অনেক বেশি ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ

দেশ রূপান্তর : শিক্ষার্থীদের দাবি তো ছিল সংস্কার, কিন্তু সেটাকে বাতিলের ট্যাগ দেওয়ার মধ্যে কি রাজনীতি বা ম্যানিপুলেশন দেখতে পান?

আনু মুহাম্মদ : গত বেশ কয়েক বছর ধরে আমাদের সমাজে একটা জিনিস দেখছি। যে কোনো শ্রেণি, ধরেন– সেটা শ্রমিক হোক, ছাত্র হোক কিংবা শিক্ষক সমাজ। সমাজের যে কোনো অংশ থেকে, যে কোনো শ্রেণি-পেশা থেকে কোনোরকম কোনো দাবি উঠলে, অধিকারের কথা উঠলে সরকার, বিশেষ করে সরকারের সর্বোচ্চ মহল খুবই বিরক্ত হন। এবং এই বিরক্তি ও দাবি-অধিকার জানানো অংশের প্রতি যে ক্রোধ, তার প্রকাশ এই কোটা আন্দোলনকারীদের ওপরও আমরা দেখছি। ১৮ এর কোটা আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে যেভাবে কোটা বাতিলের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, সেটা আমার মনে আছে। এটা যখন সরকার বাতিল করল, নিশ্চই সরকারের উচ্চ মহলের ধারণায় ছিল যে কোর্টে গেলে এটা টিকবে না। কারণ, সংবিধান অনুযায়ী এবং সাধারণ বিচার-বিবেচনা অনুসারে সরকারি চাকরিতে কিছু কোটার ব্যবস্থা তো থাকতেই হবে। সেখানে এটা বাতিল করা মানেই, সেটা অর্থাৎ বাতিলের ঘোষণা বা আদেশটি আইনগত ভাবে টিকবে না। আমার অনুমান, এই আইনগত দিকটি জেনেশুনে, বুঝেই তখন বাতিলের ঘোষণাটি দেওয়া হয়েছিল। তার ফলে সমস্যাটি থেকেই গেল। আর সেটাই আমরা নতুন করে দেখলাম যখন কোর্ট এটাকে, মানে কোটা বাতিলের ঘোষণাটিকে বাতিল করল।  

দেশ রূপান্তর : বিষয়টিতে তরুণ সমাজের এত প্রবল প্রতিক্রিয়া কেন?

আনু মুহাম্মদ : এ বিষয়ে তরুণ সমাজে এত প্রবল প্রতিক্রিয়া বলেন আর ক্ষোভ বলেন, প্রশ্ন হচ্ছে এত বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী কোটা আন্দোলনে কেন আসছে? এটা বোঝার চেষ্টা করতে হবে। এখন এর প্রধান কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের সমস্যা। আমরা প্রবৃদ্ধির হিসাব দেখছি, জিডিপি বাড়ছে, সরকার উন্নয়নের অনেক গল্প বলছে; কিন্তু সত্যি হচ্ছে, কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের জন্য কর্মসংস্থানের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। প্রায় ৩০/৪০ শতাংশ শিক্ষিত তরুণ বেকার। দেশের ইকোনমিক গ্রোথ হচ্ছে, কিন্তু মানুষের জব বা কর্মসংস্থান নেই। এটা গেল একটা দিক। অন্যদিকে, যতগুলো কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বা সুযোগ আছে, সেখানেও অনিয়ম। সেখানে চাকরির জন্য ঘুষ, টাকা-পয়সার লেনদেন করা লাগে, প্রশ্ন ফাঁস হয়। চাকরির বাজারে এত ব্যাপক আকারের দুর্নীতি ও অনিয়ম বিপুল সংখ্যক তরুণ ও তাদের অভিভাবকদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। একজন তরুণ সে যতই পড়াশোনা করুক, প্রস্তুতি নিক, সাধারণ ও স্বাভাবিকভাবে তার চাকরি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই বা সুযোগ খুবই সঙ্কুচিত। এই অবস্থা থেকে বাঁচার জন্য অনেকে বিদেশে চলে যাওয়ার মরিয়া চেষ্টা করে। অনেকে যোগ্যতার তুলনায় কম বেতন ও অপেক্ষাকৃত নিচু স্তরের কাজ করে। ফলে এসব ক্ষোভ তো সমাজের মধ্যে থেকেই যায়। আর উন্নয়নের যে মডেলে কর্মসংস্থান হয় না কিন্তু প্রবৃদ্ধি হয়, সেই মডেল তো আর শিক্ষার্থীদের পরিবর্তন করা সম্ভব না। সেক্ষেত্রে তারা দেখে যে, বিসিএস-এর মতো যে জায়গাটায় কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে সেটাকেও সংকুচিত করে রাখা হয়েছে এবং সেটাও তাদের হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। কারণ, তারা দেখছে এখানে ৫৬ ভাগ তাদের হাতেই নেই, কোটার মধ্যে চলে গিয়েছে।

দেশ রূপান্তর : আপনার কি মনে হয় স্রেফ সরকারি চাকরির জন্য এই আন্দোলন? 

আনু মুহাম্মদ : আন্দোলনটার শুরু হয়েছিল তো সেখান থেকেই। আমি মনে করি যে, কোটা সংস্কারের ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের বিপুল আগ্রহ এবং আন্দোলনে তাদের ব্যাপক বিস্ত…ত সমর্থনটা তৈরি হয়েছিল এ কারণেই, মানে কর্মসংস্থানের সমস্যা ও উন্নয়নের মডেল নিয়ে যেটা বললাম। পাশাপাশি, প্রতিটা আন্দোলন যখন শুরু হয় এবং তার প্রতি সরকারের প্রতিক্রিয়ার যে ধরন– সেটা ঝুলিয়ে রাখা থেকে শুরু করে, দীর্ঘসূত্রতা তাকে ভিন্ন মাত্রা দেয়। আর আমি মনে করি এই আন্দোলনের মধ্যে বিভিন্ন দলের এমনকি ছাত্রলীগেরও অনেক কর্মী ছিল, আবার কোনো দল করে না এমন শিক্ষার্থীও ছিল এবং তাদের সংখ্যাই বেশি। কিন্তু আমার মনে হয়, এই আন্দোলনে যে ছাত্রলীগের ছেলেরাও ছিল সেটা আওয়ামী লীগের নেতারা গুরুত্ব দিয়ে দেখেননি। ছাত্রলীগ করা ছাত্র কেন এই আন্দোলনে থাকবে? থাকবে, কারণ ছাত্রলীগ যারা করে তাদের একটা অংশ চাঁদাবাজি, টেন্ডার, কমিশন ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে এবং এটাই তাদের ভবিষ্যৎ; কিন্তু ছাত্রলীগ করে কিংবা করতে বাধ্য হওয়া একটা বড় অংশকে তো ভবিষ্যতে চাকরি করতে হবে। সুতরাং, এই ইস্যুতে তারাও যুক্ত। তো, আমরা যেটা দেখলাম সরকারের উচ্চমহল থেকে তাদের পাইকারিভাবে গালিগালাজ করার পরপরই আন্দোলনটা ভিন্ন মাত্রা পায়। তারপরে আরও খারাপ অবস্থা হয় যখন ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা শুরু করে। ওবায়দুল কাদের পরিষ্কারভাবে বললেন যে, ছাত্রলীগই তাদের শায়েস্তা করবে। ফলে এটা পরিষ্কার যে ছাত্রলীগকে আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে সিদ্ধান্ত নিয়েই। পরে আন্দোলনকারী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে ছাত্রলীগ একা পেরে না উঠলে, বাইরে থেকে লোক ভাড়া করে আনা হলো। তারা অস্ত্রসহ, লাঠিসোঁটা, হকিস্টিক নিয়ে আসে। এসবের ফলে প্রতিক্রিয়াটা ছাত্রছাত্রী পার হয়ে ব্যাপকভাবে সাধারণ মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে গেছে। আমরা দেখলাম হামলার ফলে আন্দোলন থেমে যাওয়ার বদলে ব্যাপক মাত্রা পেল, যা পরিষ্কার একটা গণঅভুত্থানে রূপ নিয়েছে।   

দেশ রূপান্তর : আমরা কর্মসূচির ক্ষেত্রে হরতাল, অবরোধ, ধর্মঘটের মতো শব্দ দেখে আসছি। কিন্তু এবার এই তরুণরা তাদের কর্মসূচিকে বলছেন ‘কমপ্লিট শাটডাউন’। এ নিয়ে আপনার মন্তব্য কী?

আনু মুহাম্মদ : আমার মনে হয় যে শব্দগুলো ক্লিশে হয়ে গেছে, সমাজের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছে কিংবা রাজনৈতিক দলগুলো যেগুলোর ঠিকমতো ব্যবহারও করতে পারেনি অথবা ব্যবহার করতে গিয়ে মানুষের মধ্যে অনাস্থা তৈরি করেছে– সেই শব্দগুলো তরুণরা আর ব্যবহার করতে চায় না। ফলে তারা নতুন নতুন শব্দ নিয়ে আসছে কর্মসূচি পালনে। 

দেশ রূপান্তর : ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির প্রেক্ষাপটটা কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

আনু মুহাম্মদ : এই কর্মসূচি তো আসছে অনেক পরে। যখন তারা রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে, তখন পর্যন্ত বিষয়টা সরকারের হাতেই ছিল। এমনকি আন্দোলনের মধ্যের অনেকেই প্রধানমন্ত্রী, সরকারের দিকে চেয়েছিল। তারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে সমাধানই চাচ্ছিল। তাছাড়া, এখনকার বেশ কিছু আন্দোলনে দেখা যায় যে, আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রীর কাছেই ভরসা চায় ও সমাধান আশা করে। আর এটা সবাই জানে যে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ ছাড়া বাংলাদেশে কিছু হয় না। 

দেশ রূপান্তর : ক্ষমতাসীন দল এবং সরকারও বিভিন্নভাবে এই আন্দোলনে তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশ করে নাশকতার অভিযোগ তুলছে। আন্দোলনটির কি আর ছাত্রদের হাতে আছে বলে মনে করেন?

আনু মুহাম্মদ : সিচুয়েশন তো এখন সরকারের হাতেও নেই। এখন পুরো পরিস্থিতিটা এমন হয়েছে যে কোথাও সরকারের এখন কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। ছাত্রদের আন্দোলনটিকে এই পরিস্থিতির দিকে সরকারই ঠেলে দিয়েছে। সরকারের উচ্চমহল এবং আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের বক্তব্য এবং ছাত্রলীগ, যুবলীগের আক্রমণাত্মক ভূমিকার মধ্য দিয়ে এই পরিস্থিতিটা তৈরি হয়েছে। এখন সমাজের মধ্যে তো বিভিন্ন রাজনৈতিক দল রয়েছে আর এই পরিস্থিতিতে তাদের বিভিন্ন রকম অংশগ্রহণ তো থাকতেই পারে। কোনো রাজনৈতিক দল বা মহল এটাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারও করতে পারে। এটা তো আবশ্যম্ভাবী। আর এটা যদি কেউ করেও থাকে, আমি বলব সরকারই সেই ব্যবস্থাটা করে দিয়েছে। ধরেন গত কয়েকদিনের ঘটনা পরম্পরা আমি একজন নাগরিক হিসেবে পরিষ্কার যেটা দেখলাম, সরকার কার্যত একটা যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ধরেন, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি নামানো হয়েছে। এই সবগুলো বাহিনীকে নামানো হলো কেন? প্রথমে চেষ্টা হয়েছে ছাত্রলীগ দিয়ে নিয়ন্ত্রণের। কিন্তু দেখা গেল ছাত্রলীগ পারেনি। কারণ, শিক্ষার্থীদের সংখ্যা এত বেশি যে, এখানে অন্য দলের কথা বললেই তো হবে না। এখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেশি, যারা কোনো দল করে না, এই ধরনের ছেলেমেয়েরাই তো সংখ্যাগরিষ্ঠ, যারা কখনো কোনো আন্দোলনের মধ্যে থাকে না, যতই ইস্যু আসুক তাদের অনেকে তো কখনো কথাই বলে না, মিছিলেও কোনোদিন যায় না। এই ছেলেমেয়েরাই আজ অনেক বেশি ক্রুদ্ধ, ক্ষুব্ধ, সক্রিয় এবং না খেয়ে না পড়ে, মার খেয়ে সব মোকাবিলা করছে। এই পরিস্থিতিটা তৈরি হয়েছে সরকারের কারণে। 

দেশ রূপান্তর : এবারের ঘটনায় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি ব্যাপক আকারে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ দেখলাম। কার্যত, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীদের প্রায় কোণঠাসা হয়ে পড়তে থাকলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমে পড়ে। এর মাধ্যমে আন্দোলনটি ক্যাম্পাস ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রশ্ন হচ্ছে- এই আন্দোলনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

আনু মুহাম্মদ : বিষয়টি অবশ্যই আমার পর্যবেক্ষণে এসেছে। এখন আপনাকে বুঝতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে সরকারের কী ধরনের প্ল্যান, সেটা। সরকার চায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তার পকেটে থাকবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কথা, চিন্তাকে সরকারের যেন গুরুত্ব দিতে না হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন সরকারকে কোনোরকম বিরক্ত করতে না পারে, সেজন্য প্রশাসনে বসানো হয়েছে কিছু মেরুদণ্ডহীন লোককে। উপাচার্যও বানানো হয়েছে এ ধরনের লোকদের। আর মাস্তানদের বসানো হয়েছে সবগুলো হলে। মাস্তান আর মেরুদণ্ডহীনদের দিয়ে সরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে দেখা যাচ্ছে প্রশাসন তো বটেই, ন্যূনতম শিক্ষকসুলভ যে আচরণ, সেটাও এই উপাচার্যদের কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। ক্যাম্পাসে তো পুলিশেরই ঢোকার কথা না। 

দেশ রূপান্তর : জাহাঙ্গীরনগরের উপাচার্য তো ছাত্রছাত্রীদের আশ্রয় দেননি। 

আনু মুহাম্মদ : সরকার তাকে জাহাঙ্গীরনগরের উপাচার্য করেছে যাতে করে সে তার ঠিকাদারদের দিয়ে তার অপরিকল্পিত উন্নয়ন কাজকে চালিয়ে নিতে পারে এবং ছাত্রলীগের কমিশন বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি এসব যেন ঠিকঠাক মতো হয়। এ ধরনের লোককে উপাচার্য বানালে যা হয়, সেটাই হয়েছে। তার বাসার ভেতরে গিয়ে আশ্রয়প্রার্থী ছাত্রছাত্রীদের ওপর সন্ত্রাসীরা আক্রমণ করল আর সেই ভদ্রলোক দরজা বন্ধ করে বসে থাকল। তার তো আর মুখ দেখানো উচিত না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যেরও কাছাকাছি অবস্থা। তিনি বললেন, সবকিছু তার নিয়ন্ত্রণে নেই। নিয়ন্ত্রণে যখন নেই তার তো পদত্যাগ করা উচিত। তবে এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়েরই কিছু সংখ্যক শিক্ষক, যারা শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্য, তারা ঢাকা, জাহাঙ্গীরনগর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রীদের পাশে যতটা সম্ভব দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন।   

দেশ রূপান্তর : প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির চিত্রটা তো

আনু মুহাম্মদ : এখানে কোনো কোনো প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির খুব ভালো ভূমিকা আমরা দেখলাম। তাদের প্রশাসনে ওই ধরনের মেরুদণ্ডহীন নিয়োগ হয়নি, ফলে তাদের কেউ কেউ শিক্ষার্থীদের দিকটি বিবেচনায় নিয়ে ভূমিকা রেখেছেন। তবে সবগুলো নয়, কেউ কেউ। মানে সবগুলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় যে ভায়োলেন্সের সময় শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছে তা নয়, কেউ কেউ। মানে এটা আসলে ডিপেন্ড করে আর কি, যেহেতু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রাইভেটলি অর্গানাইজড করা হয়। ফলে সেখানে কোন ব্যক্তি নিয়োগ পাচ্ছেন, সেই ব্যক্তির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করে। যেমন ব্র্যাকের যেসব শিক্ষক ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের আমি চিনি– এবং তারা ছাত্রদের পাশে দাঁড়ানোর মতোনই মানুষ, তারাও শিক্ষক নেটওয়ার্কের সদস্য। আমি বলতে চাচ্ছি যে, বাংলাদেশের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখনো এমন কিছু শিক্ষক রয়েছেন, তারাই আসলে শেষ ভরসা। তারা নিজেদের দায়দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন– সেটা প্রাইভেট হোক আর পাবলিক। এছাড়া, আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার- সাধারণত একটা ধারণা ছিল যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা বোধহয় রাজনীতি থেকে বাইরে বা দূরে থাকে, তাদের রাজনৈতিক বোধ নেই, সামাজিক দায় নেই। কিন্তু দেখা গেল- এটা ঠিক না, তারাও তো এই সমাজেরই অংশ। এবার যেটা দেখা গেল, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের যখন প্রায় সরিয়ে দেওয়া হলো, হল বন্ধ করে তাদের জোরপূর্বক বের করে দেওয়া হলো; তখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শহরের বিভিন্ন স্থানে নেমে পড়ল। নর্থ সাউথ, ইস্ট ওয়েস্ট, ব্র্যাকসহ সবগুলো ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা এগিয়ে এলো। অভূতপূর্ব পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে আসলে- এই আন্দোলনে পাবলিক, প্রাইভেট, কলেজ এমনকি স্কুলের ছেলেমেয়েরা নেমে পড়ল। শিক্ষার্থীদের এ রকম ব্যাপক অংশগ্রহণ আগে কখনো দেখা যায়নি। এখানে সরকারকে কৃতিত্ব দেওয়া যায় যে, সে-ই এই রকম একটা পরিস্থিতি তৈরি করেছে যে সব শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে পড়ল। 

দেশ রূপান্তর : প্রাণহানির মতো ঘটনার পর সরকারের দিক থেকে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের প্রতি সরকার আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। আগাম বেঞ্চ বসিয়ে কোটার বিষয়ে শুনানির তারিখ ২১ জুলাই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, সব ঘটনার তদ‡ন্ত বিচার বিভাগীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার এসব পদক্ষেপ নিতে দেরি করল কেন, যখন দেশের প্রায় সবাই কোটা সংস্কারের পক্ষে?

আনু মুহাম্মদ : না, সরকারের ক্ষেত্রে যে এই আন্দোলনের বেলাতেই প্রথম এমনটা করা হলো, তা তো না। গত বেশ কয়েক বছর ধরে যে কোনো দাবি, অধিকারের প্রশ্নে এমনটা করা হয়। জনগণের প্রতি কোনো সংবেদনশীলতা না থাকলে বা জনগণের প্রতি কোনো দায়িত্ববোধ না থাকলে কিংবা জবাবদিহি না থাকলে, মোট কথা সরকার জনগণকে কোনো গুরুত্ব না দিলে যা হয়, সেটাই হচ্ছে। এটা আগেও বহুবার আমরা দেখেছি, এবারও দেখলাম। সমাজে একটা দাবি-দাওয়া উঠেছে, কিন্তু সেটাকে পাত্তাই দেওয়া হয় না।  

দেশ রূপান্তর : তারা ৮০ ভাগ মেধা আর ২০ ভাগ কোটার প্রস্তাবও রেখেছে। কিন্তু এর আগে আদালতের বাইরে তো তারা যেতে পারবে না বলে জানিয়েছে।

আনু মুহাম্মদ : তারা আসলে জনগণকে হাইকোর্ট দেখাচ্ছে। হ্যাঁ, শুনলাম যে সরকার বলছে যে তারা নাকি কোর্টের বাইরে যেতে পারবে না। এখানে তো তারা যে নিজেদের কথাকেই খণ্ডন করছে। প্রথমে বলল আদালতের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়, পরে প্রস্তাব দিচ্ছে ২০ ভাগ কোটার। এমনকি বেঞ্চ বসিয়ে কোর্টও এগিয়ে আনল তারা। সব সিদ্ধান্ত তো সরকারই নিচ্ছে। কিন্তু অনেক মানুষের প্রাণ বিসর্জনের পর, আমরা এখনো জানি না যে ঠিক কত সংখ্যক মানুষ নিহত হয়েছেন এই তিন/চার দিনে। আহত হলো হাজার হাজার, দেশের সম্পদ নষ্ট হলো, অর্থনৈতিক ক্ষতি হলো... এসবের দায় কে নেবে? আর আদালত কীভাবে পরিচালিত হয়, সেটা তো বাংলাদেশের মানুষ জানে।

দেশ রূপান্তর : একদিকে সরকার আলোচনায় বসতে চাচ্ছে আবার শিক্ষার্থীরা কিছু শর্ত দিচ্ছে, আবার সরকার অন্যপথে যাওয়ার কথা বলছে, কারফিউ জারি হয়ে যেতে পারে (শুক্রবার কথা বলার সময় কারফিউ জারি হয়নি)...। সব মিলিয়ে এই পরিস্থিতির সমাধান কীভাবে হতে পারে বলে মনে করেন? 

আনু মুহাম্মদ : এখানে অন্যপথটা আসলে কী? ওবায়দুল কাদের সাহেবই তো বলেছেন যে, প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন যে হার্ডলাইনে যেতে। এখানে হার্ডলাইন মানে কী? আলোচনায় বসার প্রস্তাব দেওয়ার সময় তারা কি হার্ডলাইনে যাওয়ার কথা বলতে পারে? সরকার যখন আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছে, তখন আমরা দেখছি ঢাকা শহরের বিভিন্ন প্রান্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের ওপর গুলি হচ্ছে, গুলিতে ক্লাস টেনের ছাত্রও নিহত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষের রক্তাক্ত শরীর দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের অস্ত্র হাতে ঘুরতে দেখা যাচ্ছে। এমন না যে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার সময় তারা এগুলো প্রত্যাহার করেছে। এটা কিন্তু পাশাপাশি চলছে, এমন না যে এসব দৃশ্য আলোচনার প্রস্তাব দেওয়ার আগের ঘটনা... একদিকে বসার প্রস্তাব দিচ্ছে অন্যদিকে এমন অরাজক দৃশ্যের রচনা করছে। আবার প্রস্তাব দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা হার্ডলাইনে যাওয়ার কথা বলছে। এখন কী করে মানুষ আস্থাবোধ করবে। মানুষের আস্থার জায়গাটা তো সরকার পুরোপুরি নষ্ট করে ফেলেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো একটা আন্দোলনে এত কম সময়ে, মাত্র এত মানুষ নিহত হওয়ার ঘটনা নেই। বাংলাদেশ তো একটা গণঅভুত্থানের ইতিহাস। তো আমাদের ইতিহাস ঘেঁটে এত কম সময়ে এত হতাহতের ঘটনা পাবেন না। এখন এই সরকারের আসলে প্রতিনিধিত্বশীলতা নিয়েই প্রশ্ন রয়েছে, সে তো জোর করে ক্ষমতায় বসে আছে, আমি সেদিকে যাচ্ছি না। কিন্তু এই সরকার যদি দেশ চালাতে চায়, যদি তার জনগণের আস্থা অর্জন করতে হয়– তাহলে তার ভাব, ভাষা এবং ভূমিকায় পরিবর্তন আনতে হবে। 

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

আনু মুহাম্মদ : আপনাকেও ধন্যবাদ। 

(দেশে ইন্টারনেট ব্যাহত হওয়ায় কয়েকদিন দেশ রূপান্তর ডটকমে কোনো লেখা প্রকাশিত হয়নি। এসময় দেশ রূপান্তরের ই-পেপারও প্রকাশিত হয়নি। ফলে ২১ জুলাই প্রকাশিত লেখাটি আজ প্রকাশ করা হলো।)