নরসিংদীর বাবুরহাটে স্টেশনারির দোকান তৌহিদুল ইসলাম ভূঁইয়ার। বয়স ৩৫ বছর। কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে সংঘর্ষের খবর পেয়ে গত বৃহস্পতিবার দোকান বন্ধ করে বাড়িতে ফেরার জন্য বিকেল ৪টার দিকে ভেলানগরে এসে নামেন। তখন সেখানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছুড়ছিল পুলিশকে লক্ষ্য করে। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল ও ছররা গুলি ছুড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে পড়ে চোখে আঘাত পান তৌহিদুল। প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতাল, সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সর্বশেষ সে রাতেই আনা হয় তাকে রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে।
এসব তথ্য জানিয়ে তৌহিদুলের বড় ভাই মাহবুব ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চিকিৎসকরা বলেছেন, ‘আমার ভাইয়ের দুচোখ নষ্ট হয়ে গেছে। আর দৃষ্টি ফিরে পাবে না। এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যেতে চাই। সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোনো সাহায্য করে। স্ত্রী, ছোট ছোট তিনটা বাচ্চা ওর। কীভাবে যে চলবে?’
তৌহিদুলের মতো কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে চোখে আঘাত পান কুমিল্লার আব্দুল হান্নান। তার বয়স ৩২ বছর। ফেনীতে তার দোকান আছে। গত শুক্রবার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের খবর পেয়ে দোকান বন্ধ করে দৌড় দেন তিনি। সে সময় তার চোখে আঘাত লাগে। সেখান থেকে তাকে প্রথমে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ঢাকায় আনতে বললে সে রাতেই তাকে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আনা হয়। তার চোখে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, এখনো বোঝা যাচ্ছে না হান্নান পুরো দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাবেন কি না।
হান্নানের বড় ভাই মীর হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে চিকিৎসা চলছে। অস্ত্রোপচার করেছে। ডাক্তার বলেছে আরও কয়েক দিন থাকতে হবে। টাকা অনেক গ্যাছে। আমার ভাই রাজনীতি করে না। সাধারণ মানুষ। সহিংসতার মধ্যে পড়ে গেছে। আমাদের নসিবে ছিল!’
শুধু তৌহিদুল বা হান্নানই নন; দেশ জুড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে দুর্বৃত্তদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের সময় এভাবেই চোখে আঘাত পেয়েছেন অসংখ্য মানুষ। তাদের মধ্যে গত ১৭ জুলাই (বুধবার) থেকে গত ২৩ জুলাই (মঙ্গলবার) পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এসেছেন ৪২৯ জন। তাদের মধ্যে ভর্তি করা হয়েছে ৩২৩ জনকে। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে ২৯১ জনের। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০-১২ রোগী।
সরেজমিনে গতকাল বুধবার হাসপাতাল ঘুরে, রোগী ও চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে কতজন আন্দোলনকারী ও কতজন সাধারণ মানুষ, তা চিহ্নিত করা যায়নি। বেশ কিছু রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়েও দেওয়া হয়েছে। এসব রোগীর ব্যাপারে স্থানীয় থানা বা পুলিশকে অবহিত করার কোনো নির্দেশনা ছিল না হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের কাছে। তবে রোগীরা সবাই জানিয়েছেন, তারা সংঘর্ষের মাঝখানে পড়ে আহত হয়েছেন।
আন্দোলন চলাকালে চিকিৎসা পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়ে হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। এটা বাংলাদেশের চক্ষু রোগের একমাত্র হাসপাতাল, যেটার ইমার্জেন্সি ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। চিকিৎসক, নার্সসহ অন্য স্টাফরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ১১টা টেবিলে অস্ত্রোপচার শুরু করেন। রাত-দিন টানা ২৪ ঘণ্টা চিকিৎসা দেন তারা। আমাদের যারা যারা এ ধরনের অস্ত্রোপচারে পারদর্শী, সব চিকিৎসক এসেছেন। যেভাবে ভিড়, চাপ ছিল, এতগুলো অস্ত্রোপচার করতে হয়েছে, রোগীর সঙ্গে এসেছে ১০-১৫ জন করে, সামাল দিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।’ চিকিৎসক আনা-নেওয়ার সময় রাস্তায় হাসপাতালের একটি অ্যাম্বুলেন্সও দুর্বৃত্তরা ভাঙচুর করেছে বলেও জানান তিনি।
বেশি ভর্তি বৃহস্পতি-শুক্রবার : হাসপাতালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি রোগী এসেছে ১৮ ও ১৯ জুলাই অর্থাৎ গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার। বৃহস্পতিবার হাসপাতালে আসেন ১৫১ জন। তাদের মধ্যে ভর্তি করা হয় ১৪৩ জনকে, অস্ত্রোপচার করা হয় ৬৬ জনের। পরদিন শুক্রবার আসেন ১০৩ জন। তাদের মধ্যে ভর্তি করা হয় ৬৩ জনকে ও অস্ত্রোপচার করা হয় ৯৩ জনের।
এর আগে আন্দোলন চলাকালে আহত হয়ে প্রথম রোগী আসেন ১৭ জুলাই ৪ জন ও তাদের সবাইকে ভর্তি ও অস্ত্রোপচার করা হয়। এরপর ২০ জুলাই রোগী আসেন ৭১ জন, ভর্তি করা হয় ৫৮ জনকে, অস্ত্রোপচার করা হয় ৬৮ জনের। ২১ জুলাই রোগী আসেন ৬৫ জন, ভর্তি করা হয় ৪০ জনকে, অস্ত্রোপচার হয় ২৫ জনের। ২২ জুলাই আসেন ৩০ রোগী, ভর্তি করা হয় ১০ জনকে ও অস্ত্রোপচার হয় ২২ জনের। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই সংঘর্ষে আহত হয়ে হাসপাতালে আসেন পাঁচজন ও তাদের সবাইকে ভর্তি করা হয়। সেদিন পুরনো ও নতুন রোগী মিলে অস্ত্রোপচার হয় ১৩ জনের।
কর্নিয়া ও পাশের সাদা অংশে আঘাতপ্রাপ্ত রোগী বেশি : হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, বেশিরভাগ রোগীর কর্নিয়া ও কর্নিয়ার পাশে যে সাদা অংশ সেখানে আঘাত লেগেছে। রোগীদের আঘাতের যে ধরন, সেটার ওপর নির্ভর করবে তার ভবিষ্যৎ। ফলোআপ শেষে বিস্তারিত বলা যাবে।
একেবারে চোখ নষ্ট হয়ে গেছে অর্থাৎ দৃষ্টিশক্তি চলে গেছে এমন রোগীও আছে বলে জানান পরিচালক। তিনি বলেন, ‘হাতাহাতির ফলে আহত রোগীর সংখ্যা বেশি দেখা যায়নি। ছররা গুলিতে আহত রোগীর সংখ্যা বেশি। এইধরনের রোগীর চোখের ভেতর গিয়ে ছররা গুলি যদি রেটিনায় আঘাত করে, অনেক সময় দৃষ্টি ফিরে আসে না। আবার যদি এ ধরনের গুলি রেটিনার মাঝখানে গিয়ে বসে থাকে বা আঘাত করে বের হয়ে যায়, তখন আংশিক দৃষ্টিহীনতা দেখা দেয়। চিকিৎসা করতে করতে অনেক সময় দৃষ্টি ফিরে আসে। এজন্য আমরা সবাইকে ফলোআপ চিকিৎসা নিতে বলেছি। ছয় সপ্তাহ পর চোখের প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে। কারণ ছররা গুলির আঘাতে চোখের ভেতর হেমোরেজ বা রক্তক্ষরণ হয়। চোখের ভেতর প্রদাহ হয়। এসব কারণে ঠিক কী পরিমাণ রোগীর আংশিক বা পুরো দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে, তা ফলোআপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বলা যাবে না।’
পরিচালক জানান, আন্দোলনে আহত রোগীদের সবাইকে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। তবে রোগীর চাপ বেশি ও জরুরি অস্ত্রোপচারের কারণে রোগীদের বাইরে থেকেও ওষুধ আনতে হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন ১০-১২ জন।
পুলিশকে জানানোর নির্দেশনা ছিল না : আন্দোলন চলাকালে হাসপাতালে আসা বেশ কয়েকজন রোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে দুর্বৃত্ত থাকতে পারে এবং এসব রোগীর ব্যাপারে পুলিশকে জানানো উচিত ছিল বলে মনে করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের কয়েকজন চিকিৎসক।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে হাসপাতাল পরিচালক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের রোগী হাসপাতালে এলে তাদের ব্যাপারে স্থানীয় থানাকে তথ্য দেওয়ার ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা নেই। আঘাতের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিই অথবা ভর্তি করাই। মানবিক দিক বিবেচনায় রোগী এলে তাকে চিকিৎসা দিতে হয়। আমরা সে কাজটাই করেছি।’
হাসপাতালে না থাকার অভিযোগ অস্বীকার পরিচালকের : হাসপাতালের চিকিৎসকরা দেশ রূপান্তরের কাছে অভিযোগ করেছেন, চরম সহিংসতা, ধ্বংসযজ্ঞ ও হামলা চলার প্রথম চার দিন অর্থাৎ বৃহস্পতি থেকে রবিবার পর্যন্ত পরিচালক হাসপাতালে ছিলেন না। অথচ এই চার দিন হাসপাতালে আন্দোলনে আহত রোগীদের চাপ সবচেয়ে বেশি ছিল। এমনকি গত রবিবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. রোকেয়া সুলতানা হঠাৎ হাসপাতাল পরিদর্শনে এলেও পরিচালক হাসপাতালে ছিলেন না। এ সময় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী পুরো হাসপাতাল ঘুরে দেখেন ও আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
ঘটনার চার দিন হাসপাতালে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম মোস্তফা। তিনি বলেন, ‘মিথ্যা কথা। এতগুলো অস্ত্রোপচার হয়েছে, এগুলোর ব্যবস্থা করতে হয়েছে। ফোনে ছিলাম, শারীরিকভাবেও এসেছি। আমার নির্দেশ ছাড়া তো এসব হয় না। কোন রোগীর অস্ত্রোপচার করতে হবে, কাকে ছাড়তে হবে, কোন কোন ডাক্তারকে কাজে লাগাতে হবে, এসব তো আমার নির্দেশনায় হয়েছে। আমার ছুটি ছিল। বুধবার সরকারি ছুটি ছিল। বৃহস্পতিবার ছুটি নিয়েছিলাম। সেই ছুটি বাতিল করে হাসপাতালে এসেছি। আমি নিজে তো অস্ত্রোপচার করিনি। কিন্তু ব্যবস্থাপনাটা গুরুত্বপূর্ণ। সেটাই করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী হঠাৎ চলে এসেছেন। পরে আমি শুনে এসেছিলাম। কিন্তু ততক্ষণে মন্ত্রী চলে গেছেন। মন্ত্রীকে সমস্ত তথ্য জানানো হয়েছে।’