দেশব্যাপী সাম্প্রতিক ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও নৃশংসতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তার আশঙ্কা ছিল এ ধরনের একটা আঘাত আসবে। তিনি আরও বলেন, সমৃদ্ধির পথে দেশের অগ্রযাত্রা রুখে দিতে বিএনপি-জামায়াত জোট এ ধরনের হামলা করতে পারে।
গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী তার কার্যালয়ে (পিএমও) এডিটরস গিল্ড আয়োজিত বিভিন্ন গণমাধ্যমের সম্পাদক, সিনিয়র সাংবাদিক এবং হেড অব নিউজদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এসব কথা বলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘তারা (বিএনপি-জামায়াত) আমাদের নির্বাচন করতে দিতে চায়নি, কিন্তু আমরা নির্বাচন করেছি। নির্বাচনের পর এটা সবাই মেনে নেবে না, সেটাও আমরা সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে দিয়েছি, আমরা সরকার গঠন করেছি। আমার একটা আশঙ্কা ছিল যে, এ রকম একটা আঘাত আসবে।’
তিনি আরও বলেন, ২০১৩-১৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে বিএনপি-জামায়াত চক্র অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল, ফলে শত শত মানুষ নিহত ও হাজার হাজার লোক আহত হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বোধগম্য যে এটি (শিক্ষার্থীদের কর্মকাণ্ড ও আন্দোলন) একটি গুরুতর ষড়যন্ত্র।’ শেখ হাসিনা বলেন, তিনি এমন কোনো ঘটনা দেখতে চান না, যা দেশে অস্থিতিশীলতা বা কোনো অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। কারণ তাদের লক্ষ্য ছিল দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করা। তিনি দেশের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিকে পঙ্গু করার লক্ষ্যে এই বিপর্যয়কে সমর্থনকারী লোকদের বোধবুদ্ধির স্তর নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, স্বার্থান্বেষী মহল দেশের স্বাধীনতা এবং ১৫ বছর ধরে চলমান গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বিনষ্ট করতে অত্যন্ত আগ্রহী। ছাত্ররা যখন মাঠে ছিল, তখন তিনি কখনোই সেনাসদস্যদের মোতায়েন করতে চাননি। তিনি বলেন, ‘তারা (ছাত্ররা) ঘোষণা করেছিল যে তারা চলমান নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নয়, তখন আমরা সেনাবাহিনীকে ডেকেছি।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, তিনি কারফিউ আরোপ করতে চাননি, কারণ দেশ ১৫ বছর ধরে একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যারা দেশের জন্য এই ক্ষতি করেছে, তাদের প্রতিহত করার জন্য তিনি জনগণের প্রতি আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণের কল্যাণ ও জীবিকা নির্বাহের জন্য যেসব স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে, তারা তা ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা সব কাঠামোতে আঘাত করেছে। যারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারা অবশ্যই গণমানুষ। এখন এসব সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদকে প্রতিহত করার দায়িত্ব জনগণের। এই ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, ‘জনগণ যদি সচেতন না হয়, তাহলে আমরা কী করতে পারি বা আমরা একা কতটা করতে পারি।’ সাম্প্রতিক ধ্বংসযজ্ঞের টার্গেট ছিল আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি, যোগ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোটা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সব দাবি যখন মানা হলো, তখন তারা কেন জঙ্গিদের এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডের সুযোগ দিল। তিনি আরও বলেন, ‘কোটা আন্দোলনকারীদের একদিন জাতির কাছে জবাব দিতে হবে, কেন তারা তাদের দেশের এই ধ্বংসযজ্ঞের সুযোগ দিল।’
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মো. নাঈমুল ইসলাম খান অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন এবং স্বাগত বক্তব্য দেন এডিটরস গিল্ডের সভাপতি মোজাম্মেল হক বাবু।
সিনিয়র সাংবাদিক আবেদ খান, বাংলাদেশ প্রতিদিন সম্পাদক নঈম নিজাম, ডিবিসির প্রধান সম্পাদক মনজুরুল ইসলাম, ভোরের কাগজ সম্পাদক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শ্যামল দত্ত, দৈনিক যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম, জাতীয় প্রেস ক্লাব সভাপতি ফরিদা ইয়াসমিন, ঢাকা জার্নালের প্রধান সম্পাদক সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা, নাগরিক টিভির হেড অব নিউজ দীপ আজাদ, আমাদের সময় সম্পাদক মাইনুল আলম, বাংলাদেশ জার্নালের সম্পাদক শাজাহান সরদার, ডিবিসির বার্তা সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু, ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির আশীষ সৈকত, বাংলা ট্রিবিউন সম্পাদক জুলফিকার রাসেল, ৭১ টিভির হেড অব নিউজ শাকিল আহমেদ, এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার এডিটর মোল্লা আমজাদ, কিংস নিউজের হেড অব নিউজ নাজমুল হক সৈকত, আরটিভির মামুনুর রহমান খান প্রমুখ বক্তব্য দেন।
মালয়েশিয়াকে গাড়ির কারখানা স্থাপনের আহ্বান : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মালয়েশিয়াকে তাদের পেরোডুয়া ব্র্যান্ডের গাড়ির কারখানা বাংলাদেশে স্থাপনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার সকালে মালয়েশিয়ার বিদায়ী হাইকমিশনার হাজনাহ মো. হাশিম প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তার সঙ্গে বিদায়ী সাক্ষাৎ করার সময় শেখ হাসিনা এ আহ্বান জানান।
পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মোহাম্মদ নাঈমুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন।
বৈঠকে হাজনাহ মো. হাশিম বলেন, স্থানীয় পিএইচপি মোটরস বাংলাদেশে মালয়েশিয়ান ব্র্যান্ড পেরোডুয়া গাড়ির অ্যাসেমব্লিং (সংযোজন) করছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শুধু সংযোজন না করে গাড়িটি পুরোপুরি বাংলাদেশে উৎপাদন করার কথা বলেন।
পিএইচপি পরিবারের পিএইচপি মোটরস মালয়েশিয়ার একটি শীর্ষস্থানীয় অটোমোবাইল ব্র্যান্ড পেরোডুয়ার সঙ্গে তাদের গাড়ি ও এসইউভিগুলো বাংলাদেশে একত্র করে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করার জন্য চুক্তি করেছে।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও হাইকমিশনার জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমল থেকে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও বিদ্যমান সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন।
কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে হাজনাহ মো. হাশিম প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে আপনার সামর্থ্যরে ওপর আমার আস্থা আছে। আপনি পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে ও ভালোভাবে মোকাবিলা করছেন আর এটি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়।’
মালয়েশিয়ান হাইকমিশনারকে উদ্ধৃত করে প্রেস সচিব বলেন, ‘তিনি দেখছেন সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’
হাজনাহ মো. হাশিম বলেন, বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। এই বিনিয়োগ মূলত দুটি টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি রবি ও এডটকো বাংলাদেশের এবং তারা এখানে তাদের মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ করেছে।
শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে মালয়েশিয়ার বেশ কিছু শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এ বিষয়ে হাইকমিশনার প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
মালয়েশিয়ার স্বাস্থ্য সুবিধার কথা তুলে ধরে হাইকমিশনার বলেন, তাদের অনেক হাসপাতাল সিঙ্গাপুরের কাছাকাছি। তবে চিকিৎসাসেবা বিবেচনা করলে খরচ সে তুলনায় কম। তাই বাংলাদেশিরা সেখানে স্বাস্থ্য সুবিধা নিতে পারেন। কারণ সিঙ্গাপুরের ৭০ জনেরও বেশি চিকিৎসক মালয়েশিয়ার।
অ্যাম্বাসাডর-অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এম তোফাজ্জেল হোসেন মিয়া এ সময় উপস্থিত ছিলেন। বাসস