প্রভাত এলো তবে শোকের

‘...তুমি এই দিনে পৃথিবীতে এসেছো শুভেচ্ছা তোমায়’ জন্মদিন মানেই একটি গান একটি কণ্ঠস্বর। যে কণ্ঠ অজস্র জন্মদিনে বেজেছে বাজবে, থেমে গেল সেই কণ্ঠ। চলে গেলেন জনপ্রিয় ব্যান্ড শিল্পী শাফিন আহমেদ। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় একটি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। তিনি গেয়েছিলেন ‘প্রতি রাত নির্ঘুম রাত, আসে না কিছুতেই প্রভাত।’ প্রভাত হয়তো এলো শোকের ছায়া হয়ে। তিনি কিংবদন্তি শিল্পী ফিরোজা বেগমের দ্বিতীয় সন্তান।

জানা যায়, শাফিন আহমেদ দুই সপ্তাহ আগে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরিকল্পনা ছিল দেশটির কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গান করবেন। কিন্তু দ্বিতীয় কনসার্টের আগেই ধাক্কা খেলেন। ৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন শাফিন আহমেদ। একটি কনসার্টে গানও পরিবেশন করেন। ২০ জুলাই ভার্জিনিয়াতে তার আরেকটি স্টেজ শোতে পারফর্ম করার কথা ছিল। সেদিন অনুষ্ঠানের আগে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়। শাফিনের বড় ভাই হামিন আহমেদ জানান, ম্যাসিভ (গুরুতর) হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল শাফিন আহমেদের।

হামিন বলেন, অনুষ্ঠানের দিন ২০ জুলাই ভার্জিনিয়ার হোটেলে আয়োজকরাসহ বসেছিলেন। তখনই শাফিন জানান, তার শরীরটা খারাপ লাগছে। তাই স্টেজ শো বাতিল করতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত অস্বস্তিবোধও করছিলেন। একপর্যায়ে সবার সামনে পড়ে যান তিনি। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়।

হামিন বলেন, শাফিনকে যখন হাসপাতালে নেওয়া হয় তখন কিছুটা ভালোবোধ করেন। আয়োজকরা হাসপাতাল থেকে চলে আসেন। রাত সাড়ে ৩টার দিকে আবার অ্যাটাক হয়, সেটা ম্যাসিভ ছিল। পাঁচ থেকে সাত মিনিট একেবারে অচেতন ছিল। এরপর সিপিআর করে তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনার চেষ্টা হয়। সিপিআর শেষে তাকে ভেন্টিলেশনে নেওয়া হয়। এই কদিন ভেন্টিলেশন শেষে আজ বাংলাদেশ সময় সকালে তার মৃত্যুর খবরটা জানানো হয়।

ভার্জিনিয়ার ওই অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ায় হাসপাতাল থেকেই একটি ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। সেই বার্তায় শিগগির দেখা হবে বলেও জানিয়েছিলেন, কিন্তু শাফিনের সঙ্গে ভার্জিনিয়ার শ্রোতাদের সঙ্গে অডিটোরিয়ামে দেখা হলো না।

শাফিন ভিডিও বার্তায় বলেছিলেন, ‘আজকে কনসার্টে আপনাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা ছিল। তবে শারীরিক কিছু লক্ষণের জন্য আমি একটু মেডিকেল চেকআপ করতে আসি। মেডিকেল চেকআপ করতে এসে হাসপাতালের চিকিৎসকদের নির্দেশ অনুযায়ী সময় লাগছে। তাই হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চেকআপ করতে হচ্ছে। আপনারাও দেখতে পাচ্ছেন, এই মুহূর্তে হাসপাতালে ভর্তি আছি। আপনাদের সঙ্গে হয়তো আজকে আর দেখা হচ্ছে না। দুঃখিত আমার সব শ্রোতা এবং ভক্তদের কাছে, একই সঙ্গে আয়োজকদের কাছেও। আগামীতে নিশ্চয় আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে। আমি আশা করব আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে। ধন্যবাদ।’

জানা যায়, গত ১৫ বছর আগে থেকে শাফিন আহমেদ হার্টের সমস্যায় ভুগছেন। প্রথমবার তিনি ভারতে হার্ট অ্যাটাক করেন। ভারতের ওই হার্ট অ্যাটাকও মেজর ছিল। এরপর সেটা নিয়ন্ত্রণে আসে। কয়েক বছর আগে কক্সবাজারে আরেকবার হার্ট অ্যাটাক হয় শাফিনের। এ বছরের শুরুর দিকে ঢাকার কেরানীগঞ্জেও শাফিন আহমেদের একবার হার্ট অ্যাটাক হয়। এরপর চিকিৎসকরা তাকে মানসিক চাপ নেওয়া, এমনকি বিমান ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করেছিলেন।

হামিন জানান, যুক্তরাষ্ট্রে তাদের কয়েকজন নিকটাত্মীয় আছেন। তারা আপাতত শাফিনের কাছে আছেন। তিনি বৃহস্পতিবার রাতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে যাত্রা করবেন। সেখানে গিয়ে দ্রুত ভাইয়ের মরদেহ দেশে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবেন।

আশি আর নব্বইয়ের দশকে কিশোর-তরুণ শ্রোতাদের মন মাতানো ‘চাঁদ তারা সূর্য নও তুমি’, ‘জ্বালা জ্বালা জ্বালা এই অন্তরে’, ‘ফিরিয়ে দাও’-এর মতো গানের শিল্পী শাফিন আহমেদ বাংলাদেশের সংগীত অঙ্গনের দুই মহারথী সংগীতশিল্পী ফিরোজা বেগম এবং সুরকার কমল দাশগুপ্তের ছেলে।

পারিবারিক ঐতিহ্যের কারণে ছোটবেলা থেকেই গানের আবহে বেড়ে উঠেছেন শাফিন। বাবার কাছে উচ্চাঙ্গ সংগীত আর মায়ের কাছে নজরুলগীতি শিখেছেন।

বড় ভাই হামিন আহমেদসহ ইংল্যান্ডে পড়তে গিয়ে পশ্চিমের সংগীতের সঙ্গে সখ্য হয় শাফিনের। শুরু হয় তার ব্যান্ড সংগীতের যাত্রা।

একরকম শখের বশেই ১৯৭৯ সালে তারা গড়ে তোলেন ব্যান্ড দল ‘মাইলস’। প্রথম কয়েক বছর তারা বিভিন্ন পাঁচতারা হোটেলে ইংরেজি গান গাইতেন। পরে মাইলসের বাংলা গানের প্রথম অ্যালবাম বের হয় ১৯৯১ সালে।

ওই অ্যালবামের জনপ্রিয়তার পর বিটিভিতে বিভিন্ন গানের অনুষ্ঠানে দেখা যেতে থাকে মাইলসকে। ধীরে ধীরে মাইলস দেশের অন্যতম জনপ্রিয় ব্যান্ড দলে পরিণত হয়।

মাইলসের সঙ্গে তিন দশকের পথচলার সমাপ্তি টেনে ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে বেরিয়ে আসেন শাফিন আহমেদ। তবে তার সংগীত যাত্রা চলতে থাকে। তার বিভিন্ন সলো অ্যালবামও জনপ্রিয় হয়। পরে তিনি গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড দল ‘ভয়েস অব মাইলস’।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সেই দলকেই এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছিলেন শাফিন।