সম্প্রতি চীন সফর-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা ও রাজাকার নিয়ে দেওয়া তার বক্তব্য বিকৃত করা হয়েছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘শিক্ষার্থীদের আমি রাজাকার বলিনি, আমার বক্তব্যকে বিকৃত করা হয়েছে। তারা নিজেরাই নিজেদের রাজাকার বলে
স্লোগান দিয়েছে।’
শেখ হাসিনা আক্ষেপ করে বলেন, ‘বিএনপি-জামায়াত ও শিবির দেশের উন্নয়নকে ক্ষতিগ্রস্ত করার পাশাপাশি বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য দেশব্যাপী তাণ্ডব চালিয়েছে।’ এই ধ্বংসযজ্ঞের সঙ্গে জড়িত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনতে সহায়তা করার জন্যও দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলাকালে ১৮ জুলাই দুর্বৃত্তদের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবন পরিদর্শন শেষে গতকাল শুক্রবার সকালে এসব কথা বলেন সরকারপ্রধান।
মেট্রোরেল, বিটিভিসহ বিভিন্ন স্থাপনা ধ্বংসের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যারা এসবের সঙ্গে জড়িত, সারা দেশের আনাচে-কানাচে যে যেখানে আছে, তাদের খুঁজে বের করুন। তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করার জন্য সহযোগিতা করুন। আমি দেশবাসীর কাছে এই আহ্বান জানাচ্ছি।’
এ ছাড়া গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে প্রধানমন্ত্রী দেশব্যাপী সাম্প্রতিক সহিংসতার ঘটনায় আহতদের দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। তিনি ঢামেকের জরুরি বিভাগে যান। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় হামলার শিকার হয়ে আহতদের শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেন। প্রধানমন্ত্রী আহতদের সুচিকিৎসার জন্য হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আমার একটা কথা নিয়ে তারা প্রতিবাদ করল। কী কথা বলেছিলাম আমি? আমার কথাটাকে বিকৃত করা হয়েছিল। কোটা না মেধা...। তো আমাদের নারীর কোটা, প্রতিবন্ধীদের কোটা, নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর কোটা, জেলার কোটা, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কোটা; সেগুলো তো আমি বাতিলও করে দিয়েছিলাম। তারপরও কোটা না মেধা, মেধা না কোটা... তো কোটা আর মেধার মধ্যে এত তফাতের কী আছে? এখানে মেধায় তো (নিয়োগ) হয়।’
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে নিয়োগের পদ্ধতি বর্ণনা করে সরকারপ্রধান বলেন, ‘প্রথমে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা নেওয়া হয়, পরে লিখিত পরীক্ষা হয়। লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে তাদের ভাইভা নেওয়া হয়। এরপর যখন পদায়ন করা হয়, যারা মেধাবী তারাই (নিয়োগ) পায়। অবশ্য এই কোটাগুলো ভাগ করে দেওয়া হয়। তো এই কোটাগুলো যারা মেধাবী তারাই তো পাচ্ছে। সেই সূত্রে আমি বলেছিলাম, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তানরা কি মেধাবী না? মেধাবী কি শুধু ওই রাজাকারের ছেলে-মেয়ে?’
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘বিকেল ৪টায় আমি প্রেস কনফারেন্স করি। কয়েক ঘণ্টা চলে যায়। পরে রাতে ১১টা সাড়ে ১১টার দিকে হঠাৎ করে দেখলাম, অনেক ছেলেমেয়ে হল থেকে বের হয়ে এসেছে। তাদের স্লোগানটা কী “তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার; তোমার বাবা আমার বাবা, রাজাকার রাজাকার।” তার মানে তারা নিজেদের রাজাকার হিসেবে পরিচয় দিল। আমি তো তাদের রাজাকার বলিনি। তারা নিজেরাই সেস্লোগান দিয়ে সবার কাছে রাজাকার হিসেবে পরিচিত করল।’
শিক্ষার্থীদের এই স্লোগানের প্রতিবাদ প্রত্যেকটি শ্রেণি-পেশার মানুষ; এমনকি ছাত্রলীগ, যুবলীগ থেকে শুরু করে প্রগতিশীল সংগঠনগুলো পর্যন্ত করেছিল বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘কোনো স্তরের মানুষ বাদ নেই যে এর প্রতিবাদ না করেছে। তখন তারা তাদের স্লোগান পরিবর্তন করল “চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেছি রাজাকার।” রাজাকার তো আমি তোমাদের করিনি। তোমরা নিজেরাই স্লোগান দিয়ে তোমাদের রাজাকার করেছ। তোমরা স্লোগান দিয়েই তোমাদের পরিচয় দিয়েছ। তোমরা শুধু না, তোমরা রাজাকার, তোমাদের বাবা রাজাকার এটা তোমরাই করেছ।’
আন্দোলনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হল থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের বের হয়ে আসার নির্দেশ দিয়েছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ ইডেন মহিলা কলেজ হলের ছাত্রলীগের কর্মীরা যেসব কামরায় থাকত, সবগুলো ভাঙচুর-লুটপাট করা হয়েছে। তাদের রুমের সবকিছুতেই আগুন দেওয়া হয়েছে। তাদের সার্টিফিকেট পুড়িয়ে দিয়েছে। যখন আমাকে জানানো হলো, আমি ছাত্রলীগের নেতাদের বললাম, তোমরা হল থেকে বেরিয়ে আসো। কোনো ঝামেলায় যাওয়ার দরকার নেই। তারা কান্নাকাটি করে “... আমাদের সার্টিফিকেট পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।” আমি বলেছি সব পাওয়া যাবে। কিন্তু কোনো ঝামেলায় যাবে না। হল থেকে চলে আসো। তারা বেরিয়ে আসে।’
শিক্ষার্থীরা যখন ‘তুমি কে আমি কে রাজাকার রাজাকার’ স্লোগান দেয়, তখনই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এর প্রতিবাদ করেছিল বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিন বলেন, ‘ওই এক দিনই। এ ছাড়া তো তারা কোনো গণ্ডগোল করেনি। তারা সব সময় সহযোগিতার মনোভাব দেখিয়েছে, সাহসিকতা দেখিয়েছে। এখন তাদের ওপর ক্ষোভ।’
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘যারা এ ধরনের (নাশকতা) ঘটনা ঘটাল, শিক্ষকের গায়ে হাত তুলল, ছাত্রদের মারল, হলগুলো লুটপাট করল, তাদের কী হবে?’
সরকারপ্রধান বলেন, ‘একাত্তর সালের ২৫ মার্চ হানাদার বাহিনী গণহত্যা যখন শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে... রোকেয়া হলের প্রায় ৩০০ মেয়েকে নির্যাতন করে হত্যা করে। জগন্নাথ হল, ইকবাল হল, রোকেয়া হল...। মেয়েদের রেপ করেছে, তুলে নিয়ে গেছে তাদের ক্যাম্পে। সেই ২৫ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর কী করেছে তারা! বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের তুলে নিয়ে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। আবার সেই জায়গায় হল ভাঙা, শিক্ষকদের গায়ে হাত তোলা, এমনকি নারী শিক্ষক, তাদেরও ছাড়েনি। ইডেনে মেয়েদের খাম্বার সঙ্গে বেঁধে তাদের ওপর অত্যাচার, তাদের নাকে খত দেওয়া, কান ধরে উঠবস করানো; এমন নানা রকম জুলুম-অত্যাচার করেছে। তাদের অপরাধ কী? তারা ছাত্রলীগ করে। এভাবে ছাত্রলীগের কোনো কামরা নেই যে সেগুলো ভাঙচুর-লুটপাট বা অগ্নিসংযোগ করা হয়নি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সারা বাংলাদেশটাকে নরক বানানোর চেষ্টা করা হলো। তাই আমরা বাধ্য হয়েছি সেনাবাহিনী নামাতে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘দেশবাসীকে বলব, ঢাকাবাসীকে বলব, যাদের জন্য আজ আপনাদের এই দুর্ভোগ, যারা ধ্বংস করল, যাদের জন্য আজ বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে, আমি তাদের বিচারের ভার এ দেশের জনগণের ওপরই দিয়ে যাচ্ছি। যারা এ দেশের মানুষের রুটি-রুজির ওপর হাত দিয়েছে, তাদের বিচার জনগণকেই করতে হবে। কারণ এ দেশের জনগণই একমাত্র শক্তি।’
কেউ মিথ্যাচার চালিয়ে যেন বিভ্রান্তি ছড়াতে না পারে, সে জন্য সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়ে সরকারপ্রধান বলেন, ‘মিথ্যা অপপ্রচার চালিয়ে কাউকে যেন বিভ্রান্ত করতে না পারে। (সবাই) আসল সত্যটা জানুক।’
পরিদর্শনকালে বিটিভির মহাপরিচালক ড. মো. জাহাঙ্গীর আলমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিটিভি ভবনে হামলার একটি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা প্রধানমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। পাশাপাশি বিটিভি সদর দপ্তর ও বিটিভি ভবনে ভাঙচুরের একটি ভিডিওচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
এ সময় তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. মাহবুব হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিব মোহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খন্দকার এবং প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এম নজরুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।