এক হাতে সাদা প্লাস্টিকের চটের বস্তায় কয়েকটি বাক্স। সেগুলোর কয়েকটিতে নানা পদের খাবার আর একটি বাক্স ভরা নানা ওষুধ। আরেক হাতে একটি মোবাইল ফোন ধরা, সেটির পর্দায় ভাসছে একজনের জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি। এলোমেলো চুল, অগোছালো পরনের পোশাক আর চোখ ভরা আতঙ্ক নিয়ে দিগি¦দিক ছোটাছুটি করছেন শারমিন বেগম। কখনো সাদা পোশাকের গোয়েন্দা পুলিশ আবার কখনো সংবাদকর্মীদের ধরে ধরে সেই পরিচয়পত্র দেখিয়ে জানতে চাইছেন, নাজিম উদ্দীনকে এখানে আনা হয়েছে কি না? নাজিম উদ্দীন তার স্বামী। জাতীয় পরিচয়পত্রে ছবি ভালো বোঝা যায় না, তাই তার একটি ছবিও দেখাচ্ছিলেন। গতকাল দুপুর ১২টার দিকে শারমিনের সঙ্গে কথা হয় রাজধানীর মিন্টো রোডে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) কার্যালয়ের সামনে।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘গতকাল (শনিবার) সন্ধ্যায় আমাদের বাড়ির দরজায় করা নাড়ার শব্দে আমি দরজা খুলে দিই। কারণ তখন আমার স্বামী (নাজিম উদ্দীন) নামাজ পড়ছিল। তারপর সাদা পোশাক পরা কিছু লোক নিজেদের ডিবি পরিচয় দিয়ে নামাজ থেকে তাকে তুলে নিয়ে আসে। তারা সত্যিই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার লোক কি না, এটা জানতে চাইছিলাম বারবার, চিল্লাচিল্লি করছিলাম। তখন তারা আমার হাতে মোচড় দিয়ে আমার স্বামীকে ছাড়িয়ে নিয়ে চলে আসে। এ সময় তারা আমাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকে। তাদের সঙ্গে কোনো নারী পুলিশ ছিল না। আমার দুটি বাচ্চা এ অবস্থা দেখে ভয়ে বারান্দায় শুয়ে কান্নাকাটি করছিল।’
ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে আসা নাজিম উদ্দীন একজন বেকারি ব্যবসায়ী। পরিবার নিয়ে এক আত্মীয়ের বাসা ভাড়া নিয়ে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন। গত শনিবার সেই বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসার পর পুরো পরিবার স্থানীয় থানা, র্যাব অফিস, গোয়েন্দা কার্যালয় ও আদালতে খুঁজেও তার কোনো সন্ধান পায়নি গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত।
বরিশাল শহরের রূপাতলী বাসস্ট্যান্ড এলাকার মুদিদোকানি সোহাগ হাওলাদার। পিতা মৃত হেমায়েত হোসেন হাওলাদার। রাজধানীর হেলথ এইড হাসপাতালে ভর্তি স্বজনকে দেখতে এসে নিখোঁজ হয়েছেন ২৪ জুলাই দুপুরে। এরপর থেকে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করতে পারছেন না মা বসিরুন বেগম। কারও কাছে শুনেছেন ছেলেকে ধরে এনেছে ডিবি পুলিশ। তাই মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ে সামনে ঘুরঘুর করছিলেন ছেলের জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে। বসিরুন বেগম বলেন, ‘এক স্বজনকে দেখতে হাসপাতালে এসেছিল সোহাগ। সেই হাসপাতাল থেকেই তাকে ধরে নেয় ডিবি। এরপর থেকে আর কোনো খোঁজ পাচ্ছি না। একজন ফোন করে জানিয়েছে ছেলে ডিবিতে আছে। আমার ছেলে নির্দোষ। আমার স্বামী নেই। এ ছেলেই আমাকে দেখাশোনা করে। তার ১৭ মাসের মেয়ে আছে। তার আয়ে আমার পরিবার চলে।’ কথাগুলো যখন বলছিলেন তখন তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পড়ছিল।
শনিবার গভীর রাতে রাজধানীর উত্তরার বাসা থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক আসিফ মাহাতাব উৎসকে তুলে নেওয়ার অভিযোগ করছেন বাবা শাহাবুর রহমান ও মা সালমা জাহান। ছেলের সন্ধানে ডিবি কার্যালয়ের সামনে আসা শাহাবুর রহমান বলেন, ‘আমার ছেলেকে সবাই চেনেন। ডিবি কার্যালয়ে আসার পরে আমাদের সঙ্গে কেউ কথা বলছে না। আসিফ মাহাতাব কোথায় এই তথ্য কেউ আমাদের দিচ্ছে না। অথচ বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে আসা হয়েছে।’
সারাদিন মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ের সামনে আরও অন্তত পাঁচজনকে এভাবে ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্র হাতে ঘুরতে দেখা গেছে। তাদের দাবি, ডিবি অফিস থেকে তাদের ফোন করে জানানো হয়েছে স্বজন আটকের কথা। আবার কাউকে তুলে আনার সময় বলা হয়েছে ডিবি অফিসে যোগাযোগ করতে। তবে স্বজনদের খোঁজে আসা পরিবারের কেউ নিশ্চিত হতে পারেনি যাদের তুলে আনা হয়েছে তারা আসলে কোথায় আছে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে রাজধানীসহ সারা দেশ সহিংস হয়ে ওঠে। আন্দোলনকারী, সাধারণ মানুষ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত ১৫৬ জন মানুষের প্রাণহানি হয়। ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয় রাষ্ট্রীয় স্থাপনায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশে জারি করা হয় কারফিউ। তারপর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্লক রেইড শুরু করেছে। এতে প্রতিদিনিই হচ্ছে নতুন নতুন মামলা, চলছে গ্রেপ্তার। ঢাকা মহানগর পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, গতকাল পর্যন্ত ২২৯টি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় ঢাকায় সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ২ হাজার ৭৬৪ জনকে গ্রেপ্তার দেখানে হয়েছে।
ঢাকার বাইরে সাত জেলায় এ পর্যন্ত আরও ১ হাজার ৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে খুলনা মহানগরীর চার থানায় ১০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চট্টগ্রামে ১২ দিনে ৮৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আর ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫০ জনকে। ঢাকার দোহার-নবাবগঞ্জে জামায়াতের এক নায়েবে আমির ও পাঁচ ছাত্রশিবির নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জামালপুরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে পাঁচজনকে।
নাটোরের সিংড়ায় গতকাল একজনসহ ১১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এদিকে ফরিদপুরে গ্রেপ্তার তিন শিক্ষার্থীসহ ৫৮ আসামিকে জামিন দেয়নি আদালত।
এমন গণহারে গ্রেপ্তারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন দেশের মানবাধিকারকর্মীরা। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে মানবাধিকার ও সাংবিধানিক আইন লঙ্ঘন হচ্ছে উল্লেখ করে মানবাধিকারকর্মী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনা আছে কাউকে পুলিশ আটক করলে তিন ঘণ্টার মধ্যে তার অপরাধ জানাতে হবে। এই সময়ের তাকে আটকের বিষয়টি ভুক্তভোগীর পরিবার, স্বজনদের জানাতে হবে। এ ছাড়া তার পছন্দমতো আইনজীবীর আইনি সহায়তা যেন নিতে পারে সে ব্যবস্থা করতে হবে। এটা না করলে সাংবিধানিক আইন, সুপ্রিম কোর্টের দিকনির্দেশনা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন হবে।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ হারুন অর রশীদের মোবাইল ফোনে কল করা হলে তিনি রিসিভ করেননি।
আমার সন্তান, আমার কাছেই নিরাপদ : নিরাপত্তা দেওয়ার নামে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদারকে রাজধানীর গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতাল তুলে নেয় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ শাখা (ডিবি)। গত শুক্রবার তাদের তুলে নেওয়ার পর ডিবির পক্ষ থেকে বলা হয়, নাহিদসহ বাকিদের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যই তাদের ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এর এক দিন পর গতকাল বিকেলে নাহিদের সঙ্গে দেখা করতে ডিবি অফিসে যান নাহিদের মাসহ পরিবারের অন্তত পাঁচজন সদস্য। তবে তাদের ডিবি অফিসে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ।
তাদের আটকে দেওয়া হয় ডিএমপি হেডকোয়ার্টার সংলগ্ন ইস্কাটন এলাকার মিন্টো রোডের পূর্বপ্রান্তের শেষাংশে সড়কদ্বীপে কোতয়ালের ভাস্কর্যের পাশেই। প্রায় দেড় ঘণ্টা চেষ্টা করেও তারা ডিবি কার্যালয়ের সামনে যেতে পারেনি। একপর্যায়ে সেখনেই গণমাধ্যমের সামনে কথা বলেন নাহিদের মা মমতাজ নাহার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘নিজের পরিবার বা মায়ের আঁচলের চেয়ে পুলিশের হেফাজতে কীভাবে কেউ নিরাপদ থাকবে! আমরা ওকে দেখার জন্য ডিবি অফিসে প্রবেশ করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আমাদের নিষেধ করা হয়েছে। সে (নাহিদুল) বা আমরা (পরিবারের) কেউই পুলিশের কাছে কোনো নিরাপত্তা চাইনি।’