‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের খবরে’ জাতিসংঘের উদ্বেগ

বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত চেয়েছে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের  খবরে’ তাদের পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে হাজারো তরুণ ও রাজনৈতিক বিরোধীদের গণগ্রেপ্তারের খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য  প্রমাণের খবরেও’ তিনি উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে গত সোমবার জাতিসংঘ মহাসচিবের দেওয়া এক বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়। জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্রের কার্যালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ের শুরুর দিকে গত সোমবার বিবৃতিটি পড়ে শোনানো হয়।

এদিকে সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে ‘দেখামাত্র গুলির নির্দেশ’ (শুট অন সাইট) এবং ‘আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইইউ। ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল গতকাল মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এ উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। ইইউর  পররাষ্ট্র বিভাগের ওয়েবসাইটে বিবৃতিটি প্রকাশ করা হয়েছে।

অন্যদিকে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে বলা হয়, বাংলাদেশের পরিস্থিতির ‘স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ’ সমাধান চায় তারা। 

জাতিসংঘ মহাসচিবের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে তিনি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। গত সোমবার বাংলাদেশে নতুন করে শিক্ষার্থী বিক্ষোভ শুরুর বিষয়ে তিনি অবগত। জাতিসংঘ মহাসচিব সবাইকে শান্ত ও সংযত থাকতে তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করছেন।

বিবৃতিতে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণের খবরেও তিনি উদ্বিগ্ন। সহিংসতার সব ঘটনা অবিলম্বে স্বচ্ছ-নিরপেক্ষভাবে তদন্তসহ দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে তিনি তার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে ঢাকা ও নিউ ইয়র্ক উভয় স্থানে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কাছে উদ্বেগ জানানো অব্যাহত রাখবে বিশ্ব সংস্থাটি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে সেনা পাঠানোর ক্ষেত্রে শীর্ষস্থানীয় দেশ হিসেবে তারা বাংলাদেশকে মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তা সমুন্নত রাখার বিষয়টি মনে করিয়ে দিচ্ছে। জাতিসংঘের লোগো-সংবলিত যানবাহন আর বাংলাদেশে মোতায়েন করা হবে না বলে দেশটির কর্র্তৃপক্ষ জাতিসংঘকে জানিয়েছে। তারা বিষয়টি আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে, পুনরাবৃত্তি করছে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে নির্ধারিত দায়িত্ব পালনকালেই শুধু বিশ্ব সংস্থাটির লোগো-সংবলিত যানবাহন ব্যবহার করবে সেনা-পুলিশ পাঠানো দেশগুলো।

জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্রের কার্যালয়ের নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এক সাংবাদিক বলেন, তরুণ নিরপরাধ ব্যক্তিদের ধরপাকড়, গুলি করা, হেফাজতে থাকা অবস্থায় বিবৃতি দিতে বাধ্য করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকাকে কীভাবে দেখছেন জাতিসংঘ মহাসচিব? জবাবে মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্বাসযোগ্য খবরে তিনি উদ্বিগ্ন। এসব ঘটনায় জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

আরেক প্রশ্নে একই সাংবাদিক বলেন, জাতিসংঘের মানবাধিকারপ্রধান বলেছেন, তার কার্যালয় তদন্তে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। মানবাধিকার সংস্থা, আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদ ও নোবেলজয়ীরা জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ চাইছেন। পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য জাতিসংঘ মহাসচিবের কত প্রমাণ দরকার? জবাবে ডুজারিক বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব সবসময় তার ম্যান্ডেটের আওতায় সহায়তা দিতে প্রস্তুত।

আরেক সাংবাদিকের প্রশ্নে ডুজারিক বলেন, সহিংসতার সব ঘটনা সঠিক, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। যারা সহিংসতার জন্য দায়ী, তাদের প্রত্যেককে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই সাংবাদিকের আরেক প্রশ্নে বলেন, সেনা মোতায়েনের পর ঢাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সম্পদের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের খবর বেরিয়ে আসছে। এমন ভয়াবহ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে জাতিসংঘ কি বাংলাদেশকে সাহায্য করবে? জবাবে মুখপাত্র বলেন, সংকটকালে সংলাপের বিষয়ে যেকোনো দেশকে সাহায্য করতে জাতিসংঘ সবসময় প্রস্তুত। বিশ্বের কোথাও বিক্ষোভকালে জানমালের ক্ষয়ক্ষতিতে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো প্রকল্পে জাতিসংঘ যুক্ত নয়।

হত্যাকাণ্ড-সহিংসতার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চায় ইইউ : ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেলের দেওয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২৭ জুলাই (শনিবার) লাওসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোটের (আসিয়ান) আঞ্চলিক ফোরামের মন্ত্রিপর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের কাছে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

জোসেপ বোরেল বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের প্রতিনিধি ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেনের কাছে সেখানে সাম্প্রতিক দিনগুলোয় কর্র্তৃপক্ষের দেখামাত্র গুলির নির্দেশ ও আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংঘটন নিয়ে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছি।’

ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান আরও বলেন, ‘এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারা সংঘটিত হত্যাকাণ্ড, সহিংসতা, নির্যাতন, গণগ্রেপ্তার ও সম্পদের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিয়েও আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। অবশ্যই এসব কর্মকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত ও দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনতে হবে।’

বাংলাদেশে বিক্ষোভকারী, সাংবাদিক, ছোট শিশুসহ অন্য ব্যক্তিদের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বহু ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে বলেও উল্লেখ করেছেন জোসেপ বোরেল। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে হাজারো মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা যেন যথাযথ আইনি সুবিধা পান, তা-ও নিশ্চিত করতে হবে।

বোরেল বলেন, এ সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ কর্র্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, সেগুলোর ওপর তারা গভীরভাবে নজর রাখবেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন-বাংলাদেশ সম্পর্কের মূলনীতিগুলো বিবেচনায় রেখে আশা করছে, বাংলাদেশে সব ধরনের মানবাধিকারের প্রতি পূর্ণ সম্মান জানানো হবে।

বাংলাদেশ পরিস্থিতির ‘স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ’ সমাধান চায় যুক্তরাষ্ট্র : বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে অস্থিরতার ‘স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ’ সমাধান খোঁজার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। পাশাপাশি যেকোনো শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অবিচল সমর্থন দেওয়ার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে দেশটি।

গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন উপপ্রধান মুখপাত্র বেদান্ত প্যাটেল।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের বিষয়ে প্রকাশ্যে এবং ব্যক্তিগতভাবে আমরা আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছি এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতার পক্ষে আমাদের অবিচল অবস্থান আমরা পুনর্ব্যক্ত করছি।’

ইন্টারনেট ব্যবস্থার ‘কিছুটা পুনঃস্থাপনের’ বিষয় অবগত থাকার কথা তুলে ধরে বেদান্ত প্যাটেল বলেন, ‘আমরা ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের পূর্ণ এবং বাধাহীন প্রবেশাধিকারের আহ্বান জানাই। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ এবং আমাদের যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যে প্রবেশাধিকার পাবেন।’

বাংলাদেশের বিক্ষোভের প্রতি সংহতি জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ও কংগ্রেস সদস্যদের বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্র দপ্তরের উপপ্রধান মুখপাত্র বলেন, ‘যারা শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করতে চায়, তাদের সব প্রচেষ্টাকে আমরা সমর্থন করি। তবে বিষয়টি যেহেতু মার্কিন কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাই এ বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারব না।’