বাবা আসবে বাড়ি

আনসার সদস্য জুয়েল শেখের গ্রামের বাড়িতে শোকের আবহ ও মাতম চলছে। গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত জুয়েলের বাড়ি ফরিদপুরের পার আশাপুর গ্রামে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকায় নিহত হন তিনি। পরিবারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। তার পরিবারের সদস্যরা এখন দিশেহারা।

এলাকাবাসী এবং তার পরিবার হত্যাকান্ডে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। জুয়েল শেখ ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার মেগচামী ইউনিয়নের পার আশাপুর গ্রামের মরহুম আকিদুল শেখের ছেলে। জুয়েল শেখ ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর অঙ্গীভূত আনসার সদস্য হিসেবে ডিএমপিতে যোগ দেন। তিনি মতিঝিল থানায় কর্মরত ছিলেন।

জুয়েলের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত শুক্রবার ১৯ জুলাই রাতে ফকিরাপুল এলাকায় ডিউটি শেষে সহকর্মীদের সঙ্গে মতিঝিল থানায় ফিরছিলেন। পথে একদল নাশকতাকারীর সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষের সময় তার শরীরে গুলি লাগে। সহকর্মীরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এরপর তার পরিবারের সদস্যদের কাছে মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। তারা শনিবার তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নিয়ে আসে এবং ওই রাতেই জানাজা শেষে পার আশাপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার মেগচামী ইউনিয়নের পার আশাপুর গ্রামে নিহত জুয়েল শেখের পরিবারের ছোট্ট একটি দোচালা টিনের ঘর আছে। ওই বাড়িতেই জুয়েলের স্ত্রী, মা, দাদা-দাদি ও শিশুসন্তান একসঙ্গে থাকেন। এক সপ্তাহ ধরে তাদের রান্নাঘরের চুলা জ্বলেনি। একমাত্র উপার্জনক্ষম জুয়েলকে হারিয়ে পরিবারের দিশেহারা অবস্থা। পাঁচ বছর বয়সী শিশু আবু হুরায়রা এখনো জানে না তার বাবা আর নেই। জিজ্ঞেস করলেই বাচ্চাটি বলে, তার বাবা ঢাকায় আছে। সে ভাবে তার বাবা বাড়িতে এলে তার জন্য ভালো ভালো খাবার নিয়ে আসবে।

জুয়েলের মা নাজমা বেগম ছেলেকে হারিয়ে পাগলপ্রায়। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে জুয়েলকে মানুষ করেছি। ছোটবেলায় তার বাবা মারা যায়। তখন থেকেই আমি তার লেখাপড়ার দায়িত্ব নিই। পড়ালেখার একপর্যায়ে আনসার সদস্য হিসেবে তার চাকরি হয়। ট্রেনিং শেষে ২০২১ সালের ২২ ডিসেম্বর অঙ্গীভূত আনসার সদস্য হিসেবে ডিএমপিতে যোগ দেয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে যারা মেরেছে, তাদের যেন বিচার হয়।’

জুয়েল শেখ ২০১৭ সালে ভালোবেসে বিয়ে করেন পাশের এলাকার শ্রাবণী খাতুনকে। এভাবে তার ভালোবাসার মানুষটির মৃত্যু হবে শ্রাবণী তা বিশ্বাস করতে পারছেন না। স্বামীর কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। বলেন, ‘এখন আমি আমার স্বামীর স্মৃতি নিয়েই বেঁচে থাকব। একমাত্র ছেলে আবু হুরায়রাকে মানুষের মতো মানুষ করব।’

তিনি বলছিলেন, ‘আমার স্বামী ভালো মানুষ ছিলেন। প্রতিদিন ফোনে কথা বলতেন। ছেলের খবর নিতেন। এখন কে আমার ছেলের খবর নেবে।’ নিহত হওয়ার আগেও ফোনে জুয়েলের সঙ্গে কথা হয়েছে শ্রাবণীর। জুয়েল জানিয়েছিল, ঢাকায় গন্ডগোল হচ্ছে, বাসায় ফিরে রাতে কথা হবে। এভাবেই শেষ হয় তাদের আলাপচারিতা।

আশাপুর গ্রামের বাসিন্দারা জানান, জুয়েল খুব ভালো ছেলে ছিলেন। নম্র ও ভদ্র। তিনি এলাকার সবাইকে সম্মান করে চলতেন। তারা জানান, জুয়েলের পাঁচ বছর বয়সের সময় তার বাবা আকিদুল শেখ মারা যান। একই রকমভাবে জুয়েল তার একমাত্র ছেলের পাঁচ বছর বয়সে মারা গেলেন। এলাকাবাসীর দাবি, জুয়েলকে যারা মেরেছে, তাদের কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।

আনসার ও ভিডিপির ফরিদপুরের জেলা কমান্ড্যান্ট নাদিরা ইয়াসমিন জানান, নিহত আনসার সদস্য জুয়েল শেখের পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ডিএমপি, ডিএমএ ও আনসারের পক্ষ থেকেও আর্থিক সহযোগিতা করা হবে। প্রয়োজনে তার পরিবারের কাউকে চাকরি দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হবে।’