কোটা আন্দোলনে রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় (বেরোবি) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তারকৃত ১৬ বছরের সেই শিক্ষার্থী আলফি শাহরিয়ার মাহিমকে জামিন দিয়েছে আদালত। তবে ঢাকার মাতুয়াইলে পুলিশ সদস্য হত্যা মামলায় শিশু বিবেচনায় রিমান্ড বাতিল হওয়া ঢাকা কলেজের একাদশ শ্রেণির সেই ছাত্র জামিন পায়নি।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রংপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মোস্তফা কামাল শুনানি শেষে মাহিমের জামিন মঞ্জুর করেন। বিকেল ৫টার দিকে তাকে কারাগারে থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।
মাহিম রংপুর নগরীর আশরতপুর চকবাজার এলাকার ব্যবসায়ী মো. শাহজালালের ছেলে। সে রংপুর পুলিশ লাইনস স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী। আন্দোলনের সময় গত ১৮ জুলাই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে ১৯ জুলাই পুলিশ ১৯ বছর বয়স দেখিয়ে আদালতের মাধ্যমে তাকে কারাগারে পাঠায়। ওইদিন বিকেলে আদালত থেকে তার পরিবার জানতে পারে মাহিমকে আবু সাঈদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। ১৪ দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পেল সে। কারাগারে থাকার সময় মাহিমের সঙ্গে তার পরিবারের কাউকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি বলে পরিবারের অভিযোগ।
১৬ বছর ১০ মাস বসয়ী শিশু মাহিমকে পুলিশ প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর বিষয়টি তার বোন সানজানা আখতার স্নেহা গত মঙ্গলবার দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে এবং তা ব্যাপক ভাইরাল হয়।
মাহিমের আইনজীবী জোবায়দুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘আগামী ৪ আগস্ট শুনানির দিন ছিল। কিন্তু আমরা বৃহস্পতিবার নতুন করে শুনানির জন্য আবেদন করি। আদালত শুনানি গ্রহণ করে জামিন মঞ্জুর করেন।’
রংপুরে কোটা সংস্কার আন্দোলনে গত ১৬ জুলাই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পার্ক মোড়ে পুলিশ ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রকাশ্যে পুলিশের গুলিতে বেরোবির শিক্ষার্থী আবু সাঈদের নিহত হন। এ ঘটনায় ১৭ জুলাই তাজহাট থানায় উপপরিদর্শক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ বিভূতিভূষণ রায় বাদী হয়ে মামলা করেন।
মাহিমের বাবা মো. শাহজালাল বলেন, আমার ছেলের বয়স ১৬ বছর ১০ মাস ১১ দিন। কিন্তু পুলিশ তাকে ১৯ বছর দেখিয়ে আদালতে চালান দেয়। একবারও যাচাই-বাছাই করল না। মেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিলে পুলিশ গত বুধবার তাকে ডেকে নেয়। আশ্বাস দেয়, রাতেই তাদের সঙ্গে আদালতে একজন পুলিশ পাঠায়। নিরপরাধ ছেলের বিরুদ্ধে করা মামলা দ্রুত প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।
মাহিমের বোন সানজানা আখতার স্নেহা বলেন, ‘২০ জুলাই আমরা কোর্ট থেকে নথিপত্র নিয়ে দেখি মাহিমকে আবু সাঈদ ভাইয়ের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। সেদিন থেকে বারবার কারাগারের দরজা থেকে ফিরে এসেছি। একটিবারও দেখা করতে দেয়নি। পরে বিষয়টি আমরা আদালতের মাধ্যমে মোকাবিলা করার চেষ্টা করি। কিন্তু মহানগর আদালত তার মামলা কিছুতেই শিশু আদালতে দিতে চায়নি। অনেক চেষ্টা করার পর গত ৩০ জুলাই শিশু আদালতে মামলাটি স্থানান্তর করাই।’
তিনি বলেন, ‘আদালত ৪ আগস্ট শুনানির দিন ধার্য করেছিল। কিন্তু গত বুধবার আমার জন্মদিন ছিল, তাই ভাইয়ের অনুপস্থিত অনুভব করে পোস্ট করি। এরপর আমাদের পুলিশ কমিশনার ডেকে নেন। আশ্বাস দেন এবং তার জামিন হলো।’
জামিন হয়নি ঢাকার ১৭ বছরের সেই শিক্ষার্থীর : রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল এলাকায় পুলিশ সদস্য গিয়াস উদ্দিন হত্যা মামলায় রিমান্ডের আদেশের পর শিশু বিবেচনায় রিমান্ড বাতিল হয়েছিল ১৭ বছরের ঢাকা কলেজের একাদশ শ্রেণি সেই শিক্ষার্থীর। কিন্তু গতকাল ঢাকার শিশু আদালতের (নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৩) বিচারক রোকসানা বেগম হ্যাপী তার জামিনের আবেদন নাকচ করেছেন।
গত ২৮ জুলাই একই আদালত এইচএসসি প্রথম বর্ষের এই শিক্ষার্থীকে শিশু হিসেবে ঘোষণা করেন। আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
মামলার সূত্রে জানা যায়, জন্মনিবন্ধন অনুসারে, ২০০৭ সালের ১৯ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করে এই কিশোর। ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সে ঢাকার শামসুল হক খান স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে গোল্ডেন এ-প্লাস পেয়েছে। সম্প্রতি কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় মাতুয়াইল হাসপাতালের বিপরীতে এক পুলিশ সদস্যকে মেরে ঝুলিয়ে রাখার মামলায় ১৭ জনকে আসামি করে করা মামলায় তাকেও আসামি করা হয়। গত ২৭ জুলাই ঢাকার নিম্ন আদালতে হাজির করা হয় তাকে। এরপর মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা অন্য আসামিদের সঙ্গে ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট শান্ত আক্তারের আদালত প্রত্যেক আসামির সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করে। তবে শিশু বিবেচনায় ওই শিক্ষার্থীর রিমান্ড বাতিল করা হয়।