দুই যুগ ধরে ফাঁসির দিন গুনে আসা শরীফা বেগমের সর্বোচ্চ সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ-াদেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। অনতিবিলম্বে তাকে কারাগারের সাধারণ সেলে স্থানান্তরের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শরীফার সঙ্গে মৃত্যুদ- পেয়ে ‘ফাঁসির সেলে’ থাকা আবদুস সামাদ আজাদ ওরফে সামাদেরও সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ-ের সাজার আদেশ দিয়েছে আপিল বিভাগ।
গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির বেঞ্চ দুজনের আপিল খারিজ করে এ রায় দেয়।
গত ১ জুলাই দৈনিক দেশ রূপান্তর পত্রিকায় ‘ফাঁসির দিন গুনে এক নারীর ২৪ বছর’ শিরোনামে এবং ‘শরীফাকে কেউ মনে রাখেনি’ উপ-শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওইদিন প্রতিবেদনটি নজরে নিয়ে আপিল মামলাটি দ্রুত শুনানির উদ্যোগ নেন প্রধান বিচারপতি। এর ধারাবাহিকতায় দীর্ঘদিন পর গত ৯ জুলাই এই আপিল মামলাটি (৯৬/২০১৭) শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসে। গতকাল মামলাটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় ৯ নম্বর ক্রমিকে ছিল।
আদালতে শরীফার পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সারওয়ার হোসেন বাপ্পি।
দেশ রূপান্তরের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, তিন মাস বয়সী মেয়ে সূচী আক্তারকে রেখে ২৬ বছর আগে হত্যা মামলায় শরীফা বেগম কারাগারে যান। ৫৫ বছরের জীবনের প্রায় ২৪ বছরই ‘মৃত্যু সেলে’ থাকা শরীফার মামলার বিচারই এখনো শেষ হয়নি। শরীফার মতো সামাদও একই মামলায় মৃত্যুদ-প্রাপ্ত হয়ে ২৪ বছর ধরে ফাঁসির সেলে বন্দি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর শাহজাহানপুর এলাকার একটি ফ্ল্যাটে সংঘটিত ওই খুনের ঘটনায় ১৯৯৮ সালে গ্রেপ্তারের পর ২০০০ সালের ৩১ অক্টোবর বিচারিক আদালতে তার ফাঁসির রায় হয়। সেই থেকে শরীফা ফাঁসির সেলে (কনডেম সেল) বন্দি। ২০০৩ সালের ২২ জুলাই হাইকোর্টে তার এবং সামাদের সাজা বহাল থাকে। তবে, হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় পেতে পেরিয়ে যায় ১৩ বছর সময়। এরপর ২১ বছরেও তার আপিল নিষ্পত্তির তথ্য মেলেনি।
কারা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কারা ইতিহাসে আর কোনো নারী আসামিকে এত দীর্ঘ সময় ফাঁসির সেলে থাকতে হয়নি। ২০১৬ থেকে শরীফা আছেন গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের ফাঁসির সেলে।
প্রতিবেদনে অভিযোগের বরাতে বলা হয়, ১৯৯৮ সালের ২২ মে রাজধানীর মতিঝিল থানার অধীন শান্তিনগর এলাকার ১১৪/৩ নম্বর ভবনের চারতলার একটি ফ্ল্যাটে রুবিনা আক্তার নামে এক নারীকে কুপিয়ে খুন করা হয়। মামলার পর পর্যায়ক্রমে চার আসামি সামাদ, শরীফা, মো. এমদাদুল হক এমদাদ ও আবু ইউসুফ নিয়াজী ওরফে আরিফকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অভিযোগ অনুযায়ী, রুবিনার ফ্ল্যাটে গৃহকর্মীর কাজ করতেন শরীফা। একই ভবনের তিনতলার একটি ফ্ল্যাটে গৃহকর্মী সামাদের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে শরীফাকে বকাঝকা, ঘটনা প্রকাশ করা ও মারধর করে তাড়িয়ে দেন রুবিনা। আসামি আরিফ ও এমদাদ একই ভবনের প্রহরী ছিলেন। শরীফার সঙ্গে সামাদের বিয়ে দিতে এবং রুবিনার ওপর প্রতিশোধ নিতে আসামিরা পরিকল্পিতভাবে রুবিনাকে হত্যা করেন। ঢাকার আদালতে সামাদ ও শরীফাকে মৃত্যুদ-ের পাশাপাশি এমদাদ ও আরিফকে যাবজ্জীবন কারাদ-াদেশ দেয় আদালত।
অ্যাডভোকেট শিশির মনির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঘটনার সময় শরীফা ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তার গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ছিলেন। তারপরও শরীফাকে মৃত্যুদ- দেওয়া হয়েছিল এই কারণে যে, তিনি (শরীফা) রুবিনাকে হত্যার জন্য সামাদকে প্ররোচনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন। আদালতে বলেছি, একজন আসামি নারী, দীর্ঘদিন ধরে কনডেম সেলে মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করছেন। এর আগে আর কেউ এত দীর্ঘ সময় কনডেম সেলে ছিলেন না। অন্যদিকে দুই আসামির কারও বিরুদ্ধে পূর্বের ফৌজদারি মামলার নজির নেই। শুনানি নিয়ে আপিল বিভাগ দুজনের মৃত্যুদ- সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদ- দিয়েছেন।’
এ আইনজীবী বলেন, ‘রায়ের অনুলিপি পেলে রিভিউ (রায় পুনর্বিবেচনা) আবেদন করব। মামলার বিষয়বস্তু ও সাক্ষ্য আরও খতিয়ে দেখা ও পর্যালোচনার বিষয় রয়েছে। জুরিস প্রুডেন্স (আইনশাস্ত্র) বিবেচনায় আমাদের বিশ্বাস শরীফা এবং সামাদের যাবজ্জীবন কারাদ-ের বেশি সাজা হওয়া উচিত নয়। আশা করি, তখন সর্বোচ্চ আদালত আমাদের আরজি বিবেচনায় নেবেন।’