যুদ্ধ নয় বন্ধুত্বই খেলা

ছোট খেলার যে ক’জন ক্রীড়াবিদ স্বমহিমায় বড় হয়েছেন, তাদের অন্যতম মোহাম্মদ আসিফ হোসেন খান। বলা যায়, দেশের চার দশকের অলিম্পিক যাত্রায় কেবলমাত্র তাকে ঘিরেই জাতি দেখেছিল পদকের স্বপ্ন। সেই স্বপ্ন অপূরণীয় থাকার আক্ষেপটা সবার মতো তাকেও পোড়ায় ভীষণভাবে। দেশ রূপান্তরের স্টুডিওতে বর্তমানে কোচিং পেশায় জড়িত থাকা আসিফের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া প্রতিবেদক সুদীপ্ত আনন্দ, আলোকচিত্র সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ এবং জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল। ক্যামেরায় ছিলেন নুরুস সাফা।

মো হাম্মদ আসিফ হোসেন খান। দেশের শুটিংয়ের ইতিহাস অসম্পূর্ণ থাকবে, এই নামটা না থাকলে। হঠাৎ জ্বলে উঠেই হারিয়ে যাওয়া এক নক্ষত্র তিনি। এই নামটি যখন উচ্চারিত হয়, তখন গর্ব যতটা হয়, তারচেয়ে বেশি হয় আক্ষেপ। তিনি এলেন, ঠিক মধ্যদুপুরে। সুঠামদেহী, উজ্জ¦ল শ্যামবর্ণের এই মানুষটি বরাবরই হাসিমুখ। দেখলে মনেই হয় না, তিনিই আমাদের জাতীয় সম্পদ। বেশ কিছুক্ষণ  আড্ডা হলো, সম্পাদক মোস্তফা মামুনের রুমে। এরপর গেলেন ছবি তুলতে। হাসি আর গম্ভীরমুখে বেশ কিছু ছবি তুললেন। এরপর সোজা ডিজিটাল রুমে। তাকে পেয়েই জমে উঠল আড্ডা। সুদীপ্ত আনন্দ ক্যামেরার সামনে হাসিমুখে অনেকক্ষণ তার সম্পর্কে ভূমিকা দিলেন। তিনি মুচকি হাসছেন। প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার। তাকে অভয় দিলেন সুদীপ্ত আনন্দ। বললেন, যা বলতে ইচ্ছে হয় তাই-ই বলবেন। কোনো সমস্যা হবে না। আর যা কিছু বাদ দেওয়ার সেটা আমাদের কাজ। তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। এমন কথায় হাসলেন সবাই। শুরু হলো প্রশ্নোত্তরপর্ব।

সুদীপ্ত আনন্দ: আপনি ২০০৪ এথেন্স অলিম্পিকে বাংলাদেশের পতাকা বহন করেছেন। ৪ দশক ধরে বাংলাদেশের অলিম্পিক যাত্রা। পদক দূরের কথা, যা এখন পর্যন্ত আমাদের জন্য অংশগ্রহণ, আনুষ্ঠানিকতা আর অভিজ্ঞতা অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। একজন অলিম্পিয়ান হিসেবে এটা কতটা পোড়ায় আপনাকে?

আসিফ: সত্যি বললে খুব বেশি পোড়ায় না। মনে হয়, আমরা সাফল্যের খুব কাছে। তবে কতটা কাছে, সেটা আমরা নিজেরাও জানি না। একটা অলিম্পিকের পর আমাদের যে কার্যক্রম থাকে সেখানে কোথাও একটা ফাঁক থেকে যায়। শুটার রিংকি ভাই, সাবরিনা আপা যখন অলিম্পিক খেলেছিলেন, তখন সোনাজয়ীর থেকে তাদের পয়েন্টের পার্থক্য ছিল ৬ বা ৭। আমি যখন খেলেছি, তখনো ব্যবধান কম ছিল। বাকির সময়ও তাই। ব্যবধান হিসাব করেই বলছি, আমরা পদকের খুব কাছাকাছি আছি। আমার মনে হয় আরেকটু সুন্দরভাবে যদি পরিকল্পনা করা যেত, সবকিছু যদি আরেকটু সুন্দরভাবে সাজানো যেত, রাইফেল-গুলির সমস্যাগুলো যদি সমাধান করা যেত...। আমরা কিন্তু এখনো ওয়াইল্ড কার্ড (পড়–ন আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির দয়া-দাক্ষিণ্যে) নিয়ে অলিম্পিকে অংশ নিচ্ছি। আরেকটু গুছিয়ে নিতে পারলে অবশ্যই শুটিংয়ে কোটা প্লেস (সরাসরি খেলার যোগ্যতা) অর্জন করা যেত।

তাপস রায়হান: গুলি, রাইফেলের অপ্রতুলতার কথা বললেন। এগুলো কি ফেডারেশন দেয়? আপনারা কি তাদের কোনো চাপ প্রয়োগ করেছেন এই সমস্যাগুলো সমাধানে?

আসিফ: তারা চেষ্টা করছে। কিছুদিন আগেই তারা ৭টা রাইফেল আনিয়েছে ইউরোপ থেকে। গুলিও এনেছে। শুনেছি আরেকটা চালান তারা খুব দ্রুতই নিয়ে আসবে। তবে হয় কি, চাইলেই বিদেশ থেকে গুলি-অস্ত্র আনা যায় না। বেশ কিছু প্রক্রিয়া পার করে আনতে হয়। এতে বড় একটা সময় চলে যায়। এই প্রক্রিয়াটা যদি মসৃণ করা যেত, তাহলে সংকট থাকত না।

তাপস রায়হান: তাদের সংকটের কারণে আপনাদের অনুশীলন কি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে?

আসিফ: এটা অবশ্যই একটা বড় কারণ। যে পরিমাণ আমাদের প্রয়োজন এবং যে পরিমাণে আসছে তাতে সংকট পুরোপুরি কাটছে না। তাছাড়া প্রক্রিয়াগত জটিলতায় আসতে দেরি হওয়ায় এসব জিনিসের দামও বাড়ছে দিন দিন। আমরা যখন খেলতাম, তখন ৫০০ গুলির দাম ছিল ৬০০ টাকা। সেটা এখন ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা হয়ে গেছে। এগুলো আনা হয় জার্মানি থেকে। ইউরোপিয়ান কিছু নিয়ম আছে যে, তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে নির্দিষ্ট পরিমাণ অস্ত্র যাবে। তাই ফেডারেশন চেষ্টা করেও পর্যাপ্ত সরঞ্জাম আনতে পারছে না। তবে সুখবর হলো, বাংলাদেশ সরকার শুটিংয়ের সরঞ্জাম শুল্কমুক্ত করে দিয়েছে। কিন্তু আনার সময় ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে অনুমতি নিতে হয়, যে দেশ থেকে আনা হয় (জার্মানি) সে দেশের অনুমতি লাগে। আবার আমাদের দেশের সরকারেরও বেশ কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হয়। তাই নির্দিষ্ট সময়ে সরঞ্জামগুলো পৌঁছায় না।

সাহাদাত পারভেজ: ক্যারিয়ার নিয়ে আলোচনার আগে আপনার প্রারম্ভিক জীবন সম্পর্কে জানতে চাই। আপনার জন্ম, পড়াশোনা এবং শুটিংয়ে আসা। এত খেলা থাকতে শুটিংয়ে কেন এলেন?

আসিফ: আমি পাবনার ছেলে। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাবনা জিলা স্কুলে পড়েছি। তারপর বিকেএসপিতে ভর্তি হই। শুটিংয়ে আসার গল্পটা এমন হরলিকসের একটা বিজ্ঞাপন ছিল, ‘সবাই সবার মতো করে খায়, আর আমি তো এমনি এমনি খাই।’ ছোটবেলায় আমার এক্সট্র্রিম স্পোর্টসগুলোর প্রতি ঝোঁক ছিল। যেমন স্কেটিং, সাইক্লিং, লং ড্রাইভ ইত্যাদি। সেগুলো খেলতাম, আর শুটিংটা আমার এমনি এমনিই হতো। পাবনায় আমাদের বাসায় ৬ পুরুষ ধরে বন্দুক আছে। আমার বাবা এবং মা শুটার ছিলেন। নানা এবং দাদা দুজনেই রাইফেলস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ছোটবেলায় মায়ের সঙ্গে শুটিং ক্লাবে গেছি। মা শুটিং করেছেন, আমি পাশে বসে দেখতাম। বাবার শুটিং করা আমি দেখিনি। তবে তার শুটিং এবং শিকারের কিছু ছবি দেখেছি। কখনো খেলনা বন্দুক নিয়ে খেলিনি। বড়রা শিকার শেষে ফিরে আমাকে আসল বন্দুক পরিষ্কার করতে বলতেন। বলতে পারেন, পরম্পরা থেকেই আমার শুটিংয়ের প্রতি নেশা। তাছাড়া একটা কম্পিটিশনে ৬০টা গুলি করতে হয়। লক্ষ্যপূরণের যে মজা, এই আনন্দ, এটাও আমাকে শুটিংয়ের দিকে নিয়ে গেছে।

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল: বিকেএসপিতে কি শুটিংয়েই ভর্তি হয়েছিলেন? নাকি অন্য কোনো খেলায়। সেই গল্পটা বলুন?

আসিফ: সাধারণত ক্লাস সেভেন ছাড়া বিকেএসপিতে ভর্তি হওয়া যায় না। অথচ আমি ক্লাস নাইনে বিকেএসপিতে ভর্তি হই। সেটা ১৯৯৯ অথবা ২০০০ সালের ঘটনা। আমার জীবনে একটা ছোট টুইস্ট ঘটে যায়। এর জন্য আল্লাহ এবং সেলিম স্যারের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। ২০০০ সালে বিকেএসপিতে আসি একটা অ্যাথলেটিকসের ক্যাম্পে। ওইসময় ইন্টার ক্লাব শুটিংয়ের টুর্নামেন্ট হচ্ছিল। আমি অ্যাথলেটিকসের ছুটি নিতে গেলাম ফারুক স্যারের কাছে। সেখানে সেলিম স্যারও ছিলেন। তিনি বললেন, তুই খেলিস কী? আমি বললাম, স্যার আমি অ্যাথলেটিক্স খেলি আর শুটিং আমার এমনি এমনি হয়। এটা শুনে সেলিম স্যার ফারুক স্যারকে অনুরোধ করলেন, আমাকে ছুটি দিয়ে দিতে। আমি গিয়ে কম্পিটিশন করে ফোর্থ বা ফিফথ হই। এরপর সেলিম স্যার এসে বলেন, তুই অ্যাথলেটিক্স না শুটিংয়ে ভর্তি হবি। এভাবেই আমার শুটিংয়ে আসা। আমি ছিলাম বিকেএসপির শুটিং বিভাগের প্রথম ব্যাচের প্রথম ছাত্র।

সুদীপ্ত আনন্দ: ভারতের অভিনব বিন্দ্রাকে শ্যুটঅফে হারিয়ে ২০০২ কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জিতেছিলেন। এত অল্প বয়সে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাজিমাত করেন। সে সময় আপনাকে নিয়ে রীতিমতো শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। নিশ্চয় সেই স্মৃতিগুলো ভুলে যাননি?

আসিফ: শুরু থেকেই বলি। ওই সময় আমার বয়স ছিল ১৬ বছর। আমি যখন বিকেএসপিতে ভর্তি হই, তখনই আত্মবিশ্বাস ছিল যে আমি ভালো করব। এজন্য আমি আবারও কৃতজ্ঞতা জানাই সেলিম স্যারকে। আমরা ছিলাম বিকেএসপির প্রথম ব্যাচ। তিনি একদিন বললেন, দুই বছর পর বেশ কিছু টুর্নামেন্ট আছে। সেটাতে তোমরা খেলবে। এরপর তিনি আমাদের সবার বাড়ি কোথায় জানতে চাইলেন। আমি বললাম পাবনা, কেউ বলল টাঙ্গাইল, কেউ গাজীপুর। উনি তখন একটা পাঁচশ টাকার নোট বের করে দিয়ে বললেন- এখানে পাবনা, টাঙ্গাইল কিংবা গাজীপুর খুঁজে বের করো। আমরা বিভ্রান্ত হয়ে খুঁজতে লাগলাম, পারলাম না। এরপর তিনি পাসপোর্ট এগিয়ে দিয়ে একই কথা বললেন। আমরা এবারও নিশ্চুপ। তখন বললেন, এখন থেকে তোমাদের বাড়ি বাংলাদেশ। কেবলমাত্র বাংলাদেশের জন্য খেলবে। সেই থেকে আমাদের যাত্রা শুরু। বিকেএসপিতে তখন থেকেই আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ছিল। আমরা মনিটর টার্গেটে অনুশীলন করে দুবছর পর যখন ইংল্যান্ডে (ম্যানচেস্টারে) খেলতে গেছি, তখন মনে হয়নি আমি বাইরে কোথাও খেলছি। এটা আমার অনেক উপকার করেছে। ম্যানচেস্টারে কোয়ালিফিকেশনে হয়েছিলাম পঞ্চম। আর অভিনব বিন্দ্রা ছিল ১-এ। সে ততদিনে ওয়ার্ল্ড জুনিয়র চ্যাম্পিয়ন। তবে ফাইনাল আমার জন্য সবসময়ই ইন্টারেস্টিং। ফাইনালে বিন্দ্রার সঙ্গে আমার পয়েন্ট পার্থক্য ছিল দশমিক ২! ৮ নম্বর শট পর্যন্ত বিন্দ্রা এগিয়ে ছিল। তারপর আমি এগিয়ে যাই। সেই স্মৃতি কখনই ভুলব না।

সুদীপ্ত আনন্দ: প্যারিস অলিম্পিকে আইওসির শুভেচ্ছাদূত হিসেবে গেছেন বিন্দ্রা। তিনি বাংলাদেশি সাংবাদিকদের কাছ থেকে আপনার খোঁজখবর নিয়েছেন। দুজনের লড়াই হয়েছিল ২২ বছর আগে। অথচ এখনো তিনি আপনাকে ভুলেননি..।

আসিফ: এটাই আসলে স্পোর্টস। খেলাধুলার মূল বিষয়টাই হলো লড়াই হবে, সেই সঙ্গে বন্ধুত্বও থাকবে। যুদ্ধ নয়, বন্ধুত্বই খেলা। কমনওয়েলথ গেমসে ও ছিল হট ফেবারিট। তার পদক নিশ্চিত ছিল। সে তার বইতেও লিখেছে, সবকিছু ঠিক ছিল। কোত্থেকে একটা ছেলে এসে পদক ছিনিয়ে নিল! যাই হোক, ও সবসময়ই আমার ভালো বন্ধু ও পরামর্শক ছিল। ওর কাছ থেকে অনেক টিপস পেয়েছি। সে সবসময় আমাকে আরও মনোযোগী হতে বলেছে।

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল: আপনার কাছে হারের পর বিন্দ্রা নিজেকে নিয়ে কাজ করতে শুরু করে। ২০০৪ এথেন্স অলিম্পিকে সে সপ্তম হয়েছিল। এরপর ২০০৮ বেইজিং অলিম্পিকে জিতে নেয় সোনা। এথেন্সে আপনি হয়েছিলেন ৩৫তম। আর বেইজিংয়ে তো যেতেই পারেননি। এই যে বিন্দ্রা ঘুরে দাঁড়িয়ে সাফল্য পেল, আসিফ কেন পারল না? সে কেন হারিয়ে গেল?

আসিফ: এই হারিয়ে যাওয়ার জন্য প্রথমে আমি নিজেকেই দোষ দেব। ওই পর্যায়ে যাওয়ার জন্য অনুশীলনে যে পরিমাণ মনোযোগী হওয়া, নিজের উন্নতিতে যতটা গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল, হয়তো সেটা আমি দিইনি।

তাপস রায়হান: এর পেছনে কি তারকাখ্যাতি কাজ করেছে? নাকি ব্যক্তিগত জীবনের কোনো উত্থান-পতন?

আসিফ: আমি সিরিয়াস হইনি। আমি অন্যের জন্য খাটতে পারব, কিন্তু নিজের জন্য পারব না। এরকম একটা মানসিকতা ছিল। অনেকে পারে। যেমন সাকিব (আল হাসান)। যা কিছুই করুক কিংবা ঘটুক, সে তার পারফরম্যান্সটা ঠিক রাখে। পারফরম্যান্সে কোনো প্রভাব পড়তে দেয় না। এজন্য তাকে আমার খুব পছন্দ। সিরিয়াস না হওয়ায় আমার তখন যা করা উচিত ছিল এবং যা করা উচিত ছিল না, সেটা বুঝিনি। ম্যানচেস্টার গেমস করে আসার পর কিন্তু আমার পারফরম্যান্স উন্নত হয়েছে, তবে আমার প্রতিদ্বন্দ্বীদের উন্নতির গ্রাফটা আরও অনেক বেশি ছিল। তাতেই আমি পিছিয়ে পড়ি।

সুদীপ্ত আনন্দ: এক্ষেত্রে ফেডারেশন কিংবা সরকারের কোনো দায় কি নেই?

আসিফ: আমি আগেই বলেছি, প্রথম দায় আমার। তারপরও কিছু বিষয় আছে। ২০০৪ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত ৪ বছর বিন্দ্রা যে পরিমাণ সুযোগ-সুবিধা আর ট্রেনিং পেয়েছে, সেটার সঙ্গে তুলনা করলে ওই সময়টায় আমি নিজেকে ধ্বংসই করেছি। আর আমাকে ধ্বংস করার জন্য আমার চারপাশে যা কিছু ছিল সবই কাজ করেছে। প্রতিটি এলিমেন্ট।

সাহাদাত পারভেজ: ফেডারেশন কি আপনাকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পারত না? তারা কি পারত আপনাকে বিশেষভাবে যতœ নিতে?

আসিফ: তারা চেষ্টা করেছে। তবে রাস্তা পার হতে গিয়ে একটা ছেলে যদি ট্রাকের সামনে পড়ে, তাহলে উচিত আগে সেই ছেলেটাকে বিপদ থেকে বাঁচানো। বিষয়টা এমন হওয়া ঠিক না যে, ট্রাকের নিচে পড়ার পর তাকে বলবে, তুমি কেন ট্রাকের সামনে গেলে?

তাপস রায়হান: রাষ্ট্র আপনাকে কী দিয়েছে?

আসিফ: রাষ্ট্র অবশ্যই সাধ্যের মধ্যে চেষ্টা করেছে। অলিম্পিকে স্কলারশিপ দিয়েছে, চীনে, জার্মানিতে অনুশীলন করতে পাঠিয়েছে। চীনে ছিলাম প্রায় দেড় বছরের মতো। জার্মানিতে প্রথমে তিন মাস, তারপর আড়াই মাসের মতো।

সুদীপ্ত আনন্দ: অভিনব বিন্দ্রা জার্মানির সেই অ্যাকাডেমিতে কতদিন ছিলেন?

আসিফ: (একটু হেসে) বিন্দ্রা সেখানে ১২ বছরের মতো ছিল। আরও কিছু বিষয় আছে। এসএ  গেমসে কিন্তু ভারতের শীর্ষ শুটাররা খেলে না। কলকাতার টপ শুটাররাও না। আমাকে সেই পর্যায়ে নিয়মিত খেলতে হয়েছে। বলতে পারেন আমার লেভেলের অনেক নিচে আমাকে নিয়মিত খেলতে হয়েছে। তাছাড়া ঘরোয়া পর্যায়েও কিছু খেলা খেলতাম। সেখানেও আমার লক্ষ্য ছিল সহজ। আমি যে লম্বা রেসে দৌড়াব, সেই সুযোগটাই তো ছিল না। বিন্দ্রারা নিয়মিত সারা দুনিয়ে চষে বেড়িয়ে বড় বড় টুর্নামেন্ট খেলে নিজেদের প্রস্তুত করেছে।

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল: ভারতে শুটিংয়ের পেছনে বছরে খরচ ৫০ থেকে ৬০ কোটি রুপি। প্যারিস অলিম্পিকে একাধিক পদকজয়ী শুটার মানু ভাকেরের পেছনেই বছরে ২ কোটি রুপি ব্যয় হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে শুটিং ফেডারেশন সরকার থেকে বছরে পায় মাত্র ১১ লাখ টাকা! এখানেই তো পার্থক্যটা পরিষ্কার।

আসিফ: দোষটা পুরোপুরি সরকারকে দেব না। আমরা যখন সরকারের কাছে প্রস্তাব নিয়ে যাচ্ছি, তখন কিন্তু সরকার সেটা অনুমোদন করে দিচ্ছে। খেলোয়াড়রাও চেষ্টা করছে নিজেদের সর্বোচ্চটা দিতে। কিন্তু যারা তদারকি করছে, পরিকল্পনা করছে এবং সেগুলো বাস্তবায়ন করছে, সমস্যাটা হচ্ছে সেখানেই। সরকারকে দেখাতে হবে, এই ছেলেটাকে নিয়ে এসব কাজ করা হয়েছে। এত খরচ হয়েছে। এই ছেলেটা ভালো করবে। সেটা কি কেউ সরকারকে দেখাচ্ছে?

তাপস রায়হান: একটু অন্য প্রসঙ্গে আসি। ২০০৬ সালে পুলিশের বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছিলেন আপনিসহ বেশ কজন শুটার। সেই ঘটনার পর শুটিংয়ে চেনা রূপে আর ফিরতে পারেননি। আসলে সেদিন কী হয়েছিল আপনাদের সঙ্গে?

আসিফ: সেদিন ছিল ২ অক্টোবর। গুলশান শুটিং রেঞ্জে আমরা জাতীয় দলের শুটাররা অনুশীলন করছিলাম। কোনো একটা কারণে আমাদের শুটিং ক্লাবের দারোয়ানকে কয়েকজন পুলিশ পেটাচ্ছিল। আমরা অনুশীলন শেষে বেরিয়ে এই ঘটনা দেখে প্রতিবাদ করি। তখন হাতাহাতির ঘটনা ঘটলে আমাদের ধরে গুলশান থানায় নিয়ে যায়। আমাদের পরিচয় জানার দেড় ঘণ্টা পর থানার ভেতরেই আমাদের লাঠি দিয়ে ব্যাপক মারধর করা হয়। আমাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে শুধু কবজি এবং পায়ের তলায় মেরেছিল। কারণ, শরীরের এই দুটি জায়গা শুটিংয়ের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমার শরীরের আর কোথাও মারেনি! এই বিষয়টা এখনো আমার কাছে বড় একটা প্রশ্ন হয়ে আছে। কেন তারা এভাবে মারল? এরপর মামলাও করেছিল। ৬ বছর আমাকে নিয়মিত হাজিরা দিতে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপে ৬ বছর পর সেই মামলা থেকে মুক্তি পাই। সাফ গেমসের সময় প্রধানমন্ত্রীকে আমি বলেছিলাম, ‘অ্যান্টি, বিয়ে করতে যাচ্ছি। ঘর-সংসার তো মনে হয় জেলেই করতে হবে।’ তখন তিনি বললেন, ‘কেন বাবা? কী হয়েছে?’ তারপর তাকে মামলার বিষয়টি জানাই।

সুদীপ্ত আনন্দ: আসিফের হারিয়ে যাওয়া, দেশের শুটিংয়ে অনেক বড় আক্ষেপ। অথচ এটা তো অন্যরকমও হতে পারত। যেমনটা হয়েছে বিন্দ্রার ক্ষেত্রে?

আসিফ: এই পর্যায়ে এসে যখন আমার ম্যাচিউরিটি বেড়েছে, নিজের ভুলগুলো বুঝতে পেরেছি। আগে ভাবতাম, ওমুকে আমার এই কাজটা করে দিলে হয়তো আমি এগিয়ে যাব। আর এখন মনে হয়, কারও জন্য অপেক্ষা না করে তো নিজেই করতে পারতাম। জানেন, বাচ্চাদের শেখানোর সময় ইচ্ছে হয়, রাইফেলটা নিয়ে আবার দাঁড়িয়ে যাই।

সুদীপ্ত আনন্দ: একটা সময় বিকেএসপির ছাত্র ছিলেন, এখন সেখানকার কোচ। কেমন লাগে এই পরিবর্তনটা?

আসিফ: ভীষণ ভালো লাগে। এটা আমার একটা স্বপ্ন ছিল। শোয়েব ভাই, ফয়েজ ভাই তারা শুটার থেকে কোচ হয়েছেন। তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি। তখন ভাবতাম, আমি ক্যারিয়ার জুড়ে যা শিখেছি, তা যদি অন্যদের দিয়ে যেতে পারি, তাহলে আমার দেশ এগিয়ে যাবে। আমি জার্মানিতে অনুশীলন করেছি, চীনে অনুশীলন করেছি, ওই টেকনিক আমি জানি। এই অভিজ্ঞতাগুলো ছাত্রদের আমি শেখাই। অলিম্পিকে দেশের পতাকা বহন করেছি। সেই অনুভূতিটা তো আমি জানি। সেই ছবি দেখিয়ে আমি তাদের অনুপ্রাণিত করি।

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল: বিকেএসপিতে আপনারা কী লক্ষ্যে কাজ করেন? আরও জানতে চাই যে, বিকেএসপি ছাড়ার পর ক্রীড়াবিদদের কেন অনিশ্চিত একটা সময়ের মধ্যে পড়তে হয়?

আসিফ: প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেই। আমাদের কোনো পদকের লক্ষ্য থাকে না। তবে আমরা ছাত্রদের শূন্য থেকে একটা স্ট্যান্ডার্ড লেভেল পর্যন্ত নিয়ে যেতে চেষ্টা করি। যাতে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। আর বিকেএসপি ছাড়ার পর যা হয়, আমি নিজেই তার ভুক্তভোগী। যখন বিকেএসপি থেকে বের হই, তখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ক্রীড়া কোটা বন্ধ হয়ে যায়। আমি তখন অথৈ সাগরে পড়ে যাই।  অন্য খেলার ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রেও আসলে সেটাই হয়। বিকেএসপিতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সবকিছু হয়। কিন্তু উচ্চমাধ্যমিকের পর বের হলে তাদের গাইড করার কেউ থাকে না। তাই বেশিরভাগই হারিয়ে যায়। আবারও সাকিবের কথা বলতে হয়। বিকেএসপি ছাড়ার পর সাকিবকে যদি সালাউদ্দিন স্যার গাইড না করতেন, তাহলে সে দাঁড়াতে পারত না। বছর দুই আগে অবশ্য বিকেএসপিতে অনার্স চালু করা হয়েছে। আরেকটা বিষয় হলো, বিকেএসপি থেকে বের হওয়ার পর ক্রীড়াবিদদের আগলে রাখার মতো শুরুতেই তেমন কাউকে পাওয়া যায় না।

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল: আমাদের খেলার জগতের ৮০-৯০ ভাগ ছেলে-মেয়ে উঠে আসে নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে। তাদের আর্থিক এবং সামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টাও তো জরুরি। এখানে নিশ্চয় বড় একটা ঘাটতি থেকে যায়?

আসিফ: আর্থিক সংকট তো লেগেই থাকে। তবে সংস্থাগুলো যেমন সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, পুলিশ, আনসার কিছু খেলোয়াড়কে চাকরি দেয়। সত্যি বললে সংস্থাগুলো এই পৃষ্ঠপোষকতাটুকু না করলে দেশের ক্রীড়াঙ্গনের অবস্থা আরও নাজুক থাকত। ছোট খেলাগুলো বলতে গেলে শেষ হয়ে যেত। তাতে অনেক খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেত।

সাহাদাত পারভেজ: আমাদের শুটিংয়ের বর্তমান অবস্থা নিয়ে একটু বলুন?

আসিফ: এবারের অলিম্পিকে খেলা রবিউল ইসলাম ভালো করছে। অপু ভাইরা (শুটিং স্পোর্টস ফেডারেশনের মহাসচিব ইন্তেখাবুল হামিদ অপু) চেষ্টা করছেন নতুন কিছু খেলোয়াড় আনতে। আসলে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ক্লাবগুলোর অবস্থা ভালো নয়। অনেকগুলো রাইফেলস ক্লাব বন্ধ হয়ে গেছে। বাকিগুলোর কার্যক্রমও স্থবির। গুলি, অস্ত্রের দাম বেড়ে গেছে। ক্লাবগুলোর রেঞ্জ নেই। কিছু অস্ত্র-গুলির মিস ইউজ হওয়ায় নানা রকম নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এতেও সমস্যা হয়েছে। এসব কারণে প্রতিভার একটা সংকট তৈরি হয়েছে। তবে এখন ছেলেদের চেয়ে মেয়ে শুটাররা একটু ভালো করছে।

সাহাদাত পারভেজ: বর্ণিল ক্যারিয়ারে অনেক কিছু পেয়েছেন। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ফ্ল্যাট উপহার দিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছেন। ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন আপনাকে সর্বকালের সেরা দশ ক্রীড়াবিদের একজন হিসেবে পুরস্কৃত করেছে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে আপনার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিগুলো নিয়ে কিছু বলুন।

আসিফ: ফ্ল্যাটটা আসলে আমার নিজের চাওয়া নয়, আমার মা খুব করে চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী সেটা দিয়েছেন, তার প্রতি কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আর অপ্রাপ্তি... সত্যি বললে আমি যা পেয়েছি, তাতে আমি খুশি। তবে দেশকে আরও কিছু দেওয়ার ছিল। নিজের দোষের জন্য আমি সেসব করতে পারিনি। অন্য কাউকে দোষ দেব না।

সুদীপ্ত আনন্দ: আপনার বয়স এখন ৩৮। এখনো বিশ্বের অনেকে খেলা চালিয়ে যাচ্ছে। চাইলে তো এখনো আপনি খেলতে পারতেন। এত আগে শুটিং ছেড়ে দিলেন কেন?

আসিফ: শুটিং ছাড়তে চাইনি। নিজের ভুল এবং পরিবেশ-পরিস্থিতি-সমাজ আমাকে থাকতে দেয়নি।

সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল: কোচ হিসেবে দেশ ও জাতিকে আপনি আর কী দিতে চান?

আসিফ: চেষ্টা করছি কিছু খেলোয়াড় তৈরি করতে। একজন পদকজয়ী অলিম্পিয়ান উপহার দিতে পারলেই কোচ হিসেবে নিজেকে সার্থক মনে করব।

তাপস রায়হান: ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বলুন। বিয়েটা কীভাবে হলো?

আসিফ: আমার স্ত্রীর সঙ্গে সেই ছোটবেলা থেকেই পরিচয়। সে ছিল আমার পেন-ফ্রেন্ড। ২০০০ সালে ওকে প্রপোজ করেছিলাম। এর আগে কথা ছিল, ওর সঙ্গে প্রেম করব সারা জীবন কিন্তু বিয়ে করব না। মাঝে সে আমার জন্য দুবার ঘটকালিও করেছিল (হাসি)। কিন্তু পরে মনে হলো, ঘটককেই বিয়ে করে ফেলা ভালো, হাহাহাহাহাহা। তাই ২০১১ সালে ওকে বিয়ে করে ফেললাম। পরের বছর খেলা ছেড়ে দিই। এখন আমাদের ঘরে তিনটি সন্তান।

গ্রন্থনা: সত্যজিৎ কাঞ্জিলাল ও সুদীপ্ত আনন্দ

ছবি: আবুল কালাম আজাদ

লোকেশন: গ্রিন লাউঞ্জ