দ্রোহের মিছিল মৃত্যুর বিষাদ

শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি ঘিরে গতকাল শুক্রবার দেশের বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। রাজধানীর উত্তরা, সিলেট, খুলনা, হবিগঞ্জ, নরসিংদী, লক্ষ্মীপুরসহ সাতটি জেলায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়ার পাশাপাশি লাঠিপেটা করে পুলিশ। এ ছাড়া একাধিক জায়গায় ক্ষমতাসীন দল সমর্থকদের আগ্নেয়াস্ত্র হাতে মাঠে দেখা গেছে। এসব সহিংসতায় পুলিশ সদস্যসহ দুজন নিহত এবং ২৬৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এ নিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে হামলা, সংঘর্ষ, সহিংসতায় ১৬১ জন নিহত হলেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের গতকাল ‘সারা দেশের মসজিদে জুমার নামাজ শেষে দোয়া, কবর জিয়ারত, মন্দির, গির্জাসহ সব প্রার্থনালয়ে প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি ছিল। এর অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মিছিল বের করে বিক্ষোভকারীরা। দিনভর বৃষ্টি উপেক্ষা করে এসব মিছিলে অংশ নেন শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

এদিকে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জামায়াত-শিবিরের প্রশিক্ষিত ক্যাডাররা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে।

‘দোয়া-প্রার্থনা ও গণমিছিল’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে বেলা ১১টা থেকে রাজধানীর কয়েকটি জায়গায় জড়ো হতে থাকে বিক্ষোভকারীরা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ও রাজধানীর বাইরে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

হবিগঞ্জে জুমার নামাজের পর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ এবং আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। এতে একজন নিহত ও কমপক্ষে ৫০ জন আহত হন। নিহত মোস্তাক মিয়া (৩২) পিডিবির কাজ করা একটি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের কর্মী বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ফোরম্যান নূর বখত। মোস্তাক মিয়া সিলেটের টুকেরবাজার এলাকার বাসিন্দা। সংঘর্ষ চলাকালে জেলা আওয়ামী লীগের অফিস ও বিএনপির অফিসে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া হবিগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) আবু জাহিরের বাসার সামনে থাকা একটি প্রাইভেট কার ও নয়টি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা আড়াইটার দিকে খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে টাউন হলের দিকে আসতে থাকে আন্দোলনকারীরা। এ সময় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলমগীর চৌধুরীসহ ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীরা টাউন হল এলাকায় অবস্থান নেন। একপর্যায়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে তাদের। পরে আন্দোলনকারীদের ধাওয়ায় পালিয়ে যান ছাত্রলীগ-যুবলীগ নেতাকর্মীরা। তখন আন্দোলনকারীরা টাউন হল রোডে আওয়ামী লীগের অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয়। খবর পেয়ে রায়ট কার নিয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়ার সময় টাউন মসজিদের সামনে প্রধান সড়কের দুদিক থেকে আন্দোলনকারীদের ব্যারিকেডের মুখে পড়ে পুলিশ। শুরু হয় পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রেণে শতাধিক রাউন্ড টিয়ার গ্যাস শেল ও রাবার বুলেট ছোড়ে। পরে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ এমপি আবু জাহিরের বাসায় হামলা চালায়। তারা ইটপাটকেল ছুড়ে বাসার দরজা-জানালা ভেঙে ফেলে। সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি শান্ত হয়।

পিডিবির ঠিকাদারের কর্মী মোস্তাক মিয়ার মৃত্যু সম্পর্কে জানতে চাইলে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খলিলুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ বিষয়ে কিছু জানি না।’

এ বিষয়ে হবিগঞ্জ আধুনিক হাসপাতালের আরএমও মোমিন উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘মোস্তাককে আহত অবস্থায় আনা হয়। তার ডান হাতের বগলের পেছনে কিছু অংশ মাংস উড়ে গেছে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, এটি গুলির আঘাত। ময়নাতদন্তের পর মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।’

পিডিবির কাজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ফোরম্যান নূর বখত বলেন, তারা শহরতলির ভাঙ্গাপুল এলাকায় থাকেন। মোস্তাক জুতা কেনার জন্য শহরে যান। দীর্ঘসময় তিনি বাসায় না ফেরায় খোঁজ নিতে গিয়ে তার মৃত্যুর খবর পান।

খুলনায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশ ও বিজিবির দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ হয়েছে। বিকেল সাড়ে ৩টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চার ঘণ্টা দুপক্ষের সংঘর্ষে নগরীর গল্লামারী থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত দুই কিলোমিটার এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষের মধ্যে একজন পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া ২০-২৫ জন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত একশ মানুষ আহত হয়েছেন।

নিহত সুমন কুমার ঘরামী (৩৩) খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইনসে কর্মরত ছিলেন। সন্ধ্যায় গল্লামারী কাঁচাবাজার এলাকায় হামলার শিকার হন তিনি।

খুলনার সংঘর্ষে আহতদের মধ্যে অনেকেই গুলিবিদ্ধ রয়েছেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত একজন ছাত্রী ও একজন পুলিশ সদস্যসহ ২৫ জনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ রাবার বুলেট, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল ছোড়ে। আন্দোলনকারীরা নগরীর গল্লামারী এলাকায় পুলিশের একটি গাড়ি আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। এ ছাড়া বেশ কিছু দোকানপাট ভাঙচুর করা হয়।

খুলনা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. মোজাম্মেল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সুমন নামে আমাদের একজন কনস্টেবল মারা গেছেন। আমাদের ২০ থেকে ২৫ জন গুরুতর আহত। সারা দিন তো আমরা ধৈর্যের পরিচয় দিলাম। আমরা ফাঁকা রাবার বুলেট ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছাড়া কিছু মারিনি। কিন্তু তারা তো মানল না। ২০-২৫ দিন ধরে আমরা ধৈর্য ধারণ করেছি। অথচ তারা আমাদের লোককে পিটিয়ে মেরে ফেলল।’

গণমিছিল কর্মসূচি কেন্দ্র করে গতকাল রাজধানী ঢাকা ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিরাপত্তার চাদরে মোড়ানো। প্রতিটি মোড়ে মোড়ে পুলিশ, আনসার ও বিজিবি সদস্য দেখা গেছে। মাঠে ছিলেন সেনাসদস্যরাও। উত্তরায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এতে দুজন গুলিবিদ্ধ ও অর্ধশতাধিক আহত হন। আন্দোলনকারীদের ছাত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়। গতকাল জুমার নামাজের পর উত্তরার বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নেয় আন্দোলনকারীরা। এর আগে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ ঢাকার শিক্ষার্থীরা সকাল ১০টায় কলেজের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। তাতে অংশ নেন শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ ছাত্রছাত্রী।

দুপুর ২টার দিকে উত্তরার বিভিন্ন স্কুল-কলেজের দুই শতাধিক ছাত্রছাত্রী কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেন। ধীরে ধীরে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজন মিছিলে যোগ দেওয়া শুরু করলে সড়কে টহলরত সেনাসদস্য ও পুলিশ সদস্যরা মিছিলে বাধা দেন। বাধার মুখে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে হাউজ বিল্ডিংয়ের দিকে যেতে থাকে। অন্যদিকে বৃষ্টি অপেক্ষা করে জমজম টাওয়ার থেকে ১১ নম্বর ব্রিজে মিছিল নিয়ে আসতে চাইলে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ব্যবহার করে। এ সময় একজন গুলিবিদ্ধ হওয়ার সংবাদ পাওয়া গেছে। তিনি হলেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের (আইইউবি) শিক্ষার্থী তাহমিদ হুজাইফা। আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিলে ২০-২৫ জন ১১ নম্বর সেক্টরের ৪ নাম্বার রোডের দুটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। বাড়ি দুটি যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা ঘিরে রাখে। একপর্যায়ে আটকে পড়া নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তারা সেখান থেকে দুজন দুজন করে বের হয়ে বাড়ি ফিরে যান। এ ছাড়া পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীদের রামদা, পিস্তলসহ বিভিন্ন অস্ত্র নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা করতে দেখা যায়।

বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করেনি উল্লেখ করে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উত্তরা জোনের সহকারী কমিশনার সুমন কর বলেন, ‘বেশ কিছু আন্দোলনকারী জড়ো হয়। আমরা তাদের সড়ক থেকে সরে যেতে বলি। তারা আমাদের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। একপর্যায়ে জনসাধারণের নিরাপত্তা বিবেচনা করে আমরা তাদের ছত্রভঙ্গ করে দিই। এ সময় কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়।’

গতকাল জুমার পর রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব ও শাহবাগ এলাকায় মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। দুপুর ২টায় ঢাকা কলেজ এলাকা থেকে মিছিল শুরু করে সায়েন্স ল্যাবে অবস্থান নেন শিক্ষার্থীরা। এরপর আশপাশের মোড়গুলোতে দফায় দফায় মিছিল করে আবার সায়েন্স ল্যাবে যান তারা। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে তারা সায়েন্স ল্যাব থেকে মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ে এসে অবস্থান নেন। পরে এক ঘণ্টা অবস্থান করে সাড়ে ৫টায় মিছিল নিয়ে পুনরায় সায়েন্স ল্যাব গিয়ে কর্মসূচি শেষ করেন। মিছিলে অংশ নেন ঢাকা কলেজ, আইডিয়াল কলেজ ধানম-ি, ঢাকা সিটি কলেজ, বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ ও বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থীরা। এ সময় সায়েন্স ল্যাব মোড়ে ব্যাপক পুলিশ উপস্থিতি দেখা গেছে।

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে হতাহতের ঘটনায় দায়ীদের বিচার দাবিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন ‘শিক্ষার্থী-জনতা’। প্রায় দুই ঘণ্টা বিক্ষোভ শেষে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কর্মসূচি শেষ করে শহীদ মিনার এলাকা ত্যাগ করেন আন্দোলনকারীরা। সেখান থেকে আগামীকাল রবিবার গণমিছিল কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এর আগে দুপুরের দিকে প্রেস ক্লাব থেকে শহীদ মিনারের উদ্দেশে দ্রোহযাত্রা শুরু করে ‘শিক্ষক-জনতা’। বিকেল পৌনে ৪টায় মিছিলটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে পৌঁছায়। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ কর্মসূচিতে অংশ নেন।

রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় বৃষ্টি উপেক্ষা করেই গণমিছিল কর্মসূচি পালনে ইস্ট ওয়েস্ট ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামেন। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে আফতাবনগর থেকে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে মিছিল নিয়ে রামপুরা ব্রিজ পার হয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে আবার ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে সমাবেশে শিক্ষার্থীরা কোটা আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট সংঘাতে হতাহতের ঘটনায় বিচার দাবি করেন।

গতকাল জুমার নামাজ শেষে রাজধানীর বায়তুল মোকাররম থেকে একটি মিছিল বের হলে পুলিশের বাধার মুখে পড়ে। মিছিলটি পল্টনে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে প্রেস ক্লাব-হাইকোর্ট মোড় হয়ে আবার পল্টনে আসে। মিছিলের সামনের সারিতে ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের নেতাদের দেখা যায়।

আন্দোলনকারীদের ৯ দফা দাবির সঙ্গে সংহতি জানিয়ে রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ১ নম্বর গেটের সামনে গ্রাফিতি অঙ্কন, গায়েবানা জানাজা ও বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। এতে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। এতে সংহতি জানান অন্তত ৩০ জন শিক্ষক।

সিলেটে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। পুলিশ শটগানের গুলি, সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। আন্দোলনকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে পুলিশ, একজন সাংবাদিক, শিশুসহ অন্তত ৪০ জন আহত হয়েছেন। গতকাল বিকেলে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) সংলগ্ন আখালিয়া এলাকায় প্রথমে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ হয়। এরপর আখালিয়া, মদিনা মার্কেট, বাগবাড়ী, তেমুখী এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। রাত সাড়ে ৮টায়ও থেমে থেমে সংঘর্ষ চলছিল। শাবিপ্রবির বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কারী ফয়সাল হোসেন অভিযোগ করে বলেন, পুলিশের হামলায় অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ এক শিশু মাউন্ট এডোরা হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি রয়েছে।

সিলেট মহানগর পুলিশের উপকমিশনার আজবাহার আলী শেখ বলেন, ‘মিছিলকারীরা বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এতে অন্তত পাঁচ-ছয় পুলিশ আহত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ শটগানের গুলি, টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করেছে। এ ছাড়া আটজনকে আটক করা হয়েছে।’

নরসিংদীতে গণমিছিল কর্মসূচিতে বাধা দেয় আওয়ামী লীগ ও এর বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা। পরে তাদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষ বেধে যায়। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন। এ সময় পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বেলা ৩টায় সদর উপজেলা মোড় এলাকার নরসিংদী প্রেস ক্লাবের সামনে এ ঘটনা ঘটে। পরে বিকেল ৫টায় আন্দোলনকারীরা শহরের জেলখানার মোড়ে জড়ো হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক অবরোধ করে।

লক্ষ্মীপুরে গণমিছিলে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের হামলায় এক সাংবাদিকসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন। জুমার নামাজ শেষে শহরের চকবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এ সময় প্রকাশ্যেই আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে শিক্ষার্থীদের ধাওয়া করেন যুবলীগের এক কর্মী। তিনি হলেন সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একেএম সালাউদ্দিন টিপুর গাড়িচালক সুমন।

চট্টগ্রামে উত্তেজিত ‘ছাত্র-জনতা’র মিছিল থেকে ওয়াসার মোড়ে একটি পুলিশ বক্স ভাঙচুর করে। মিছিলটি পরে মুরাদপুর হয়ে বিকেল পৌনে ৫টার দিকে বহদ্দারহাটের দিকে চলে যায়।

নেত্রকোনায় ফেস্টুন হাতে আন্দোলনকারীরা দাঁড়ানোর সময় ছাত্রলীগ নেতা হাসিব ইবনে হান্নানের (হৃদম) বাধায় কর্মসূচি পণ্ড হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এর ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণের সময়ে সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

টাঙ্গাইলে বঙ্গবন্ধু সেতু-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করেন আন্দোলনকারীরা।

এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জ, যশোর, ঝিনাইদহ, ফেনী, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও জামালপুরে শান্তিপূর্ণভাবে গণমিছিল কর্মসূচি পালনের খবর পাওয়া গেছে।

জামায়াত-শিবির হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে : আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, জামায়াত-শিবিরের প্রশিক্ষিত ক্যাডাররা অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করার জন্য দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। এদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বানও জানান তিনি। গতকাল আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার সই করা এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন তিনি।

আন্দোলনের নামে জামায়াত-শিবিরের ‘পরিকল্পিত সন্ত্রাস ও সহিংসতার’ নিন্দা জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক। তিনি বলেন, ‘দেশবিরোধী এ অপশক্তির তৎপরতা রোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।’

বিবৃতিতে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আজ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা পরিকল্পিতভাবে যে সন্ত্রাস ও সহিংসতা করেছে, তার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। জামায়াত-শিবিরের সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা হবিগঞ্জে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অতর্কিত হামলা, জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ এবং জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু জাহিরের বাসভবনে হামলা করেছে। এরা খুলনায় পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা করে পুলিশের একজন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে।’

এর আগে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আবদুল কাদের ‘প্রার্থনা ও ছাত্র-জনতার গণমিছিল’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। তার আগে গত বুধবার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পক্ষ থেকে ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি পালন করা হয়। এদিন রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় আদালত অভিমুখে পদযাত্রা করেন শিক্ষার্থীরা।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার দাবিতে গত মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন ঘিরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ-সংঘাত, সহিংসতা, অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এতে সরকারি হিসাবেই অন্তত দেড়শ মানুষ নিহত হয়েছেন। আর কোনো কোনো গণমাধ্যমের হিসাবে এ সংখ্যা দুইশরও বেশি। আহত হয়েছেন আরও কয়েক হাজার মানুষ।

নিজস্ব প্রতিবেদক এবং চট্টগ্রাম ব্যুরো ও সংশ্লিষ্ট জেলার প্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি