কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় সহিংসতায় হতাহতের ঘটনায় মানবাধিকারের বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। বিশেষ করে গুলির ঘটনায় আইনবহির্ভূতভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়েছে, এমন দাবি করে জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও পশ্চিমা কয়েকটি দেশ উদ্বেগ ও নিন্দা জানিয়েছে। তাদের দিক থেকে তদন্তের বিষয়ে চাপও বাড়ছে। ফলে কারফিউ জারি করে সরকারের পক্ষ থেকে সহিংস পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার যে চ্যালেঞ্জ সরকারপক্ষ নিয়েছিল, তার চেয়ে মানবাধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক চাপ সামাল দেওয়া আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ঘটনার সময় আন্তর্জাতিক চাপ ছিল এক ধরনের। পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর মানবাধিকারের ইস্যুটি সামনে এসেছে। সে ক্ষেত্রে হতাহত, সরকারপক্ষের কঠোর অবস্থান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বলপ্রয়োগের বিষয়টি নিয়ে বড় হয়ে উঠেছে। এ ছাড়া তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মহল তাদের প্রত্যাশার কথা জানিয়েছে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় তদন্ত ও বিচারের জন্য জাতিসংঘ সরকারকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিয়েছে।
কোটা আন্দোলনে ঢাকাসহ সারা দেশে বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা প্রথম ঘটে ১৬ জুলাই। সেদিন ৬ জন নিহত হয়। এরপর ১৭ জুলাই আশুরার দিন কারও নিহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। ১৮, ১৯, ২০ ও ২১ জুলাই বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এরপর আহত অবস্থায় হাসপাতালে মারা যায় বেশ কয়েকজন। দেশ রূপান্তরের প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওই কয়েক দিনের সহিংসতায় এ পর্যন্ত ১৫৯ জন মারা গেছে। সরকারের কাছে ১৫০ জনের মৃত্যুর তথ্য আছে বলে জানানো হয়েছে।
২৫ জুলাই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে বলেছে, বিক্ষোভ দমনে আইনবহির্ভূতভাবে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। ৩০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশে এক খোলা চিঠিতে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড লিখেছেন, তারা বিক্ষোভকারী শিক্ষার্থীদের ওপর গুলির বেআইনি ব্যবহার, শিক্ষার্থীরা আবদ্ধ স্থানে থাকা অবস্থায় সেখানে কাঁদানে গ্যাসের বিপজ্জনক ব্যবহার এবং প্রাণঘাতী আগ্নেয়াস্ত্রের নির্বিঘ্ন ব্যবহার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষকারী বাহিনী।
গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে নিয়মিত ব্রিফিংয়ে সংস্থার মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফেন দুজারিক এ বিষয়ে নিন্দা জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গুলি ব্যবহারের যে দৃশ্য জাতিসংঘ দেখেছে, তার নিন্দা করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব। তিনি বলেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের যেকোনো দেশে মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ এবং সাংবাদিকদের স্বাধীনভাবে কাজ করার অধিকার সরকারকে রক্ষা করতে হবে।
একইদিন ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব চুক্তি স্থগিত করেছে। তাছাড়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ইতালিসহ পশ্চিমা ও অন্যান্য দেশ তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়ে বিবৃতি দিয়ে আসছিল।
দুজারিক বলেন, বাংলাদেশে যা ঘটছে, যে গণগ্রেপ্তার ও হত্যাকাণ্ড হয়েছে, তা তারা দেখছেন। সব সহিংস কর্মকাণ্ডের তদন্ত স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্যভাবে করার তাগিদ দেন তিনি।
এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যেকোনো দেশের সরকার যেকোনো বিষয়ে সাহায্য চাইলে জাতিসংঘ অবশ্যই সবসময় তা করতে প্রস্তুত। আর কীভাবে সেই সহায়তা সবচেয়ে ভালোভাবে করা যায়, তা জাতিসংঘ দেখে। এ ধরনের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত করার জন্য জাতিসংঘের লেজিসলেটিভ বডির (আইনপ্রণয়নকারী পরিষদ) অনুমতি প্রয়োজন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কোটা আন্দোলন পরিস্থিতিতে সহিংসতা শুরুর পর থেকেই সরকারপক্ষও আন্তর্জাতিক মহলের বিষয়টি আমলে রেখেছে। নিয়মিত ঢাকা বিভিন্ন দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে অবহিত করা, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে মিত্র দেশের সঙ্গে আলোচনা এবং ঢাকায় কূটনীতিকদের ব্রিফিং করা হচ্ছে। সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে সহিংসতার ভিডিও চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। গত সপ্তাহে ধ্বংসযজ্ঞের শিকার বিভিন্ন স্থাপনা সরেজমিন ঘুরিয়ে দেখানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার কোটা আন্দোলন ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে উন্নয়ন অংশীদার রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের ব্রিফিং করেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। এ সময় ছিলেন প্রধানমন্ত্রী প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খান। যুক্তরাজ্য, চীন, সুইডেন, কাতার, ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড, ভারত, রাশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ভারত, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূতরা পররাষ্ট্র সচিবের ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন।
কূটনীতিকদের ব্রিফিংয়ে শেষে সাংবাদিকদের পররাষ্ট্র সচিব মোমেন সাংবাদিকদের বলেন, ‘সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে দেশে এবং বিদেশে নানা গুজব ছড়াচ্ছে সেগুলো স্পষ্ট করতে বিদেশি মিশনগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখবে সরকার।’ তিনি বলেন, ‘চলমান ঘটনা নিয়ে সরকারের ব্যাখ্যা জানতে অনেক দেশ আগ্রহী ছিল। গ্রেপ্তারের সংখ্যা, অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ হচ্ছে কি না, বাকস্বাধীনতা আছে কি না এসব বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে কয়েকটি দেশের।’
পররাষ্ট্র সচিব জানিয়েছেন, বাংলাদেশে গঠিত তদন্ত কমিটিকে জাতিসংঘ কারিগরি সহায়তা করতে চাইলে সরকারের আপত্তি নেই। তবে আলাদা কোনো তদন্ত কমিটিতে এখনই উৎসাহ নেই সরকারের। এ ছাড়া ঘটনার শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন এবং গুজব নিয়ে বিদেশিদের অবহিত করা হয়।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে যেভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে সেভাবে যে বিদেশিরা নিচ্ছে না তা কয়েক দিনে তাদের বক্তব্য-বিবৃতিতে স্পষ্ট হয়েছে। এ নিয়ে সরকারপক্ষও কিছুটা অস্বস্তিতে রয়েছে। বিশেষ করে জাতিসংঘের এই তদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বিষয় নিয়ে আলোচনা চলছে বিভিন্ন মহলে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, যে ঘটনা ঘটেছে তাতে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা বড় চ্যালেঞ্জ সরকারের জন্য। এ চাপ সামাল দিতে না পারলে দেশের অর্থনীতির ওপরই শুধু চাপ বাড়বে না, রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিরতাও বাড়বে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের সদস্য। সেখানে আলোচনায় পরিষদ যদি বাংলাদেশ পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিশন গঠন করে, আর জাতিসংঘ যদি বিষয়গুলোর ওপর নজরদারির জন্য একজন বিশেষজ্ঞ নিযুক্ত করে, তাহলে আমাদের জন্য সেটি খুব ভালো কিছু হবে না।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেসব অভিযোগ তুলছে তার সপক্ষে বিভিন্ন প্রমাণও এরই মধ্যে তারা সংগ্রহ করেছে। তাই সরকারের পক্ষ থেকেও এগুলোকে মোকাবিলার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান তৈরি করতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ থাকা ও কিছুটা ঘাটতি থাকলে তা স্বীকার করে নেওয়াই ভালো।’