কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার প্রতিবাদে নাগরিক সমাজের মতপ্রকাশের সুযোগে তৃতীয় পক্ষ যাতে উসকানি দিতে না পারে, সে জন্য সবাইকে দায়িত্বশীল হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।
গতকাল শুক্রবার ধানমণ্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ আহ্বান জানান তিনি।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘আমরা দেখছি, নাগরিক সমাজের অনেকে চলমান সংকটে তাদের অভিমত ব্যক্ত করছেন। ব্যক্তিগত মতকে আমরা শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু রাষ্ট্রের শান্তি-শৃঙ্খলা ও জনগণের জানমালের নিরাপত্তার বিষয়টি সবার বিবেচনায় থাকা উচিত। মতপ্রকাশের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কোনো স্বার্থান্বেষী মহল যেন উসকানি সৃষ্টি করতে না পারে, সে বিষয়ে সবার সজাগ ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত।
নাগরিক হিসেবে সবার চলমান সংকট থেকে উত্তরণে ধৈর্য ধারণ করা উচিত।’
বিক্ষুব্ধ নাগরিক সমাজ ও বিক্ষুব্ধ শিল্পীসমাজ নামে যারা এখন মাঠে নেমেছে, মানববন্ধন করছে; যাদের একসময় আপনারা বিএনপির দালাল বলতেন, তাদের এখন কী বলবেন এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে কাদের বলেন, ‘আমরা সবাইকে দালাল বলি না। ঢালাওভাবে দালাল বলি না, বলা উচিতও নয়। কারও আচরণ যদি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পরিপন্থী, সরকারি কর্মকাণ্ড ও দেশের অর্জনের বিরুদ্ধে হয়, তাহলে তার বা তাদের সম্পর্কে আমাদের ভিন্নমত থাকতেই পারে।’
নাগরিক সমাজে উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। তাদের সঙ্গে সরকার আলাপ-আলোচনা করবে কি না, এমন প্রশ্নে কাদের বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর্যায়ক্রমে পেশাজীবী, সংস্কৃতিসেবী থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করেছেন। সবার সঙ্গেই মতবিনিময় হবে।’
শিক্ষার্থীদের দাবি মানার পরেও একটি মহল সরকার বনাম শিক্ষার্থী গেইম খেলে ফায়দা লোটার অপচেষ্টা করছে বলে দাবি করেন কাদের। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবি যেহেতু পূরণ হয়েছে, তাই আমরা বিশ্বাস করি, তারা শ্রেণিকক্ষে, পরীক্ষার হলে ফিরে যাবে। তারা কারও অশুভ রাজনীতির ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হোক এটা জাতি চায় না। পরিবেশ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হবে।’
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের অযথা হয়রানি ও আটক না করতে আইনপ্রয়োগকারীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো শিক্ষার্থী যেন হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকে দায়িত্বশীল সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা যাতে নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিতে পারে, সে জন্য সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। আটক পরীক্ষার্থীদের মুক্ত করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়েছে।’
জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার জন্য সরকারকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানান কাদের। তিনি বলেন, ‘আগেও বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ে জামায়াত নিষিদ্ধের জোরালো দাবি উঠেছিল। গণদাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তাদের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাই। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান নিষিদ্ধ জামায়াতের রাজনীতির বৈধতা দেন। জামায়াতের সঙ্গে তাদের গাঁটছড়া বাঁধা। তাই বিএনপির পক্ষে দলটিকে পরিত্যাগ করা অসম্ভব। এ কারণে জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধে দেশের মানুষ সাধুবাদ জানালেও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ সিদ্ধান্তকে অগণতান্ত্রিক ও অসাংবিধানিক বলেছেন। এটাই স্বাভাবিক।’
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জামায়াত-শিবির যে কারণে নিষিদ্ধ হয়েছে, সেই সন্ত্রাসের কারণের সঙ্গে কারও কর্মকা-ের যদি মিল থাকে বা তারা যদি সন্ত্রাসী চেতনাকে লালন ও বহন করে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও আমাদের মনোভাব ও আচরণ একই হবে। সন্ত্রাস ও সন্ত্রাসী সংগঠনকে সন্ত্রাসী হিসেবেই দেখব, তারা যে-ই হোক।’
মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি কোটার বিষয়ে আদালতে যাবেন কি না এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কাদের বলেন, ‘আমি ঠিক জানি না তিনি (মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী) কী বলেছেন। যদি বলে থাকেন, তাহলে এটা তার ব্যক্তিগত অভিমত, এটা আমাদের সরকার বা দলের সিদ্ধান্ত নয়।’
ড. ইউনূসকে সরকারপ্রধান করে একটি মন্ত্রিসভার কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে। বিষয়টি আওয়ামী লীগ কীভাবে দেখছে? জবাবে কাদের বলেন, ‘পাগলের প্রলাপ।’
শিক্ষার্থীদের নয় দফায় আপনার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগসহ বিভিন্ন বিষয় আছে। এসব দাবি নিয়ে কী ভাবছেন? জবাবে কাদের বিচার বিভাগীয় তদন্তের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘এখন কে অপরাধী আর কে অপরাধী নয়, সেটা তদন্ত কমিশনের কার্যপরিধির আওতায় পড়ে। বিষয়টির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত সেখানেই হবে। প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে আমরা বদ্ধপরিকর।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক, মির্জা আজম, সুজিত রায় নন্দী, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, কার্যনির্বাহী সদস্য তারানা হালিম, আনোয়ার হোসেন প্রমুখ।