টানা ২৮ মাস দেশের গড় মজুরির চেয়ে মূল্যস্ফীতি বেশি। অর্থনীতির পরিভাষায় মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি কম হলে সেটি অর্থনীতির সংকটকে ইঙ্গিত করে। দুই বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে দেশের পরিবারগুলোর আয় কমে গেছে। এতে সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে মানুষ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী দেশের শিক্ষাব্যয়ও বাড়ছে প্রতি মাসে। এর প্রভাব পড়েছে স্কুলশিক্ষার্থীদের সঞ্চয়েও।
গেল ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুলাই থেকে থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা আট মাস পতনের দিকে ছিল শিক্ষার্থীদের আমানত। মাঝখানে মার্চ ও এপ্রিলে তা কিছুটা বাড়তে থাকে। কিন্তু মে মাসে এসে আবারও কমছে স্কুলশিক্ষার্থীদের সঞ্চয়। এক বছরের ব্যবধানে আমানত কমেছে প্রায় ১০১ কোটি টাকা। তবে এ সময় হিসাবসংখ্যা বেড়েছে ৪ লাখ ১৮ হাজার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে কয়েক বছর ধরে তারল্যসংকট চলছে। ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক খাতে ব্যাপক অনিয়মের কারণে আস্থা কমেছে গ্রাহকদের। এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবে।
তা ছাড়া উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা ব্যাংকের সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার খরচ বহন করাই অনেক অভিভাবকের জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, চলতি বছরের মে মাসে স্কুলশিক্ষার্থীদের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১২৭ কোটি ৮২ লাখ টাকা, যা গত এপ্রিলে ছিল ২ হাজার ১৪৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। এক মাসে আমানত কমেছে ২২ কোটি ৬ লাখ টাকা। এর আগের বছর ২০২৩ সালের মে শেষে আমানতের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে কমেছে প্রায় ১০১ কোটি টাকা।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এপ্রিলে শহরের শিক্ষার্থীদের ব্যাংক আমানত ছিল ১ হাজার ৫৫৬ কোটি ১৮ লাখ টাকা। আর পরের মে মাসে শহরের শিক্ষার্থীদের ব্যাংক আমানত দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৩৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এক মাসে শহরের শিক্ষার্থীদের ব্যাংক আমানত কমেছে ২০ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এ ছাড়া গত এপ্রিলে গ্রামের শিক্ষার্থীদের ব্যাংক আমানত ছিল ৫৯৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। আর পরের মে মাসে আমানত দাঁড়িয়েছে ৫৯১ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এক মাসে গ্রামের শিক্ষার্থীদের ব্যাংক আমানত কমেছে ১ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
চলতি অর্থবছরের জুলাইয়ে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক আমানতের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা, যা আগস্টে এসে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৮৫ কোটি, সেপ্টেম্বরে ২ হাজার ২৩২ কোটি, অক্টোবরে ২ হাজার ২০২ কোটি, নভেম্বরে ২ হাজার ১৯৯ কোটি ও ডিসেম্বরে ২ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে আমানতের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ হাজার ১৩৬ কোটি, ফেব্রুয়ারিতে ২ হাজার ১০৯ কোটি এবং মার্চে বেড়ে হয় ২ হাজার ১২৮ কোটি।
তথ্য বলছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ব্যাংকে শিক্ষার্থীদের হিসাবসংখ্যা ছিল ৩৮ লাখ ৯৩ হাজার ৩৪৩টি। আগস্টে এ ধরনের হিসাব খোলা হয় ৩৯ লাখ ৮ হাজার ৮২০টি। এরপর সেপ্টেম্বরে এসে স্কুল ব্যাংকিংয়ের হিসাবের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৯ লাখ ৩৮ হাজার ২১০টি। পরের মাস অক্টোবরে হিসাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৯ লাখ ৫৮ হাজার ৪৯৪টি। নভেম্বর মাসে হিসাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০ লাখ ১৭ হাজার ৯০৭টি এবং সবশেষ ডিসেম্বর মাস হিসাব আরও বেড়ে ৪০ লাখ ৫৫ হাজার ২৩৯টিতে দাঁড়ায়, জানুয়ারিতে ৪০ লাখ ৭৪ হাজার ১৫টি ও ফেব্রয়ারি মাসে দাঁড়ায় ৪১ লাখ ২৯ হাজার ৬৮৮টি।
আমানতের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের মে মাসে স্কুল ব্যাংকিংয়ের মোট হিসাবের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪২ লাখ ৭৪ হাজার ৫৭২টি। এর আগের মাসে হিসাবের পরিমাণ ছিল ৪২ লাখ ৩৩ হাজার ২৩১টি। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৪১ হাজার ৩৪১টি। এসব হিসাবের মধ্যে ১৯ লাখ ১২ হাজার ২৩৮টি হিসাব শহরাঞ্চলে এবং ২৩ লাখ ৬২ হাজার ৩৩৪টি হিসাব গ্রামাঞ্চলে খোলা হয়েছে। এর মধ্যে ছেলেদের অ্যাকাউন্ট ২২ লাখ ১ হাজার ৪৭৩টি এবং মেয়েদের অ্যাকাউন্ট ২০ লাখ ৭৩ হাজার ৯৯টি।
শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহী করতে ২০১০ সালে স্কুল ব্যাংকিং কর্মসূচির পুনঃপ্রবর্তন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বেশ সফলতা পায় আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তবে করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব ও আমানতের পরিমাণ কিছুটা কমে আসছে। এরপর থেকেই স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আকর্ষণীয় মুনাফার নানা স্কিম চালু করে। ২০১০ সালে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হলেও শিক্ষার্থীরা টাকা জমা রাখার সুযোগ পায় ২০১১ সাল থেকে। প্রথম বছরে ২৯ হাজার ৮০টি স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয়। এর পরের বছর ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় ব্যাংকগুলোয় ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৩৭টি হিসাব খোলা হয়।