প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে সহিংসতা ঠেকাতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের তার সরকারি বাসভবন গণভবনে তার সঙ্গে বসার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল শনিবার তিনি বলেন, ‘গণভবনের দরজা খোলা। কোটা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আমি বসতে চাই, তাদের কথা শুনতে চাই। আমি সংঘাত চাই না।’ একই সঙ্গে তিনি আন্দোলনের সময় প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচারের আশ্বাস ও আটক সাধারণ শিক্ষার্থীদের মুক্তি দিতে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের প্রতি নির্দেশ দেন।
তবে প্রধানমন্ত্রীর আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্ল্যাটফর্ম ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের’ সমন্বয়করা। তারা বলছেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার আর কোনো সুযোগ নেই। ‘এক দফা’ এখন তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল সকালে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এতে সরকারপ্রধান বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি আবারও বলছি, আন্দোলনকারীরা চাইলে আমি এখনো আলোচনায় রাজি। তারা যেকোনো সময় (গণভবনে) আসতে পারে। দরকার হলে তারা তাদের অভিভাবকদের নিয়েও আসতে পারে।’ এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রস্তাবিত সর্বজনীন পেনশন স্কিম ‘প্রত্যয়’ বাতিল করার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সর্বজনীন পেনশন স্কিম ২০০৮ সালে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিল। এরপর বহু সময় অনেক চিন্তাভাবনা করে এই সর্বজনীন পেনশন স্কিমটা আমরা চালু করেছি এবং সেখানে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের সুবিধা আমরা দিয়েছি।’ কারও দাবির অপেক্ষা না করে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কারণ আমি চাই, যারা এর সঙ্গে জড়িত, সে পুলিশই হোক বা অন্য যে কেউই হোক যারা অস্ত্রধারী ও জ্বালাও-পোড়াওসহ এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়েছে, তাদের সেসব ঘটনার তদন্ত ও বিচার হোক। শুধু ঢাকা নয়, যেসব জায়গায় এ ধরনের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ হয়েছে, সেগুলোর তদন্ত করে যথাযথ বিচার হবে।’
শেখ হাসিনা বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটিতে আরও দুজন বিচারক নিয়োগ দিয়ে তাদের কর্মপরিধি ও সময়ও বাড়িয়ে দেওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘যাতে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আমি চাই এ ধরনের অন্যায় বা হত্যাকাণ্ড যারাই ঘটাক, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের অবশ্যই বিচার করা হবে।’
প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলছি, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত সে যেই হোক অবশ্যই তার বিচার করা হবে এবং কারা জড়িত, তদন্ত করেই তা বের করা হবে।’
তিনি উদাহরণ দেন, রংপুরে একটা ঘটনা ঘটেছে (সাঈদ নামের শিক্ষার্থীর মৃত্যু)। যে পুলিশ সদস্য দায়ী তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে তদন্ত হচ্ছে। এ ঘটনার বিচার হবেই।
সরকারপ্রধান বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে যারা ছাত্র বা পরীক্ষার্থী ছিল তাদের সবাইকে জামিন দেওয়া হয়েছে। আর সঙ্গে সঙ্গে যে ছাত্ররা নিরীহ, যারা খুন ও ধ্বংসাত্মক কাজে জড়িত নয়, আমি তাদের মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছি এবং ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। চিহ্নিত দোষী ছাড়া বাকিদের আমরা মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী আবারও আলোচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমার সঙ্গে যদি তারা বসতে চায়, তাহলে আমি বসতে রাজি। তারা যদি এখনো আসতে চায়, কথা বলতে চায় আমি তাদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি। তাদের আর কী কী দাবি বাকি আছে আমি সেটাও শুনতে চাই এবং যেটা আমার সাধ্যের মধ্যে আছে সেটা আমি পূরণ করতে চাই।’
শেখ হাসিনা আরও বলেন, ‘তাদের দাবি-দাওয়া আমরা মেনে নিয়েছি (কোটার দাবি পূরণ)। এখন আরও কিছু দাবি আছে কি না সেটা আমি শুনতে চাচ্ছি এবং আপনাদের সামনে আমি বলতে চাচ্ছি, দেশবাসীরও জানা উচিত যে, আমি কখনোই আমার দরজা বন্ধ করিনি। গণভবনের দরজা খোলা। যখনই এই আন্দোলনকারীরা কথা বলতে চায়, আলোচনা করে সমাধান করতে চায়, আমি তাদের সঙ্গে নিজেই বসতে রাজি।’
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি মো. শফিকুর রহমান এমপি, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ।
পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের সভাপতি অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান ও পেশাজীবী সমন্বয় পরিষদের নেতাদের মধ্যে অধ্যাপক ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ূন, অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূঁইয়া, ইঞ্জিনিয়ার মো. আবদুস সবুর এমপি, ড. জামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী, অধ্যাপক ড. ইঞ্জিনিয়ার মো. হাবিবুর রহমান চৌধুরী, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন সভাপতি সোহেল হায়দার চৌধুরী, অধ্যক্ষ একেএম ফজলুল হক, ইঞ্জিনিয়ার এসএম খাবিরুজ্জামান, অ্যাডভোকেট আবদুর রহমান হাওলাদার, ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহাদাৎ হোসেন (শীবলু), অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা, অ্যাডভোকেট শাহ মঞ্জুরুল হক, ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী, খায়রুল আলম প্রিন্স, এসএম মঞ্জুরুল হক ও মো. অহিদুল ইসলাম অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন।
আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আলোচনায় বসার প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা। এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘খুনি সরকারের কাছে বিচার চাওয়া বা সংলাপে বসারও সুযোগ আর নেই। ক্ষমা চাওয়ার সময়ও পার হয়ে গেছে। যখন সময় ছিল তখন সরকার ব্লক রেইড দিয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করেছে, নির্যাতন করেছে। আমরা কোনো ধরনের সমঝোতায় যাব না।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা যখন ডিবি অফিসে ছিলাম, তখন আমাদের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। আমাদের অনশন ও রাজপথে আন্দোলনের কারণে সে পরিকল্পনা সফল হয়নি।’
পরে বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সমাবেশে নাহিদ বলেন, ‘শেখ হাসিনা বলেছেন গণভবনের দরজা খোলা আছে। আমরা সাধুবাদ জানাই, তিনি আগে বুঝতে পেরেছেন গণভবনের দরজা খোলা রাখতে হবে। কারণ তার যাওয়ার সময় হয়েছে। আপনি দরজা খুলে অপেক্ষা করুন, আমরা আপনাকে উৎখাত করার জন্য আসব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখনো শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের আন্দোলন অব্যাহত রাখতে চাই। আমরা কোনো সহিংসতা, প্রতিহিংসা ও প্রাণনাশ চাই না। নিরাপত্তা বাহিনীকেও এর জন্য সহযোগিতা করতে হবে। আওয়ামী “সন্ত্রাসীদের” রাজপথে দেখা গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে এর দায়ভার নিতে হবে।’
আরেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা যখন ডিবি অফিসে বন্দি ছিলাম, তখনই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে আন্দোলন স্থগিত করতে বলা হয়। এমনকি জোর করে গণভবনে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও চলছিল। এই প্রস্তাবের প্রতিবাদে ও মুক্তির দাবিতে আমরা অনশনে বসেছিলাম। আপসহীনতার মূল্য যদি মৃত্যুও হয়, তাও পরিশোধ করতে প্রস্তুত আছি। ছাত্র-নাগরিক অভ্যুত্থানে বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের অংশগ্রহণ আহ্বান করছি।’
ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে আরেক সমন্বয়ক আবু বাকের মজুমদার বলেন, ‘খুনি সরকারের কাছে বিচার চাওয়া বা সংলাপে বসার সুযোগ আর নেই। ক্ষমা চাওয়ার সময়ও পার হয়ে গেছে। যখন সময় ছিল, তখন সরকার ব্লক রেড দিয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করেছে, নির্যাতন করেছে। আখতার হোসেন, আরিফ সোহেলসহ রাজবন্দিদের কারাগারে রেখে আমরা কোনো ধরনের সমঝোতায় যাব না।’
অন্য সমন্বয়ক সারজিস আলম ফেসবুকে দেওয়া পোস্টে বলেন, ‘ছাত্র-জনতার দফাই আমাদের দফা।’ সমন্বয়কদের অন্যতম হাসনাত আবদুল্লাহ ফেসবুক পোস্টে বলেন, ‘ছাত্র-জনতার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। এক দফা এখন সর্বজনীন। এর বাইরে আর কোনো আলাপ নেই।’