দীর্ঘ সাড়ে ছয় বছর পর মুক্তি পেলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। গতকাল মঙ্গলবার বঙ্গভবনের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বৈঠকে সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
এদিকে মুক্তি পাওয়ার পর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপারসন দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। তার চিকিৎসায় হাসপাতাল গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিতে উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। আজ বুধবার ভিসার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে শিগগিরই তাকে বিদেশে নেওয়া হবে।
গতকাল রাষ্ট্রপতির উপ প্রেস সচিব স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার পর নেওয়া সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ও বিভিন্ন মামলায় আটক ব্যক্তিদের মুক্তি দেওয়া শুরু হয়েছে এবং ইতিমধ্যে অনেকে মুক্তি পেয়েছেন।
এর আগে গত সোমবার শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ার পর রাতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে তিন বাহিনীর প্রধান, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বৈঠকে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
৭৮ বছর বয়সী খালেদা জিয়া হার্টের সমস্যা, লিভারসিরোসিস ছাড়াও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। বহু বছর ধরে আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, দাঁত এবং চোখের সমস্যাসহ নানা জটিলতা রয়েছে তার। সাম্প্রতিক সময়ে খালেদা জিয়াকে বেশ কয়েকবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চলতি বছরের জুন মাসে খালেদা জিয়ার হার্টে পেস মেকার স্থাপন করা হয়। সর্বশেষ গত ৮ জুলাই খালেদা জিয়া রাত ৩টার দিকে তার গুলশানের বাসভবন ফিরোজায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সর্বশেষ শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান ও খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালেদা জিয়া চিকিৎসকদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।’ উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ম্যাডামের (খালেদা জিয়ার) পরিবার ও দল এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ নেবেন।’
খালেদা জিয়ার মুক্তির পর স্বস্তি প্রকাশ করে তার মেজো বোন বেগম সেলিমা ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তির সিদ্ধান্ত হওয়ার পর গত সোমবার রাতে তার সঙ্গে কথা বলেছি। অসুস্থতার কারণে বেশি কথা বলতে পারেননি। তবে তিনি খুশি হয়েছেন এবং দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।’
মুক্তি তো পেলেন এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার বিষয়ে কী উদ্যোগ নেবেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবেন। ইতিমধ্যে তাকে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সে মোতাবেক তিনি ব্যবস্থা করবেন। তবে কীভাবে তাকে বিদেশে নেওয়া যাবে, সে বিষয়ে চিকিৎসকরা তাকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও নির্দেশনা দেবেন। চিকিৎসকদের নির্দেশনা মোতাবেক পরিবারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
সেলিমা ইসলাম বলেন, ‘আপনারা জানেন ইতিপূর্বে পরিবারের পক্ষ থেকে বেশ কয়েকবার উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশ নিতে সরকারের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু সরকার সেই আবেদন নাকচ করে দিয়েছে।’
২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার ৫ বছরের সাজা হয়। ওই দিনই তাকে পুরান ঢাকার পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। পরে জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তার সাজা হয়। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে আরও ৩৪টি মামলা রয়েছে। ২৫ মাসের বেশি সময় কারাগারে থাকার পর ২০২০ সালের ২৫ মার্চ করোনা মহামারীর সময় মানবিক বিবেচনায় সরকারের নির্বাহী আদেশে দুই শর্তে খালেদা জিয়ার সাজা ৬ মাস স্থগিত করে মুক্তি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়েছিল, রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচিতে অংশ নিতে পারবেন না এবং দেশেই চিকিৎসা নিতে হবে।