ধ্বংস নয় শান্তির সমাজ চায় বিএনপি

ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে প্রথম সমাবেশ করল বিএনপি। সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে আয়োজন করা এ সমাবেশ থেকে দলটি কোনো ধরনের ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড থেকে বিরত থাকার পাশাপাশি শান্তির সমাজ বিনির্মাণে তরুণদের হাত শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছে। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন দিয়ে জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়েছে।

ছয় বছর পর ভার্চুয়ালি হাজির হয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছেন, ‘প্রতিশোধ-প্রতিহিংসা নয়, শান্তিপূর্ণ দেশ গড়তে হবে। শান্তি, প্রগতি আর অসীম সাম্যের ভিত্তিতে আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণে আসুন আমরা তরুণদের হাত শক্তিশালী করি।’

গতকাল বুধবার নয়াপল্টনে জনসমুদ্রে পরিণত হওয়া এ সমাবেশে খালেদা জিয়া এসব কথা বলেন। এ সমাবেশে ভার্চুয়ালি বক্তব্য রাখেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও।

খালেদা জিয়া বলেন, ‘দীর্ঘ আন্দোলন, সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী, অবৈধ সরকারের কাছ থেকে মুক্তি পেয়েছি। আমি আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই আমাদের বীর সন্তানদের, যারা মরণপণ সংগ্রাম করে এ অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। সঙ্গে সঙ্গে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।’

তিনি বলেন, ‘নজিরবিহীন দুর্নীতি, গণতন্ত্রের ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে আমাদের নির্মাণ করতে হবে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। ছাত্র, তরুণরাই আমাদের ভবিষ্যৎ। তরুণদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে মেধা, জ্ঞানভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে। শোষণহীনসমৃদ্ধ বাংলাদেশে সব ধর্মের, গোত্রের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

সমাবেশে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বক্তব্য রাখেন। তার আগেই নেতাকর্মীরা জেনে গিয়েছিলেন খালেদা জিয়া বক্তব্য রাখবেন। তারেক রহমানের বক্তব্যের পরপরই হাসপাতালে থাকা খালেদা জিয়ার ছবি মঞ্চের জায়ান্ট স্ক্রিনে ভেসে উঠলে উল্লাসে ফেটে পড়েন বিএনপি নেতাকর্মীরা।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রাষ্ট্রপতি দণ্ড মওকুফের সিদ্ধান্ত জানালে গত মঙ্গলবার পুরোপুরি মুক্ত হন সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী। অসুস্থতার কারণে কিছুদিন ধরেই তিনি হাসপাতালে রয়েছেন। সেখান থেকেই গতকাল সমাবেশে ভিডিও কলে বক্তব্য রাখেন।

সাবেক এ প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি কারাগারে যাওয়ার পর এই প্রথম নেতাকর্মীরা তার ভাষণ শুনেছেন। ২০২০ সালে সরকারের নির্বাহী আদেশে সাময়িক মুক্তি মিললেও সরকারের শর্তের কারণে তাকে গুলশানের বাড়িতে একপ্রকার বন্দিজীবনে থাকতে হয়েছে। এ সময় দলের কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাকে দেখা যায়নি। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিএনপির নির্বাহী কমিটি সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছিলেন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, ‘দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপিসহ দেশের গণতন্ত্রকামী সব দলের নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান, ষড়যন্ত্রকারীদের নৈরাজ্যের কাছে আমরা হার মানতে পারি না। গির্জা, মন্দির, প্যাগোডার নিরাপত্তা দিন। ধর্ম-বর্ণ-বিশ্বাস দিয়ে মানুষকে মাপা যাবে না। একজন ব্যক্তির পরিচয় তিনি মানুষ। আপনার পাড়া-প্রতিবেশী যেখানেই কেউ এমন কিছু করার চেষ্টা করবে, বন্ধু হিসেবে তার নিরাপত্তায় আপনি ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করুন।’

তারেক রহমান বলেন, ছাত্র-জনতার এই রক্তঝরা বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। তাই বিপ্লবের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।’

লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি দেওয়া বক্তব্যে তারেক রহমান বলেন, ‘বিএনপির নামে কেউ কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর আঘাত করলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিন। আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বসবাসকারী সবার একটিই পরিচয় আমরা বাংলাদেশি।’

বিগত সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় লন্ডনে চলে যাওয়ার পর তারেক রহমান আর দেশে ফেরেননি। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তাকে দ্রুত দেশে ফেরার অনুরোধ জানিয়েছেন বলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন।

শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘বায়ান্ন-একাত্তর কিংবা নব্বইয়ের মতো দেশের ছাত্রসমাজ বিজয়ের অমর একটি ইতিহাস রচনা করেছে। ছাত্র-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয়েছে নতুন বিজয়। এজন্য গণতন্ত্রকামী সব পক্ষ ও দল-মত নির্বিশেষে দেশের সবাইকে ধন্যবাদ জানাই। শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে হাজারো শহীদের রক্ত রঞ্জিত বিপ্লবের প্রথম ধাপ সফল হয়েছে মাত্র। ছাত্র-জনতার এই রক্তঝরা বিপ্লবের চূড়ান্ত লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ। তাই বিপ্লবের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দ্রুততম সময়ের মধ্যে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।’

পুলিশকে দায়িত্ব পালনে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুলিশ জনগণের শত্রু নয়। গণহত্যাকারী হাসিনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের শত্রু হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। অধিকাংশ পুলিশ কর্মকর্তা চাকরিবিধি মেনেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেন। পুলিশ কিংবা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে হামলা বন্ধ করুন। কেউ বিএনপির নাম ব্যবহার তাকে আইনের হাতে তুলে দিন। দেশবাসীর কাছে আহ্বান, কেউ নিজের হাতে আইন তুলে নেবেন না।’

নৈরাজ্য কোনো সমাধান না, এমন মন্তব্য করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। দেশকে আমদানিনির্ভর কিংবা বৈদেশিক ঋণনির্ভরতা থেকে বের করতে হবে। রপ্তানির আওতা যেকোনো মূল্যে বাড়াতে হবে। দক্ষ ও মেধাবী প্রজন্ম তৈরি করতে হবে।’ মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

কার্যালয়ের সামনের হাজার হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বিএনপির মহাসমাবেশ শুরু হয় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে। সমাবেশের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়।

এর আগে সভাপতির বক্তব্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, ‘আমাদের ছাত্ররা অত্যন্ত ম্যাচুরিটির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন জানাব, কোনো বিলম্ব না করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করুন। এই সরকারে যারা থাকবেন, তারা তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করবেন। সেই ব্যবস্থা তারা করবেন এবং এর জন্য পূর্ণ সহযোগিতা আমরা দেব।’

দেশের বিভিন্ন জায়গায় যেসব হামলা বা ভাঙচুর হচ্ছে তারা বিএনপির লোক নয় দাবি করে দলটির মহাসচিব বলেন, ‘যে বিজয় অর্জিত হয়েছে, এটাকে রক্ষা করতে সবাই সচেতন থাকবেন। চক্রান্তকারীরা নতুন করে চক্রান্ত করতে পারে। তারা বিজয়কে বিলিয়ে দিতে পারে চক্রান্তের মধ্য দিয়ে। সেই সুযোগ যেন আমরা তাদের না দিই। যারা আজকে বিভিন্ন এলাকায়, বিভিন্ন শহরে, বন্দরে ভাঙচুর, লুটপাট করছে তারা কেউ আমাদের দলের লোক নয়। তারা ছাত্রদের কেউ না। তারা দুর্বৃত্ত, দুষ্কৃতকারী। এটা তাদেরই লোক, যারা এ দেশে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করতে চায়।’

মহাসমাবেশে বক্তব্য দেন দলের নেতা সদ্য কারামুক্ত স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমানসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতারা।