সরব বাড়িটিতে এখন শুধুই নীরবতা

হবিগঞ্জ সদর আসনের সাবেক এমপি ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবু জাহিরের ছয়তলার বাড়িটি এখন ফাঁকা পড়ে আছে। অথচ সপ্তাহখানেক আগেও এই বাড়িতে হাজারো মানুষের পদচারণে মুখরিত ছিল। এখান থেকে আসত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই এ বাড়িতে ব্যাপক ভাঙচুর চলানো হয়। লুটপাট করে নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ির সব আসবাব।   

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, ‘রাজকীয় ভবনটি’ এখন জীর্ণশীর্ণ হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। গত কয়েক দিনের বাধাহীন লুটপাট থেকে রক্ষা পায়নি দরজা-জানালা, ফ্রিজে থাকা মাছ-মাংস, দামি আসবাব এবং মেঝে মোছার সামগ্রী ও ছাদবাগানের গাছপালা।

১৫ বছর নেতাকর্মীদের আনাগোনায় রাত-দিন জমজমাট ছিল শহরের টাউন হল রোডের ছয়তলা বাড়িটি। এখন ভুলেও কেউ সেদিকে পা মাড়াচ্ছে না। নিরাপত্তার অভাবে শহরে মানুষদের পদচারণা নেই বললেই চলে।

অভিযোগ উঠেছে, ছয় কোটি টাকায় নির্মিত প্রাসাদসম এই বাড়ি ও এর আশপাশ থেকে ৪ ও ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ওপর ইটপাটকেল ও গুলি করা হয়েছে। গুলিতে নিহত হয়েছেন মোস্তাক মিয়া ও রিপন শীল নামে দুই যুবক। এর জের ধরেই বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা চড়াও হয় সাবেক এমপি জাহিরের বাড়িতে। এ সময় আবু জাহিরের বাড়িসহ সাবেক এমপি আব্দুল মজিদ খানসহ একাধিক বাড়ি ও দোকানপাট ভাঙচুর করার পাশাপাশি আগুন দেওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী আবিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ছাত্র-জনতা এতই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল যে ৪ আগস্ট গভীর রাত পর্যন্ত বাসায় অবরুদ্ধ ছিলেন আবু জাহির। সেনাবাহিনীর সহযোগিতা না পেলে হয়তো প্রাণ নিয়ে বের হতে পারতেন না তিনি। ছাত্র-জনতাদের কিছুটা শান্ত করার পর তাদের দাবির মুখে বোরকা পরিয়ে এমপি জাহিরসহ আরও কয়েকজনকে একটি গাড়িতে করে তুলে নিয়ে যান সেনাবাহিনীর সদস্যরা। এরপরও লাখাই উপজেলা চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মুশফিউল আলম আজাদ গণপিটুনি থেকে রক্ষা পাননি। তিনি বর্তমানে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

আবু জাহিরের বাড়িতে গিয়ে আরও দেখা যায়, তার সাদা রঙের বহুতল বাড়ি থেকে কিছু লোক এসি, টিভি, চেয়ার, টেবিল, খাট, পোশাক-শাড়িসহ জিনিসপত্র মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছেন। জাহিরের বাসা থেকে একটি বিশাল টিভি মাথায় করে নিয়ে যাচ্ছিলেন জনৈক যুবক। তিনি বলেন, ‘জাহির মিয়া বড়লোকের পোলা আছিল না। গরিব মানুষদের ঠকিয়ে সম্পদ বানাইছে। তাই এসবের ওপর আমরার হক আছে।’ 

হবিগঞ্জ শহরতলির রিচি গ্রামের সন্তান আবু জাহির ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তারপর যোগ দেন ছাত্রলীগে। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের নেতা বনে যান। সাধারণ কৃষকের সন্তান আবু জাহিরের একসময় নিজস্ব বাড়িঘর ছিল না। ২০০৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তার জীবনের চাকা ঘুরে যায়। রাতারাতি বনে যান হবিগঞ্জের মুকুটহীন সম্রাট। গত ১৫ বছরে অবৈধভাবে উপার্জন করেছেন কোটি কোটি টাকা। দলের সব কর্মকা- চালাতেন নিজের আত্মীয়-স্বজনদের মাধ্যমে। তার প্রভাব শুধু দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, দলীয় সভাপতি হিসেবে হবিগঞ্জের প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপরও ছড়ি ঘোরাতেন তিনি। নিরাপত্তার জন্য ডিবির সদস্যকে বডিগার্ড হিসেবে ব্যবহার করতেন। পুলিশ স্কট ছাড়া তিনি বাসা থেকে বের হতেন না। শোনা যাচ্ছে, তিনি ও তার স্বজনরা এখন আত্মগোপনে রয়েছেন।