মেজর জেনারেল মো. মঈন খান বলেছেন, এই মুহূর্তে সেনাবাহিনীর অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে অর্থনীতির মেরুদন্ড হিসেবে শিল্প যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তা নিশ্চিত করা। গতকাল রবিবার শিল্প-কারখানার নিরাপত্তা জোরদারে বিজিএমইএ দপ্তরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জিওসি নবম পদাতিক ডিভিশনের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের বৈঠকে তিনি এ মন্তব্য করেন।
চলমান পরিস্থিতিতে পোশাকশিল্পসহ বাংলাদেশের সব শিল্প-কারখানা স্বাভাবিক নিয়মে চালু রাখতে শিল্প উদ্যোক্তারা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা, সেগুলো সমাধানের বিষয়ে বিজিএমইএর উদ্যোগে গতকাল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জিওসি নবম পদাতিক ডিভিশন (জিওসি নাইন ইনফেন্ট্রি ডিভিশন) এবং এরিয়া কমান্ডার, সাভার এরিয়া বিজিএমইএ, এফবিসিসিআই, বিটিএমএ, বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নেতা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক বৈঠকে বসেন।
এই বৈঠকে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম। নবম পদাতিক বিভাগের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দেন জিওসি মেজর জেনারেল মো. মঈন খান।
বৈঠকে মেজর জেনারেল মো. মঈন খান বলেন, এই মুহূর্তে সেনাবাহিনীর অন্যতম অগ্রাধিকার হচ্ছে অর্থনীতির মেরুদন্ড হিসেবে শিল্প যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তা নিশ্চিত করা। তিনি বলেন, শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় টাস্কফোর্স গঠনের মাধ্যমে শিল্প-কারখানাগুলোয় কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক গঠিত টাস্কফোর্স ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। ‘কুইক রিঅ্যাকশন ফোর্সের’ মাধ্যমে দ্রুত ঘটনাস্থলে টিম পৌঁছে যাচ্ছে এবং চাহিদা অনুযায়ী সহযোগিতা প্রদান করছে । যার কারণে শিল্পাঞ্চল সাভার ও আশুলিয়ায় অভিযোগের সংখ্যা প্রথম দিনের তুলনায় দ্বিতীয় দিনে কমে গেছে।
ঝুট ব্যবসার একক নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে যেসব সন্ত্রাসী মাঠে তৎপর রয়েছে, তাদের বৃত্তান্ত দেওয়ার জন্য মো. মঈন খান বিজিএমইএ নেতাদের অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, আর একটি কারখানাও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা শিল্প-পুলিশ দেখবে। চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য লোডিং ও আনলোডিং আরও দ্রুততর করার জন্য তিনি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান। ঢাকা বিমানবন্দরে আনলোডিং পরিষেবা দ্রুততর করার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলবেন বলে ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করেন।
মেজর জেনারেল মঈন খান ব্যবসায়ীদের আশ্বস্ত করে বলেন, কারখানার বাইরে থেকে যেকোনো অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা, যা কি না কারখানার জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে, এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী শিল্পের পাশেই রয়েছে।
বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, জাতীয় জীবনের সাম্প্রতিক সংকটময় সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ধৈর্য ও বিচক্ষণতা সহকারে যেভাবে জনগণের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, যেভাবে দেশের পুনর্গঠন ও অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে লিপ্ত হয়েছে, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আজকের মধ্যে গাজীপুর এলাকার ৯৯ দশমিক ৮৯ শতাংশ কারখানা, সাভার-আশুলিয়া এবং ধামরাই এলাকায় ৯৯ দশমিক ৫১ শতাংশ কারখানা, নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ১০০ শতাংশ কারখানা, ডিএমপি এলাকায় শতভাগ কারখানা, চট্টগ্রাম এলাকায় শতভাগ পোশাক কারখানা খুলে গেছে।
বৈঠকে দেশের শিল্প-কারখানাগুলোর বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনায় বলা হয়, পোশাকশিল্প অধ্যুষিত শিল্পাঞ্চলগুলোয় গার্মেন্টসের ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিনিয়ত ঘটে আসছে সন্ত্রাসের ঘটনা। ঝুট সেক্টরে আধিপত্য বিস্তার করতে শিল্পাঞ্চলগুলোয় গড়ে উঠেছে একাধিক সন্ত্রাসী দল, যারা ওইসব এলাকায় কিশোর গ্যাং তৈরি করে এলাকার পরিবেশ অশান্ত রাখছে, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছে। পোশাকশিল্প এদের হাতে জিম্মি। শিল্পকে এদের হাত থেকে মুক্ত করার জন্য পোশাক ব্যবসায়ীরা সেনাবাহিনীর সহযোগিতা চান।
বৈঠকে ব্যবসায়ীরা সড়ক ও মহাসড়কগুলোয় রপ্তানিসহ সব শিল্পের পণ্যবাহী যানবাহনের নিরাপত্তা দেওয়ার জন্যও অনুরোধ জানান। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ থেকে পণ্য লোডিং ও আনলোডিংয়ে অহেতুক সময়ক্ষেপণ করা হয়, যার মাশুল দিতে হয় ব্যবসায়ীদের, এতে করে শিল্পের প্রতিযোগী সক্ষমতাও কমছে। একইভাবে ঢাকা বিমানবন্দরেও পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা ঘটে। ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য লোডিং ও আনলোডিং দ্রুততর করা এবং ঢাকা শাহজালাল বিমানবন্দরে পণ্য খালাস দ্রুততর করার ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক বিভাগকে অনুরোধ জানান।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বিজিএমইএর প্রথম সহসভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সহসভাপতি (অর্থ) মো. নাসির উদ্দিনসহ অন্য পরিচালকরা। এ ছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআই সভাপতি মাহবুবুল আলম, ফরেন ইনভেস্টর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ফিকি) সভাপতি জাভেদ আখতার, বিটিএমএ সভাপতি (ইনচার্জ) মো. ফজলুল হক, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন, বিভিন্ন বাণিজ্য সংগঠনের প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন ব্যবসা সংগঠনের নেতারা।
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি মো. মাহাবুবুর রহমান, সেনাবাহিনীর টাস্কফোর্স কমান্ডার কর্নেল আবু মোহাম্মদ মহিউদ্দিন এবং বিজিবি ও র্যাব প্রতিনিধিরাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।