পুলিশের যেসব সদস্য এখনো কাজে যোগ দেননি, তাদের জন্য শেষ সময় হচ্ছে আগামী বৃহস্পতিবার, ১৫ আগস্ট। এর মধ্যে যদি কেউ যোগ না দেন, তাহলে ধরে নেওয়া হবে তারা চাকরিতে ইচ্ছুক নন। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন এমন কঠোর বার্তা দিয়েছেন। গতকাল রবিবার সচিবালয়ে প্রথম কর্মদিবসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি সরকারের এমন কঠোর অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ‘যারা কাজে যোগ দেবেন না তাদের চাকরিচ্যুত করা হবে।’
এদিকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন ১১ দফা দাবিতে আন্দোলনরত পুলিশ সদস্যরা। ওই বৈঠকে পুলিশের ইউনিফর্ম ও লোগোয় পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। গতকাল বিকেলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টার সঙ্গে আন্দোলনরত পুলিশ সদস্যদের প্রতিনিধিদলের বৈঠক হয়।
বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সিনিয়র সচিব মশিউর রহমান, জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব মো. জাহাঙ্গীর হোসেন, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. ময়নুল ইসলাম, বিজিবির মহাপরিচালক, পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে পুলিশের ১১ দাবির কয়েকটি অল্প সময়ের মধ্যে পূরণের আশ্বাস দেওয়া হয়। অন্য দাবিগুলো পূরণ করা হবে দীর্ঘমেয়াদে। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এখন থেকে পুলিশ সদস্যদের ওপর কোনো ধরনের হামলা চালানো যাবে না। পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানাতে হবে। পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বসার আগে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করেন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেন।
পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এম সাখাওয়াত হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠক করেছি। ছাত্ররা আমাকে বলেছে, পুলিশের সঙ্গে তাদের কোনো বিরোধ নেই। পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করবে।’
পুলিশ সদস্যদের জন্য স্বাধীন কমিশন গড়ে তোলার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন জানিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘পুলিশ কমিশন হওয়া উচিত। সেই কমিশনের অধীনে পুলিশ পরিচালিত হবে। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের অধীনে থাকবে না। পুলিশকে যেন রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার না করা হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’
অন্তর্বর্তী সরকারের এ উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘পুলিশের ইউনিফর্ম, লোগো সব পরিবর্তন করা হবে। পুলিশের অনেকের মন ভেঙে গেছে। এই ইউনিফর্ম পরে পুলিশ আর কাজ করতে চাইছে না। খুব দ্রুতই তা পরিবর্তন করা হবে। এসব বিষয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হবে। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
বৈঠক শেষে পুলিশের কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারী পুলিশ সদস্যদের সমন্বয়ক পরিদর্শক জাহিদুল ইসলাম ও কনস্টেবল শোয়েবুর রহমান। তারা বলেন, ‘আমরা সরকারের কাছে যেসব দাবি জানিয়েছিলাম তার বেশিরভাগই মেনে নেওয়ার আশ্বাসে কর্মবিরতি প্রত্যাহারের ঘোষণা দিচ্ছি। আশা করি, সবাই সুন্দরভাবে নিজ নিজ দায়িত্বে ফিরবেন।’
পরে রাতে বাংলাদেশ পুলিশ বৈষম্যবিরোধী কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির অন্যতম সমন্বয়ক জাহিদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুশৃঙ্খল বাহিনী হিসেবে পুলিশ আন্দোলন করতে পারে না। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশের যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল, সেটির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ১১ দফা দাবি নিয়ে আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। দাবি আদায়ের জন্য কর্মবিরতিতে ছিলাম। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রধান উপদেষ্টা আমাদের স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই প্রতিশ্রুতি পেয়ে আমরা আজ (রবিবার) রাতেই প্রতীকী ডিউটি করব, ইনশাআল্লাহ।’
রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের থানাগুলোতে পুলিশ সদস্যরা আসতে শুরু করলেও পুরোপুরি কার্যক্রম চালু হতে আরও সময় লাগবে। কম ক্ষতিগ্রস্ত থানাগুলোতে পুলিশ সদস্যরা এখন খুঁটিনাটি কাজ করছেন। কয়েকটি থানায় শিক্ষার্থীদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করতে দেখা গেছে। কিছু থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে সব থানায়ই সেনাবাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি দেখা গেছে।
৬৩৯টি থানার মধ্যে ৫৯৯টি থানার কার্যক্রম স্বল্প পরিসরে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। থানায় কর্মরত প্রায় ৩০ ভাগ পুলিশ সদস্য যোগদান করেছেন। কিছু পুলিশ সদস্য আহত হয়ে চিকিৎসাধীন। অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর করা থানাগুলো মেরামতের উদ্যোগ নিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। তবে পোড়া ও ভাঙচুর করা ভবনেই ভাড়া করা চেয়ার-টেবিল দিয়ে কাজ শুরু করেছেন পুলিশ সদস্যরা। অবশ্য জুনিয়র পুলিশ সদস্যদের বেপরোয়া আচরণে আতঙ্কে রয়েছেন সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তারা।
গত ৮ আগস্ট পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কার্যালয় খোলা হয়। তবে সেদিন দুটি কার্যালয়ে পুলিশ সদস্যদের তেমন উপস্থিতি দেখা যায়নি। এর মধ্যে নবনিযুক্ত আইজিপি দায়িত্ব নেওয়ার পর পুলিশ সদস্যদের নিজ নিজ কর্মস্থলে ফেরার জন্য ২৪ ঘণ্টা সময় বেঁধে দেন। ফলে ধীরে ধীরে থানাসহ অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। এর মধ্যে গতকাল রাজধানীর কিছু পয়েন্টে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। শিগগির পুরো রাজধানীতে তারা কাজ শুরু করবেন বলে আইজিপি জানিয়েছেন।
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে পুলিশ সদস্যরা যোগদান না করলে সরকার বাধ্যতামূলক অবসরেও পাঠাতে পারে। এ ছাড়া আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।’
চাঁদাবাজি করলে পা ভেঙে দেওয়া হবে : সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, ‘আমি কোনো রাজনীতিবিদ নই। একজন ফৌজ, যা বলি তাই করার চেষ্টা করি। আপনারা কেউ চাঁদাবাজি করবেন না, দখলবাজি করবেন না। যদি চাঁদাবাজি করেন, তাহলে পা ভেঙে দেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের একটি রাজনৈতিক দলের কী করুণ অবস্থা হয়েছে, তা আপনারা দেখেছেন। যাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস জড়িত, তাদের অবস্থা দেখেন, পালিয়ে বেড়াচ্ছে। একটা বিশেষ পরিস্থিতি দেশে তৈরি হয়েছে। তার সুযোগ আপনারা নিচ্ছেন, এটা বন্ধ করেন। আমার কাছে খবর আসছে, কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি, একটি ব্যাংকে ঢুকে গোলাগুলি করে দখলের চেষ্টা হচ্ছে। এভাবে চলবে না।’ জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘চাঁদাবাজদের ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে সোপর্দ করুন। নিজেরা আইন হাতে তুলে নেবেন না।’
পুলিশ সদস্যদের আগামী বৃহস্পতিবারের (১৫ আগস্ট) মধ্যে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘বৃহস্পতিবারের মধ্যে যারা কাজে যোগ দেবেন না, আমরা ধরে নেব তারা চাকরি করবেন না। বৃহস্পতিবারের মধ্যে আপনারা কাজে যোগদান করুন। এ সময়ের মধ্যে যারা যোগদান করবেন না, তাদের চাকরিচ্যুত করা হবে। যা কিছু ঘটেছে, তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত হবে। তদন্ত অনুযায়ী বিচার বিভাগ বিচার করবে। এতে কারোর ভয় পাওয়ার কিছু নেই। নির্দোষ কেউ কোথাও কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না।’
৫৯৯ থানার কার্যক্রম শুরু : দেশের ৬৩৯টি থানার মধ্যে গতকাল পর্যন্ত ৫৯৯টি থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ১১০টি মেট্রোপলিটন থানার মধ্যে ৯৭টি এবং জেলার ৫২৯টি থানার মধ্যে ৫০২টি থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে রাজধানীর বাড্ডা থানায় গিয়ে দেখা যায়, সামনের চত্বরে ১০-১২ জন সদস্য সাধারণ পোশাকে বসে আছেন। থানার ভেতরে অগ্নিসংযোগ করায় বসার বা কাজ করার কোনো অবস্থা নেই। থানার ফটকে দায়িত্ব পালন করছেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। দুপুর ১টায় এ থানায় একটি সাধারণ ডায়রির (জিডি) মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু হয়।
রাজধানীর ভাটারা থানা পাঁচ দিন বন্ধ থাকার পর শুক্রবার থেকে পুলিশ সদস্যরা ফিরতে শুরু করেছেন। গতকাল এই থানায় গিয়ে দেখা যায়, সেনাবাহিনী ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা থানার বাইরে অবস্থান করছেন। থানার ভেতরে এখনো ধ্বংসস্তূপ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছেন সিটি করপোরেশন ও শিক্ষার্থীরা। থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে গুলশান থানার পাশের একটি নতুন ভবনে।
রাজধানীর আরেক থানা যাত্রাবাড়ীর পুরোপুরি সংস্কার করে কাজ শুরু করতে আরও সময় লাগবে। তবে থানায় কিছু কিছু পুলিশ সদস্য আসতে শুরু করেছেন। থানায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ চলছে। থানার সামনে টিনশেডে বসে পুলিশ সদস্য ও শিক্ষার্থীদের সাধারণ মানুষের অভিযোগ জমা নিতে দেখা যায়।
ঢাকায় কাজ শুরু করেছে ট্রাফিক পুলিশ : ছয় দিন পর রাজধানীর কিছু সড়কে দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা। গতকাল ইন্টারকন্টিনেন্টাল সিগন্যাল থেকে জাহাঙ্গীর গেট পর্যন্ত পয়েন্টগুলোতে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের কাজ করতে দেখা গেছে। একই সঙ্গে সড়কগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থী-জনতাকেও ট্রাফিক শৃঙ্খলার কাজ করতে দেখা গেছে। ধীরে ধীরে ঢাকার সব সড়কে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা কাজ শুরু করবেন বলে আশা করছেন ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তারা আতঙ্কে : নাম প্রকাশ না করা শর্তে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পুলিশের কনস্টেবল, এএসআই, এসআই ও পরিদর্শকরা বিক্ষুব্ধ আচরণ করছেন। তারা খুব উত্তেজিত হয়ে সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলছেন। সঠিক তথ্য না থাকলেও তারা বলছেন, অনেক পুলিশ সদস্য মারা গেছেন। তারা কেন মারা গেলেন? তারা আদেশ অনুযায়ী কাজ করছেন, তাদের ওপরই কেন এত হামলা? ইত্যাদি নানা প্রশ্ন করছেন জুনিয়র পুলিশ কর্মকর্তারা। ফলে সিনিয়ররা এক ধরনের আতঙ্কে আছেন জুনিয়ররা কখন কী না কী করে বসেন।’
পুলিশের মনোবল ফেরাতে কমিটি : থানার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। কিন্তু পুলিশ সদস্যরা এখনো আতঙ্কে রয়েছেন। তাদের মনোবল ফেরাতে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে জেলা পুলিশ সুপার ও থানার ওসিদের কমিটি গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কবৃন্দ কমিটির আকার নির্ধারণ করবেন।