এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা নিয়ে জটিলতা কাটছেই না। চার দফায় পেছানোর পর সর্বশেষ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে এ পরীক্ষা। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সংকট কাটিয়ে সহসা শুরুও হচ্ছে না স্থগিত থাকা পরীক্ষাগুলো। শুরু করতে পোহাতে হবে নানা জটিলতা। বারবার এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি পেছানোয় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। দ্রুত এ পরীক্ষা শেষ করতে না পারলে নানামুখী চ্যালেঞ্জেও পড়তে হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত পরীক্ষা শেষ করার পরামর্শ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে দফায় দফায় চলমান এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। তিন দফায় আট দিনের পরীক্ষা স্থগিত করেছে বোর্ডগুলো। পরে ১১ আগস্ট থেকে নতুন সময়সূচিতে পরীক্ষা নেওয়ার কথা জানানো হয়। তবে প্রশ্নপত্র পুড়ে যাওয়ায় ওইদিনের পরীক্ষাসহ সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। তার আগে কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরিস্থিতিতে প্রথমে গত ১৮ জুলাইয়ের এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ায় ২১, ২৩ ও ২৫ জুলাইয়ের সব পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। তৃতীয় দফায় ২৮ জুলাই থেকে ১ আগস্ট পর্যন্ত সময়সূচি অনুযায়ী সব পরীক্ষা স্থগিত করে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি।
শিক্ষা বোর্ডগুলো বলছে, থানার মালখানায় রাখা প্রশ্নপত্র ও উত্তরপত্র ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক জায়গায় পুড়ে ছাই হয়েছে। সেগুলোর তথ্য সংগ্রহে তারা কাজ করছে। অন্তত ১৮টি থানায় রাখা প্রশ্ন ও উত্তরপত্র পুড়ে যাওয়ার তথ্য পেয়েছে তারা। ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে ৬০টিরও বেশি থানায়। এসব থানায় রাখা প্রশ্নপত্র পুড়লেও তেমন সমস্যা নেই। তবে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেওয়ার পর যে লিখিত উত্তরপত্র থানায় রাখা হয়েছিল, তা পুড়ে যাওয়ায় ফল নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, পরীক্ষা শুরু করতে অন্তত এক মাস সময় লাগবে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে পরীক্ষা শুরু করার কোনো সুযোগ নেই। আগুনে পুড়ে যাওয়া প্রশ্ন ও উত্তরপত্র নিয়ে জটিলতার সমাধান করতে হবে। দেশের সব থানায় এখনো কর্মযজ্ঞ শুরু হয়নি। শুরু হলে কত দিনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে, তার ওপর নির্ভর করছে সবকিছু।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করতে হতে পারে। ঠিক করার কয়েকটি ধাপ আছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি কতটা স্বাভাবিক হবে ও থানাগুলো নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সব মিলিয়ে আরও এক মাস সময় লাগতে পারে। তবে দ্রুত শুরু করার চেষ্টা চলছে।
বারবার এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি পেছানোয় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। শিক্ষার্থীরা জানান, যে পরীক্ষাগুলো স্থগিত করা হয়েছে, সেগুলোর জন্য আবার নতুন করে প্রস্তুতি নিতে হবে। এতে পড়াশোনার গতি কমে যাবে। বারবার পরীক্ষাসূচি পরিবর্তনে নিয়মিত পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটছে বলে জানিয়েছেন অভিভাবকরা। তারা বলছেন, ‘পরীক্ষা পেছানোয় আমরা তাদের পড়ার টেবিলে আর নিয়মিত হতে দেখছি না। তারা পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পারছে না।’
মিরপুর কলেজের এক শিক্ষার্থীর মা আফসানা আক্তার বলেন, ‘আমাদের সন্তানদের নিয়ে আমরা মহাসংকটে পড়েছি। এইচএসসি পরীক্ষা উচ্চশিক্ষার দ্বার হওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন। পড়াশোনায় বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটছে। আমরা চাই নতুন সরকার সবার আগে এ পরীক্ষার দিকে নজর দিক।’
অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু বলেন, ‘উত্তরপত্র আগুনে পুড়ে যাওয়ায় পুনরায় পরীক্ষা নেওয়াটাও ঝামেলা এবং এসএসসির নম্বর দেখে এইচএসসিতে নম্বর দেওয়াটাও অযৌক্তিক। আমরা আশা করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শিক্ষার্থীদের মঙ্গলে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। দ্রুত এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হবে বলে আমরা আশাবাদী।’
এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার ফলে দেশের সামগ্রিক শিক্ষা খাতেই শিডিউল বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেলের ভর্তি পরীক্ষাগুলো যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে না কিংবা শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতির সময় পাবে না। এইচএসসি শেষে যারা দেশের বাইরে পড়তে যেতে ইচ্ছুক তারাও মিস করবে চলমান সেশন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. তানজিম উদ্দিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নানা কারণে শিক্ষা খাতে ফের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আমরা বারবার বাধ্য হচ্ছি এইচএসসি পরীক্ষা স্থগিত করতে। এভাবে চললে উচ্চশিক্ষাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পুরো শিক্ষাব্যবস্থায় এর প্রভাব পড়বে। কিছুই পরিকল্পনা অনুযায়ী হবে না। এর থেকে দ্রুত উত্তরণ জরুরি।’
আন্তঃশিক্ষা সমন্বয় বোর্ড সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক তপন কুমার সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা সবকিছু নিয়ে কাজ করছি। কীভাবে দ্রুত পরীক্ষাটা নতুন সূচিতে শুরু করা যায়, তার পরিকল্পনা সাজাচ্ছি। পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হলে এক মাসের মধ্যে পরীক্ষাটা আমরা শুরু করতে পারব।’
তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন ও উত্তরপত্র পুড়ে যাওয়ায় মূল্যায়ন করা যাবে না, নম্বর দেওয়াও সম্ভব নয়। ফল তৈরি করাও অসম্ভব। এখন এটা কীভাবে করা যায় তা নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আমরা পরামর্শ করছি। সেখান থেকে যেভাবে নির্দেশনা আসবে, সেভাবে আমরা ব্যবস্থা নেব।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হলেই এইচএসসি পরীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা এবং এইচএসসির বিষয়ে এখনো সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা আলোচনার সুযোগ হয়নি। কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সঙ্গে সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিও জরুরি। পরিস্থিতির উন্নতি হলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’
গত ৩০ জুন এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয়। ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি বোর্ড ও মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী ১৪ লাখ ৫০ হাজার ৭৯০ জন। এখন পর্যন্ত ৮টি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে সিলেট বিভাগে হয়েছে মাত্র চারটি।