পুঁজিবাজারে অনিয়ম-দুর্নীতিতে শিক্ষকদের সম্পৃক্ততা

২০১০ সালে ধসের পর পুঁজিবাজারের নেতৃত্বে বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে আসে সদ্য পদত্যাগ করা আওয়ামী লীগ সরকার। ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের ১০ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৪ বছর পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থায় চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষক অধ্যাপক খায়রুল হোসেন ও শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামকে। এ সময় কমিশনারদের বেশিরভাগই ছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কিন্তু এসব শিক্ষকের অপেশাদার ও অনৈতিক কর্মকা-ে দীর্ঘ সময়ও বাজারের কোনো উন্নয়ন হয়নি, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে ঠেকেছে। দুর্নীতিতে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততায় লাখ লাখ বিনিয়োগকারী পুঁজি হারিয়ে বাজার ছেড়েছেন। 

গতকাল সোমবার ‘বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এসইসির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে ধরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। সংবাদ সম্মেলনে ডিবিএর পক্ষে অনিয়ম-দুর্নীতির ফিরিস্তি তুলে ধরেন সংগঠনটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০১১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রায় ১৪ বছর ধরে ড. এম খায়রুল হোসেন ও অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলাম এসইসি চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা উভয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশা থেকে এসে এ পদে আসীন হন। এ দীর্ঘ সময়ে তাদের অপেশাদার এবং অনৈতিক কর্মকা-ের ফলে বাজারের কোনো উন্নতি হয়নি বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থা তলানিতে এসে পৌঁছায়।

ডিবিএ সভাপতি বলেন, ২০১০ সালের বাজার পতনের পর এই দুই শিক্ষক বাজারে ইনসাইডার ট্রেডিং বন্ধ করা, কারসাজি রোধে বাজারে স্বচ্ছতা, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ভালোমানের আইপিও তালিকাভুক্তি, প্লেসমেন্ট বাণিজ্য বন্ধ করা, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার যে অঙ্গীকার নিয়ে বাজারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তা পূরণে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, উপরোক্ত প্রতিটি অনিয়মে তাদের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা পরিলক্ষিত হয়েছে।

বিগত দুটি কমিশন ১৩-১৪ বছরে আমাদের অনেক দিনের গড়া সুশৃঙ্খল সম্ভাবনাময় বাজারকে ওলট-পালট করে দিয়েছে। এসব অপশাসন ও অপকর্মে তার সঙ্গে কমিশনের বহু অসৎ, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা জড়িত রয়েছেন। যারা পদ ও পদবির লোভে, নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে কমিশনের সঙ্গে জোট বেঁধে বাজারের ব্যবসায়ীদের সর্বস্বান্ত করেছেন বলে জানান ডিবিএ সভাপতি।

সাইফুল ইসলাম বলেন, ২০০৯-১০ সালে পুঁজিবাজার পতনের পর লাখ লাখ বিনিয়োগকারী তাদের পুঁজি হারিয়ে পথে বসে যান। শেয়ার ক্রয়ে মার্জিন ঋণ প্রদানকারী বহু প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হয়ে যায়। এরপর থেকে বাজার পরিস্থিতির কোনোরূপ উন্নতি না হওয়ায় বারবার ক্ষতির মুখে পড়ে লাখ লাখ বিনিয়োগকারী বাজার ছেড়ে চলে যান।

বাজার পতনের কারণ ও দোষীদের খুঁজে বের করতে তৎকালীন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর প্রয়াত ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা বাজার কারসাজিতে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আজও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সেই কারসাজি চক্র আরও সক্রিয় হয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়ে যায়।

আইপিওর নামে গত ১৪ বছরে যে পরিমাণ দুর্নীতি ও অনিয়মের আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইপিওর মাধ্যমে বাজারে অনুপযুক্ত, দুর্বল, মানহীন, দেউলিয়াগ্রস্ত কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। আপনারা পত্রপত্রিকার মাধ্যমে এ বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। আপনারা প্রতিটি আইপিওর দুর্বলতা ও নেতিবাচক দিকগুলো বিশদভাবে প্রকাশ করেছেন।

সম্প্রতি ‘ফ্লোর প্রাইস’ নামক একটি অদ্ভুত নিয়ম আমাদের বাজারে আরোপ করা হয়েছে। এ ফ্লোর প্রাইস শেয়ার ক্রয়-বিক্রয়ে বাধা সৃষ্টি করে এবং বাজারের স্বাভাবিক লেনদেন ও বিনিয়োগকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ নিয়মের কারণে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীর একটি বড় অংশ আমাদের বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।

পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতোই প্রাইমারি রেগুলেটর হিসেবে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের হাতে আইপিও লিস্টিং ও ডি-লিস্টিং করার ক্ষমতা থাকা উচিত ছিল। কিন্তু বাংলাদেশে আমরা দেখি, আইপিও লিস্টিংয়ের ক্ষেত্রে বিএসইসিই সর্বেসর্বা এবং সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। স্টক এক্সচেঞ্জের এখানে ভূমিকা নেই বললেই চলে। এভাবে বাজারে আনা মানহীন আইপিওর দায় এসইসির ওপরই বর্তায়।

ডিবিএ সভাপতি বলেন, ডিএসই, সিএসইসহ সিডিবিএল ও সিসিবিএলের পর্ষদে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের অনভিজ্ঞতা ও অদূরদর্শিতা প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করেছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিযুক্ত ব্যক্তিদের সরিয়ে যোগ্য এবং অভিজ্ঞ পেশাদার ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

তিনি বলেন, ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড নামে একটি প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়েছে, যার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানটি তৎকালীন সরকারের নির্দেশে গঠিত হয়েছিল এবং বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশের টাকা তছরুপ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আমরা এ প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করার দাবি জানাই এবং যাদের অর্থ নেওয়া হয়েছে, তাদের অবিলম্বে ফেরত দেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

বিগত সময়ে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বিদেশে রোড শো আয়োজন করেছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ছিল। এ রোড শোগুলো থেকে বিনিয়োগ আনার পরিবর্তে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষতি হয়েছে। আমরা প্রতিটি রোড শোর শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি এবং কত টাকা খরচ হয়েছে এবং এর বিনিময়ে কত টাকা অর্জন হয়েছে, তা জনসম্মুখে প্রকাশ করার দাবি জানাচ্ছি। কমিশনে প্রভাব বিস্তারকারী এ জাতীয় অসংখ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনৈতিক অর্থ আয়ের অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত করে এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়ে পুঁজিবাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীর আস্থা ফিরিয়ে আনা সময়ের দাবি।