সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে দীর্ঘদিন অবস্থান করলেও ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না বলে মনে করছেন অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন।
গতকাল সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় বিদেশি কূটনীতিকদের কাছে নতুন সরকার সম্পর্কে ব্রিফ করার পর সাংবাদিকদের এ কথা বলেন তিনি।
ভারতে শেখ হাসিনার দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে কি না এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘এটি একটি হাইপোথিটিক্যাল প্রশ্ন। তিনি যদি কোনো দেশে গিয়ে থাকেন, তবে সম্পর্ক নষ্ট হবে কেন? এর কোনো কারণ নেই। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অনেক বড় বিষয়। এটি স্বার্থের সম্পর্ক।’
তিনি আরও বলেন, ‘বন্ধুত্বও কিন্তু স্বার্থের জন্য এবং বিঘ্নিত হলে বন্ধুত্ব থাকে না। ভারতের স্বার্থ আছে এবং বাংলাদেশেরও স্বার্থ আছে। কাজেই আমরা স্বার্থ বজায় রাখব এবং সুসম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করব।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে বিদেশিরা জানতে চেয়েছেন কি না এই প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘এ বিষয়ে কেউ একটি প্রশ্নও করেননি। কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করেননি।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, ব্রিফিংয়ে ৬০ জনের বেশি কূটনীতিক অংশগ্রহণ করেন এবং তার কাছে নতুন সরকার সম্পর্কে জানতে চান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাদের একটি ব্রিফিং নোট সরবরাহ করা হয়।
কূটনীতিকদের ব্রিফিং প্রসঙ্গে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘রাষ্ট্রদূতদের ডাকা হয়েছে। সরকার কোন প্রেক্ষাপটে এসেছে এসব বিষয়ে বলা হয়েছে। আমরা আমাদের উদ্দেশ্য বলেছি। একটা গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তন এসেছে, সেটা যারা এনেছে তাদের কিছু দাবি-দাওয়া আছে। তাদের চাওয়া কোনো বৈষম্য থাকবে না। এ সরকার সেই উদ্দেশে কাজ করছে।’
উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা চেয়েছি। এগিয়ে এসেছে তারা। আমরা বলেছি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয়ভাবে যুক্ত হতে চাই। সবক্ষেত্রে জাতিসংঘসহ সবার সঙ্গে। রোহিঙ্গা ইস্যু, বিনিয়োগের ব্যাপারে কিছু প্রশ্ন এসেছে। আমরা বলেছি, তারা যেন হতাশ না হয়। এত বড় একটা পরিবর্তন হয়েছে, কিছু তো সময় লাগতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘বিদেশিদের সামগ্রিক মনোভাব অত্যন্ত ইতিবাচক এবং তারাও জানে যে আজকে, কালকে, সাত দিন, এক মাসের মধ্যে এটি সমাধান করা সম্ভব নয়।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘মানবাধিকার অনেকের উদ্বেগের জায়গা। আমি বলেছি, বৈষম্য না থাকাটাই মানবাধিকারের অন্যতম উপাদান। মানবাধিকার নিয়ে কাজ করেন, এমন বেশ কিছু প্রতিনিধি আছেন আমাদের উপদেষ্টা পরিষদে। এর থেকে বোঝাই যায় মানবাধিকার নিয়ে আমরা অত্যন্ত সিরিয়াস।’
নির্বাচন নিয়ে কথা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘একটি শব্দও উচ্চারিত হয়নি। কারণ আমি পরিষ্কার করে দিয়েছি যে, এই সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাচন করে ক্ষমতা হস্তান্তর করা।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘বিনিয়োগের বিষয়ে হতাশ না হওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। আমরা বলেছি যে তারা যেন হতাশ না হন। কারণ এটি সাময়িক পরিস্থিতি। এত বড় একটি পরিবর্তনের পরে অল্প সময়ের জন্য এটি হতে পারে। সালেহউদ্দিন (অর্থ উপদেষ্টা) সাহেব একজন অত্যন্ত যোগ্য মানুষ এবং তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকিং এবং অর্থনীতি, উভয় ক্ষেত্রে ওনার অভিজ্ঞতা আছে। অর্থনীতিকে তিনি লাইনে নিয়ে আসতে পারবেন বলে আমরা আশা করছি। কাজেই নিরাপত্তা ও লাভ, সবকিছু ভালো হবে। তারা যেন সাময়িক অসুবিধাকে গুরুত্ব না দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে বাংলাদেশ যে একটি ভালো বিনিয়োগের জায়গা, সেটি বিবেচনা করেন।’
তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘একজন রাষ্ট্রদূত বলেছেন, যুব সম্প্রদায় এত বড় একটা কাজ করল, আমরা আশা করব আগামীতে যে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আসবেন, সেখানে যেন যুবকরা আসেন। আসলেই তো আমাদের মতো পুরনো লোকদের চেহারা দেখতে দেখতে সবাই বিরক্ত হয়ে গেছে। সংসদের দিকে যদি তাকান, তারা ১৯৭০ সাল থেকে শুরু করেছেন এবং এখনো তিনি অবসরে যাবেন না। অনেক ক্ষেত্রে পার্টির ভেতরে ক্ষোভ আছে, জায়গা পাওয়ার জন্য। এটি থেকে মুক্তি পাওয়া প্রয়োজন।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি আশা করব আগামীতে যখন একটি নির্বাচিত সরকার আসবে, সেখানেও যুবকদের প্রতিনিধিত্ব থাকবে, নারীদের প্রতিনিধি থাকবে, শুধু সংরক্ষিত আসনে নয়, বরং সাধারণভাবে তারা যেন নির্বাচিত হতে পারেন।’
সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি এ সরকারের মেয়াদ নিয়ে কূটনীতিকরা কোনো প্রশ্ন করেছেন কি না -জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে কোনো প্রশ্ন আসেনি। কাজেই এটা এখন আমরা বাদ দিই। নির্বাচনের বিষয়ে একটি শব্দও হয়নি। আমি পরিষ্কার করে দিয়েছি বিষয়টা। এ সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে, নির্বাচন অনুষ্ঠান করে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।’
বিদায়ী সরকারের পরিকল্পনায় থাকা বন্ধু দেশগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন এনগেজমেন্ট আটকে যাওয়ার প্রশ্নে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ‘ঠিক এ মুহূর্তে আমরা...। আমরা কিন্তু কোনো কিছু থেকে সরে যাব এমন না। যারা সঙ্গে যে চুক্তি আছে বা কমিটমেন্ট আছে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বা দ্বিপক্ষীয় ব্যাপারে সেগুলো রক্ষা করতে হবে। যেখানে আমাদের মনে হয় স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়েছে, সেখানে আমাদের স্বার্থ দেখা হবে।’