ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পরিবেশ তৈরি করে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ‘যৌক্তিক সময়’ দিতে চায় রাজনৈতিক দলগুলো। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিগুলোর প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছেন দলের নেতারা। তারা এই আন্দোলনে নিহতদের বিচারের জোরালো দাবি জানান। আগামী ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার দিন আওয়ামী লীগ সরকারের পালিত শোক দিবসের সরকারি ছুটি বাতিলেরও পরামর্শ দেন তারা।
গতকাল সোমবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে বিকেল ৩টা থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের পতনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে বৈঠক করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
বৈঠকে আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে বর্তমান সরকারকে ‘যৌক্তিক’ সময় দেওয়ার পক্ষে দলগুলো অনেকটাই একমত পোষণ করেছে বলে জানা গেছে। তবে সেই সময় কতটুকু সেটি নির্ধারণ হয়নি বলে সূত্রগুলোর দাবি।
বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা, দেশের অর্থনীতির অগ্রগতির নিয়ে দলগুলোর নেতারা তাদের মতামত তুলে ধরেন।
গতকাল সোমবার বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় পর্যায়ক্রমে ৭টি রাজনৈতিক দল প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে এসব মতামত ব্যক্ত করেন।
বিকেলে প্রথম বৈঠকটি হয় বিএনপির সঙ্গে। পরে বিকেল ৫টায় জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধান উপদেষ্টা। এরপর এবি পার্টি, ইসলামী আন্দোলন ও গণ অধিকার পরিষদের দুই অংশের সঙ্গে বৈঠক হয়। সর্বশেষ গণতন্ত্র মঞ্চ ও জাতীয় পার্টির (পার্থ) সঙ্গে বৈঠক করেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারপ্রধান।
বৈঠক শেষে অতিথি ভবনের সামনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংবাদিকদের জানান, ‘অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কী কী করছেন প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকে তারা অবহিত হয়েছেন।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনে মুক্ত পরিবেশে এ সরকার (অন্তর্বর্তীকালীন সরকার) দায়িত্ব নেওয়ার পরে এই প্রথম আমাদের সঙ্গে বসেছেন। আমরা দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে কী কী করা যায়, এ বিষয়ে আমাদের মতামত দিয়েছি। তারা কী কী করেছে, কী কী করতে যাচ্ছে, তা আমাদের সঙ্গে শেয়ার করেছে। আমরা মনে করি, এ সরকারকে সহায়তা করা প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের একমাত্র কর্তব্য।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘বাংলাদেশের অধিকার হরণ করেছিল যে মহলটি, তারা আজকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে আবার ভারতে পালিয়ে গিয়ে সেখান থেকে বাংলাদেশের বিজয়কে নস্যাৎ করার চক্রান্ত শুরু করেছে। আমরা খুব স্পষ্ট করে বলেছি, এখানে তথাকথিত মাইনরিটির ওপরে নির্যাতনের যে একটা গল্প ফাঁদা হয়েছে, সেই গল্পটা পুরোপুরি উদ্দেশ্যমূলক। এটি ছাত্র-জনতার বিপ্লবকে নস্যাৎ করার আরেকটি চক্রান্ত।’
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আজকে নির্বাচন নিয়ে আমরা কথা বলিনি। আমরা আগেও বলেছি আপনারা জানেন, একটা নির্দিষ্ট সময় লাগবে নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে। আমরা তাদের সেই সময়টি অবশ্যই দিয়েছি। আমরা তাদের (অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের) সব বিষয়গুলোয় সমর্থন দিয়েছি। আমরা একটা কথা খুব পরিষ্কার করে বলেছি, বর্তমানে দেশে যে অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে, সাম্প্রদায়িকতার ধোঁয়া তোলা হচ্ছে এগুলোতে জনগণ যাতে বিভ্রান্ত না হন। জনগণ ঠিক আগের মতোই সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে অক্ষুন্ন রেখে, তাদের নিরাপত্তা দিয়ে সরকারকে যেন সহায়তা করে। আমরাও পুরোপুরিভাবে তাদের সেভাবে সহায়তা করছি।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘খুবই দুর্ভাগ্যজনক, এত হত্যা, নির্যাতন, নিপীড়ন, এত ছাত্র হত্যা করার পরও সেই দলটি (আওয়ামী লীগ) আবারও বিভিন্ন রকমভাবে কথা বলছে, যা বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে। আমরা মনে করি, সরকারের এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সরকার অবশ্যই রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কথা বলবে। কিন্তু যারা ছাত্রদের, শিশুদের হত্যা করেছে, যারা রাজনৈতিক নেতাদের হত্যা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে জনগণ আছে এবং এ ব্যাপারে তাদের (আওয়ামী লীগ) বিরুদ্ধে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিতে গেলে আমরা সরকারকে অবশ্যই সমর্থন দেব।’
প্রায় এক ঘণ্টার এই বৈঠকে বিএনপি মহাসচিবের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, ড. আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান ও সালাহউদ্দিন আহমেদ। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ছিলেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার।
বৈঠকে অংশ নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলাপকালে কয়েকটি বিষয়ে আভাস মিলেছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ত্রয়োদশ নির্বাচন কবে হবে, বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার ইত্যাদি। বৈঠকে অংশ নেওয়া বিএনপির দুই নেতার ভাষ্য হচ্ছে, বিএনপি নতুন সরকারকে সময় দিলেও সেটা যৌক্তিক হতে হবে। কেননা, যৌক্তিক কারণ ছাড়া নির্বাচন পেছালে বর্তমান সরকারের গ্রহণযোগ্যতা হ্রাস পাবে। নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপি তাড়াহুড়ো করতে না চাওয়ার আরেকটি কারণ হচ্ছে, দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, মহাসচিব মির্জা ফখরুলসহ সব পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা। এসব মামলা উচ্চ আদালতে বিচারাধীন। সেসব বিষয় আইনি পথে সমাধান করে ফিরতে হবে। শুধু রাষ্ট্রপতির আদেশকে সামনে রেখে চিন্তা করলেও আগামী দিনের রাজনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। কেননা, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যারা অংশ নেবেন, তাদের অধিকাংশই আদালতের মাধ্যমে অযোগ্য ঘোষিত হয়ে আছেন। অবিলম্বে নির্বাচন চাইলে সে প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।
প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের পর বিএনপির শীর্ষ নেতারা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেন। গুলশানের কার্যালয়ে দলের জরুরি স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
এর আগে খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠপুত্র আরাফাত রহমান কোকোর ৫৫তম জন্মদিন উপলক্ষে সকালে বনানী কবরস্থানে তার কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণের পর মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি সবাইকে দেশের প্রতি বিপ্লবের যে আশঙ্কা আছে, সেই আশঙ্কা থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য অত্যন্ত সজাগ থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।’
শেখ হাসিনা ভারতের একটি গণমাধ্যমে বলেছেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপ দিতে রাজি হননি বলেই তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘বাকোওয়াজ। নিজে যখন ব্যর্থ হন, তখন অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানো তাদের একটা বৈশিষ্ট্য।’
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘অতি দ্রুত নির্বাচনের জন্য একটা ক্ষেত্র তৈরি করা এবং সমস্ত বিপদকে কাটিয়ে সত্যিকার অর্থেই একটা মুক্ত বাংলাদেশ নির্মাণে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটা নির্বাচনের ব্যবস্থা করবেন।’ বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর খবরকে অভ্যুত্থান নস্যাৎ করার মিথ্যা বানোয়াট, ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডা চালানো হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিকেল সাড়ে ৪টার পর জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দলটির নেতারা যমুনায় প্রবেশ করেন। সেখানে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠকে বসেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারা।
বৈঠক শেষে বেরিয়ে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে কোনো কথা হয়নি। তারা শুধু বসলেন, মাত্র চারটা দিন হলো, আমরা দেখতে চাই তারা কীভাবে জাতিকে নিয়ে এগোতে চাচ্ছেন। সমস্যাগুলোর সমাধান কীভাবে করেন। যৌক্তিক সময়ে সমাধান হবে বলে আমরা আশা করি।’
এ ছাড়া প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবি পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, রেজা কিবরিয়ার নেতৃত্বাধীন গণপরিষদ, নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন গণ অধিকার পরিষদ, ইসলামী আন্দোলন, সিপিবি, বাসদ, গণতন্ত্র মঞ্চের প্রতিনিধি, মঞ্চের শরিক দল বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের নেতারা।
এর মধ্যে এবি পার্টি ১১ দফা ও নুরুল হক নুরের গণপরিষদ ১৪ দফা লিখিত দাবি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে তুলে ধরেছেন।