দুই বছর ধরেই বাংলাদেশে রিজার্ভ সংকট চলছে। দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায়ও অব্যাহতভাবে তারল্য সংকট চলছে। সদ্য পদত্যাগী সরকার বিভিন্ন বন্ধু দেশের কাছে ঋণ চেয়েও পায়নি। অর্থের এমন সংকটের প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে পড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোনো মহামারী না হলেও বাংলাদেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন (এডিপি) মহামারী করোনার সময়ে নেমে এসেছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৮০ দশমিক ৯২ শতাংশ। এটি গত মে পর্যন্ত ছিল ৫৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। অর্থবছরের শেষ মাসে তাড়াহুড়া করে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে এডিপি বাস্তবায়নের হার বাড়ানো হয়েছে।
গত ২০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছর। ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাস্তবায়ন হার ছিল ৮০.৩৯ শতাংশ। এর চেয়ে মাত্র শূন্য দশমিক ৫৩ শতাংশ বেশি এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে সর্বশেষ অর্থবছরে।
করোনার সময় ২০২০-২১ অর্থবছরে বাস্তবায়ন হার ছিল ৮২.১১ শতাংশ, যা চলতি অর্থবছরের চেয়েও ১.১৯ শতাংশ বেশি। করোনা ছাড়া অর্থবছর শেষে আগের বছরগুলোর অধিকাংশ সময় এডিপি বাস্তবায়ন হার ছিল ৯০ শতাংশের ওপর। এমনকি অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে গত অর্থবছরেও বাস্তবায়ন হার ছিল ৮৫.১৭ শতাংশ। অর্থাৎ করোনার এক বছর বাদ দিলে সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়নে রেকর্ড করেছে গত অর্থবছর। গত ২০ অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ২০১৭-১৮ এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। এই দুই অর্থবছরের বাস্তবায়ন হার ছিল যথাক্রমে ৯৪.১১ এবং ৯৪.৬৬ শতাংশ।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের যে হার তা করোনার সময় ছাড়া এর আগে কখনো এত কম বাস্তবায়ন হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে একই চিত্র দেখা গেলেও বাস্তবায়নের দিকে কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। প্রতি বছরই শেষ সময়ে তাড়াহুড়া করে বাস্তবায়নের হার বাড়ানো হয়। এতে কাজের মান ঠিক থাকে না। সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় না আনলে শতভাগ এডিপি বাস্তবায়নে উন্নতি সম্ভব নয়।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত অর্থবছর জুড়েই এডিপি বাস্তবায়নে ছিল মন্থরগতি। নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবায়নে কোনো উন্নতি দেখা যায়নি। কিন্তু শেষ মাসে এসে উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে এডিপি বাস্তবায়ন হার। কিন্তু তাতেও সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়নের রেকর্ড এড়ানো সম্ভব হয়নি। বরং প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং পর্যাপ্ত অর্থছাড় না হওয়ার কারণে সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হার নেমেছে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
গতকাল বুধবার ২০২৩-২৪ অর্থবছরের এডিপি বাস্তবায়নের এ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আইএমইডি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরাদ্দের হিসাবে কয়েকটি মন্ত্রণালয় ছাড়া বেশিরভাগই তাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। তবে সর্বনিম্ন এডিপির মধ্যে ৪টি মন্ত্রণালয় এবং বিভাগ বরাদ্দের চেয়ে বেশি হারে বাস্তবায়ন করেছে।
বিআইডিএস’র সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. এমকে মুজেরী বলেন, প্রতি বছর বড় আকারের এডিপি নেওয়া হয় কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয় না। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এডিপি বাস্তবায়ন না হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতির পাশাপাশি অর্থের অপচয় হয় এবং সুফল পাওয়া যায় না। এডিপি বাস্তবায়ন হার বাড়াতে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হলেও কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। এজন্য প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
আইএমইডি সচিব আবুল কাশেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, আমরা আশা করেছিলাম আগের অর্থবছরের তুলনায় বেশি হবে। কিন্তু অর্থবছর শেষে দেখা গেল সর্বনিম্ন এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে। তিনি বলেন, মূলত অর্থছাড় কম হওয়ার কারণে বাস্তবায়ন হার কম হয়েছে। বিশেষ করে গত অর্থবছর জুড়ে কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থছাড় কমানো হয়েছিল।
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের এডিপিতে ১ হাজার ৬৪৭ প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ রয়েছে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে ৫৮ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের তত্ত্বাবধানে থাকা এসব প্রকল্পের বিপরীতে খরচ হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৩৭৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ৮০ দশমিক ৯২ শতাংশ।
এদিকে, সামগ্রিকভাবে এডিপি বাস্তবায়ন হারের সঙ্গে মাসের হিসাবেও চলতি অর্থবছরে খরচ বেশি হলেও বাস্তবায়ন হার কম হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের শুধু জুন মাসে এডিপি বাস্তবায়নে খরচ হয়েছে ৫৯ হাজার ৪৮২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ এ সময় বাস্তবায়নের হার ২৩.৩৮ শতাংশ। ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই সময়ে খরচ হয় ৫৫ হাজার ৯৫৭ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ২৩.৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ মাসের হিসাবে বাস্তবায়ন হার কম হয়েছে।
আইএমইডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাস্তবায়ন হারে সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয় এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। বিভাগ দুটি পুরো অর্থবছর জুড়ে ৪০ শতাংশও বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এরমধ্যে সবচেয়ে কম বাস্তবায়ন করেছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, বরাদ্দের মাত্র ৩৪ দশমিক ৭৯ শতাংশ। বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন বাস্তবায়ন করেছে ৪৬.০৮ শতাংশ।
এদিকে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়নের গড় হিসাবে সর্বনিম্ন হলেও ৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ বরাদ্দের চেয়ে বেশি বাস্তবায়ন করেছে। এরমধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ বাস্তবায়ন করেছে। মন্ত্রণালয়টি বাস্তবায়ন করেছে ১১৮.১০ শতাংশ। এছাড়া জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের বাস্তবায়ন হার ১০৭.৮৯ শতাংশ, বিদ্যুৎ বিভাগের বাস্তবায়ন হার ১০১.৮২ শতাংশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের বাস্তবায়ন হার ১০১.২৬ শতাংশ।
শতাংশের হিসাবে বাস্তবায়নে পিছিয়ে থাকলেও টাকা খরচে এগিয়ে রয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। বিভাগটির ২৬৬ প্রকল্পের বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৪২ হাজার ৯৫৬ কোটি ৭১ লাখ টাকা। অর্থবছর শেষে বিভাগটি খরচ করেছে ৩৭ হাজার ৯৪০ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা বরাদ্দের ৮৮.৩২ শতাংশ।