কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ঢাকার মোহাম্মদপুরে গুলিতে এক মুদি দোকানি নিহতের ঘটনায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার মন্ত্রিপরিষদের দুই সদস্য ও পুলিশের চার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে করা হত্যা মামলার আবেদন এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। আন্দোলনের সময় মোহাম্মদপুরের বসিলায় আবু সায়েদ (৪৫) নামে ওই মুদি দোকানিকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে অভিযোগে মামলার আবেদন করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট (সিএমএম) রাজেশ চৌধুরীর আদালতে আবেদনের পর বিচারক বেলা পৌনে ৩টার দিকে অভিযোগটি এজাহার হিসেবে নথিভুক্ত করতে মোহাম্মদপুর থানাকে নির্দেশ দেন। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলতি মাসের শুরুতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের পদত্যাগের এক দফা আন্দোলনে পরিণত হয়। প্রবল আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। ওইদিন তিনি পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই প্রথম শেখ হাসিনা, তার সরকারের মন্ত্রী ও পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হলো।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষ-সংঘাতে এখন পর্যন্ত পাঁচশোর বেশি মানুষ নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
শেখ হাসিনা ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সাবেক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমান, অতিরিক্ত কমিশনার মো. হারুন অর রশীদ ও যুগ্ম কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার। রাজধানীর আদাবরের বাসিন্দা এসএম আমীর হামজা শাতিল নামে এক ব্যক্তি মামলাটি করেন। আরজিতে তিনি ন্যায়বিচারের স্বার্থে ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এ মামলাটি করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। বাদীসহ মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে পাঁচজনকে।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে আদালত মামলার বাদীর জবানবন্দি নথিভুক্ত করেন। মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, সম্প্রতি কোটা সংস্কারের জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার পদত্যাগে বাধ্য হয়েছে। গত ১৮ জুলাই থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনে গতি সঞ্চার হয়। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলন দমানোর জন্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার দমন-পীড়ন শুরু করে ১ ও ২ নম্বর আসামির (শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের) নির্দেশে পুলিশ বাহিনী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়।
এতে বলা হয়, গত ১৯ জুলাই বিকেল ৪টায় মোহাম্মদপুরের বসিলার ৪০ ফিট চৌরাস্তায় হাজার হাজার জনতা কোটা আন্দোলন সংস্কার সমর্থনে মিছিল করছিল। সেই আন্দোলন দমনের জন্য পুলিশ নির্বিচারে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়। ওই সময় ওই এলাকায় রাস্তা পার হয়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সময় পুলিশের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে স্থানীয় মুদি দোকানদার আবু সায়েদ মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলে মৃত্যুবরণ করেন। তার মাথার একপাশ দিয়ে গুলি ঢুকে অন্যপাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। স্থানীয় লোকজন জানান, আবু সায়েদ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর স্থানীয়রা তার লাশ গ্রামের বাড়ি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার মাড়োয়া বামনহাট ইউনিয়নের নতুন বস্তি প্রধানহাটে পাঠিয়ে দেয়।
মামলার অভিযোগে বাদী বলেন, ছাত্র-জনতার ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবিতে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছিল। কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই পুলিশ আসামিদের নির্দেশে অজ্ঞাতনামা পুলিশ সদস্যরা গুলি করে আবু সাঈদকে হত্যা করেছেন। বাদী বলেন, আন্দোলন চলাকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা সংস্কার আন্দোলন কঠোর হস্তে দমন করার নির্দেশ দিয়েছেন। ওবায়দুল কাদের বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে আন্দোলন দমনের নির্দেশ দিয়েছেন। আসাদুজ্জামান কামাল পুলিশকে ছাত্র-জনতার মিছিলে গুলি করার নির্দেশ দেন। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাদের অধীন পুলিশ সদস্যদের আন্দোলন দমাতে নির্দেশ দিয়েছেন। আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন।
আরজিতে বাদী উল্লেখ করেন, আবু সাঈদ হত্যার তদন্ত হলে তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী, এমপি ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং পুলিশ সদস্যদের নাম উঠে আসবে। বাদী মামলার নথিতে ন্যায়বিচারের স্বার্থে উপরোক্ত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাদীর মামলাটি মোহাম্মদপুর থানার এজাহার হিসেবে গণ্য করে তদন্তপূর্বক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিতে আদালতে আরজি জানান। মামলার নথিতে আরও বলা হয়, নিহত আবু সাঈদের পরিবার অত্যন্ত গরিব। তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারছেন না। পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদের মৃত্যুর ঘটনায় এখনো মামলা হয়নি। এ কারণে সচেতন নাগরিক হিসেবে বাদী আবু সাঈদ হত্যার বিচার দাবি করে এই মামলা করেন।
মামলার বাদী আমীর হামজা একজন দুগ্ধ খামারি। তিনি আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেছেন, নিহত আবু সাঈদ তার ঘনিষ্ঠ কেউ না হলেও বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে তিনি স্বেচ্ছায় এ মামলা করেছেন। নিহত সাঈদের পরিবার থাকে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলায়। মামলা করার মতো অবস্থা তাদের নেই বলেও আমীর হামজার ভাষ্য।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এর আগে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতির অভিযোগে ৯টি মামলা হয়েছিল। এ ছাড়া ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে আরও ছটি দুর্নীতি বা চাঁদাবাজির মামলা করা হয়। এই ১৫টি মামলার মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ সম্পর্কিত ৯টি মামলাই হাইকোর্ট থেকে বাতিল বা খারিজ হয়ে যায়। আর চাঁদাবাজির অভিযোগ সম্পর্কিত চারটি মামলায় বাদী যারা ছিলেন, তারা আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলাগুলো প্রত্যাহার করে নেন। তবে তার বিরুদ্ধে এই প্রথম হত্যা মামলা হলো।
এর আগেও দেশের একাধিক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে বাসে পেট্রোল বোমা ছুড়ে মানুষ হত্যার অভিযোগে বিশেষ ক্ষমতা আইনে করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামি করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে সেনা অভ্যুত্থানে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর চট্টগ্রামে সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল এমএ মঞ্জুরকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় হওয়া মামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির সাবেক চেয়ারম্যান প্রয়াত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে আসামি করা হয়েছিল।