শেখ হাসিনার প্রতি আত্মবিশ্বাস ছিল, তাই দেশ ছাড়েননি অনেক নেতা

টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার পর গত ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। কেন্দ্রীয় নেতা, সংসদ সদস্য (এমপি) ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা কোথায় আছেন, কোথায় গেছেন মানুষের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে এমন আলোচনা। ইতিমধ্যে গণমাধ্যম ও সামাজিক বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে দলটির অনেক কেন্দ্রীয় নেতা, এমপি ও মন্ত্রীদের দেশত্যাগের খবর এসেছে। এসব নেতাকর্মীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন, রাজনৈতিক কর্মী, তাদের বাসভবনের নিরাপত্তাকর্মী, গাড়িচালকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দেশ রূপান্তর জানার চেষ্টা করেছে তাদের কতজন দেশত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছেন। জানা গেছে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে-পরে সব মিলিয়ে ৩০-৩৫ জন দেশ ছাড়ার সুযোগ পেয়েছেন। যদিও দলটির এক নেতা বলছেন, দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতি আত্মবিশ্বাস ছিল যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারবেন তিনি। ফলে অনেক নেতাকর্মীই দেশ ছাড়েননি তখন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের ভেতরে আত্মগোপনে থাকা নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার মানসিক প্রস্তুতিও গ্রহণ করছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, থানাগুলো সচল হলে আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে অনেক আওয়ামী লীগের নেতা নিজ বাসাবাড়িতে ফিরবেন। দল ক্ষমতা হারানোর পর আত্মগোপনে চলে যাওয়ার আওয়ামী লীগের এসব এমপি, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতাদের মূল লক্ষ্য ছিল অরাজক ও অনিশ্চিত ঘটনার মুখোমুখি না পড়া।

একটি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায় থেকে ইতিমধ্যে একটি নির্দেশনা এসেছে, কেউ যেন দেশত্যাগ না করেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসতেও বলা হয়েছে। প্রয়োজনে কারাবরণ করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে শীর্ষপর্যায় থেকে। যদিও এর আগে শীর্ষপর্যায় সবাইকে নিরাপদে থাকতে একটি নির্দেশনার কথা জানা গেছে।

দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে জানা গেছে, কেন্দ্রীয় নেতা, এমপি ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে দেশত্যাগ করার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ২৫-৩০ জন। এর মধ্যে রয়েছেন চার মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। এমপি ১০-১৫ জন ও বাকিরা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা। দেশত্যাগে সক্ষম হওয়া বেশিরভাগ এমপিই সীমান্ত এলাকার। সীমান্ত এলাকার এমপিদের সহযোগিতায় আরও কয়েকজন দেশত্যাগের সুযোগ পেয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। এই সংখ্যার বাইরে আরও ১০-১৫ জন কেন্দ্রীয় নেতা, এমপি ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বিভিন্ন সরকারি কাজে, ব্যক্তিগত ও চিকিৎসার কারণে ৫ আগস্টের আগে দেশের বাইরে যান। তারা আর ফিরে আসেননি।

বিভিন্ন মাধ্যমে পাওয়া তথ্যমতে, সব মিলিয়ে ৩০-৩৫ জন দেশের বাইরে রয়েছেন। আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ হাসিনা প্রবল বিক্ষোভের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেছেন। দেশত্যাগের উপায় খুঁজছেন আত্মগোপনে থাকা সবাই। প্রয়োজন হলে বড় অঙ্কের টাকার বিনিময়ে হলেও চলে যেতে রাজি তাদের অনেকেই।

নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশিরভাগ নেতা দেশেই আত্মগোপনে, নিরাপদ জায়গায় অবস্থান করছেন। এক কর্মী বলেন, দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে ৫ আগস্ট বিকেল সাড়ে ৪টায় তার কথা হয়েছে। কাদের দেশেই আছেন দাবি করেন তিনি। অন্য এক কর্মী বলেন, ওইদিন যা হয়েছে, তা দলের ও সরকারের সব মহলে অকল্পনীয় ছিল। আগের দিন রাতেও সরকার ক্ষমতাচ্যুত হবে কেউ ভাবেননি। ফলে দেশ ছাড়ার ব্যাপারটি মাথাতেই আনেনি দলের কেউই।

আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের মধ্যমসারির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আত্মবিশ্বাসে ঘাটতি ছিল না কারোর মধ্যেই। দলের সভাপতি শেখ হাসিনার প্রতি সবার আত্মবিশ্বাস ছিল যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারবেন তিনি। ফলে দেশ ছাড়ার মতো চিন্তা কারোর ভেতরেই ছিল না। সবকিছু এত অল্প সময়ে ঘটে গেছে যে, দেশত্যাগের সুযোগ ঘটেনি। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সম্পাদকমণ্ডলীর বেশিরভাগ নেতাই নিরাপদ স্থানে আত্মগোপনে রয়েছেন। তার জানা মতে, দেশত্যাগের চেষ্টা অনেকের ভেতরেই রয়েছে। কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার ভয়ে দেশেই এখানে-সেখানে ঘুরে ঘুরে গা-ঢাকা দিয়ে থাকছেন নেতারা।

জানা গেছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও নেতাদের বড় একটি অংশ ঢাকার ভেতরে ও আশপাশে আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্য একটি অংশ ঢাকার বাইরে, যেখানে আওয়ামী লীগ শক্তিশালী, সেই এলাকাগুলোয় অবস্থান করছেন।

আওয়ামী লীগের উপকমিটির এক সদস্য বলেন, নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ করে দিলে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের দফারফার চেষ্টাও করছেন অনেক নেতা। যদিও বিষয়টি অনেক কঠিন হয়ে গেছে এই মুহূর্তে। অন্য একটি সূত্র জানায়, তাদের অনেকেই গণপিটুনিতে মরতে চান না বলে আত্মগোপনে আছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ শুরু করলে, ধরা দিতে চান তাদের তারা।

সূত্র আরও জানায়, আজ হোক কাল হোক গ্রেপ্তার হতে হবে এই প্রস্তুতি সবাই নিয়েছেন সুযোগ ঘটলে চলে যাবেন, না ঘটলে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হবেন। জানা গেছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের একটি বড় অংশ টাকা-পয়সা-সহায় সম্পদ রক্ষারও চেষ্টা চালাচ্ছেন। এগুলো রক্ষার নিশ্চয়তা পেলে অর্থ খরচেও রাজি অনেক নেতা-মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী। সূত্র জানায়, নিরাপদ ও বিশ্বস্ত জায়গা খুঁজছেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও সুবিধা নিয়ে শত শত এবং হাজার কোটির মালিক হয়েছেন যারা, তাদের অনেকেই। এজন্য পটপরিবর্তনের পর প্রভাবশালীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের অনেকেই যোগাযোগ রক্ষা করা উপায় বের করার চেষ্টা করছেন।