এক। গত ১৬ বছরের আগস্ট মাস আর ২০২৪-এর আগস্টের রূপ এক নয়। ইতিহাস এবং কঠিন বাস্তবতা যেন এ বছর এই মাসে ট্র্যাজেডি ও আয়রনিতে মাখামাখি হয়ে সামনে দাঁড়িয়েছে। এ কথা আর মনে করিয়ে দেওয়ার দরকার নেই যে বিরলতম গণ-অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে চেপে বসা আওয়ামী লীগ সরকার বিদায় নিয়েছে। দলটি কেবল রাষ্ট্রক্ষমতার ওপরই চেপে বসেছিল এমন না, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটি ইতিহাসের ওপরও চেপে বসেছিল। যার জাঁতাকলে হাঁসফাঁস করছিল ঐতিহাসিক সত্য।
সে যাই হোক, এই লেখাটি প্রকাশিত হচ্ছে ১৫ আগস্ট। এতদিন জাতীয় শোক দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হতো এবং এই দিনটি ছিল সরকারি ছুটি। পরিবর্তিত বাস্তবতায় ছুটি বাতিল করা হয়েছে, কিন্তু শোক দিবস বাতিল হয়েছে কি না, কিংবা রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হবে কি না সেসব অনিশ্চিত আলাপ। তবে ইতিহাসের এই দিনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তার পুরো পরিবারকে হত্যা করা হয়। আমাদের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের কলঙ্কজনক এক অধ্যায় এটি।
এতদিন পুরো আগস্ট মাস জুড়ে সরকারি, সাংগঠনিক, সামাজিক অনুষ্ঠানাদির আধিক্য যেমন দেখেছি, তেমনি এ বছর কোনো রকম আনুষ্ঠানিকতাহীনতাও চোখে পড়বে। কার্যত মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে নগ্নভাবে এক ব্যক্তি, এক পরিবার, এক দলের বয়ানের মধ্যে কুক্ষিগত করে তোলার প্রয়াসকেই এর দায় নিতে হবে। তবে এ কথা বলতেই হবে যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হোক বা না হোক যেহেতু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা দিবসটি তাদের মতো করে পালন ও ১৫ আগস্টের নিহতদের স্মরণ করতে চায়, তাহলে সেই অধিকার তাদের আছে। কারণ, ব্যাপক রক্তপাতের মধ্য দিয়ে গণ-অভ্যুত্থানে মুখে হাসিনা সরকারের পতন হলেও এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ কোনো নিষিদ্ধ দল নয়। ফলে আওয়ামী লীগ নামের দলটির নেতাকর্মীদের সেই কর্মসূচি শোক প্রকাশ করতে দেওয়া ও ছাত্র আন্দোলন দমনে হত্যাযজ্ঞে দায়ীদের বিচার আলাদা বিষয়। শেখ হাসিনার সরকারের নেতৃত্বে যে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ঘটে গেল, তার আইনানুগ বিচারের দাবিই হবে গণতান্ত্রিক দাবি। কিন্তু, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ১৫ আগস্ট শোক দিবস পালনে বাধা প্রদান গণতান্ত্রিক দাবির মধ্যে পড়ছে না।
দুই। শীর্ষ নেতৃত্বের দেশ ছেড়ে পালানো এবং গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগ আসলে বর্তমানে খেই হারিয়ে ফেলেছে? খেই হারানোরই কথা। পরিস্থিতি এখন তাদের অনুকূলে নেই। রাষ্ট্রীয়, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যে আধিপত্য দিয়ে ইতিহাসের বয়ানের যে মালিকানা আওয়ামী লীগ জারি করতে চেয়েছে সেটা ভেঙে পড়েছে। ফলে দলের বাইরে এবারের শোক দিবস পালিত হবে বলে মনে হয় না। আর জনগণও বাধ্য নয়। কারণ এতদিন জনগণকে বাধ্য হয়ে অনেক কিছু করতে হতো, যার প্রয়োজীয়তা আর নেই। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থেকে আওয়ামী লীগ যে দলীয়ভাবে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে তা এই ছাত্র আন্দোলনে পরিষ্কার। জনগণের পালস তারা বুঝতে পারেন না। মানুষ ১৫ বছরের হিসাব কষছেন। তাদের ‘ন্যায্যতা’ ও ‘সমতা’ খুঁজছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষের রাজনীতি দিয়ে দেশ জুড়ে দুর্নীতি, অপশাসন, ত্রাস ও লুটপাটের রাজ্য কায়েম করেছে। অথচ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটা থেকে আরেকটাকে আলাদা করার কোনো সুযোগ নেই, এটা ইতিহাসের দায়। গত কয়েক বছরে সেটাকে তারা ‘বেহাত’ করে ফেলেছে, অতিতোষণ ও অতিচোষণে। মুক্তিযুদ্ধ কেবল আমাদের অলংকার নয়, অহংকারও। সেটাকে গত কয়েক বছরে ধুয়েমুছে ফেলার চক্রান্ত তো নেতারাই করেছেন। সেখানেও খামতি ছিল না, এটাকে মৌচাকের ঢিল বানিয়ে ক্রমাগত দুর্নীতি করেছেন।
স্বাধীনতা যুদ্ধে সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র বিরোধিতা করেও জামায়াতের রাজনীতিকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে দেশে। যদিও সদ্যবিদায় নেওয়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর কদিন আগে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে যায়। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াত ও তার অঙ্গসংগঠন দলীয় নামেই কর্মসূচি পালন করছে, বিবৃতি দিচ্ছে, রাষ্ট্রীয় বৈঠকে দাওয়াত পাচ্ছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংলাপে দাওয়াত পাচ্ছে। ফলে দলটি নিষিদ্ধ কি না তা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না। মূলত গত ৫৩ বছর ধরে জামায়াতকে নিয়ে কেবল রাজনীতিই করে গিয়েছে দেশের প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। অন্যদিকে, গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পতন হওয়া সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের জাতীয় পার্টিকেও নিষিদ্ধ করা হয়নি। ফলে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখা দল আওয়ামী লীগও শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচার হিসেবে গণ-অভ্যুত্থানে বিদায় নিলেও, আওয়ামী লীগের রাজনীতি বাংলাদেশে থাকবে বলেই মনে হয়। দাবি হচ্ছে, অপরাধের বিচার। এখানে বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে কৃষক হত্যাসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের হত্যাকা-ের কথাও উল্লেখ্য। পরিহাস হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশে যেই দল বা জোটই ক্ষমতাসীন হয়েছে তাদের নেতৃত্বের হাতেই রয়েছে দেশের মানুষের রক্তের দাগ।
তিন। স্বাধীনতার আগে-পরে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য বহু আন্দোলন হয়েছে। স্বৈরাচারের দাপট আমাদের মোকাবিলা করতে হয়েছে বারবার, গণতন্ত্রের লড়াই আমাদের শেষও হয়নি। বর্তমান আন্দোলনকে বুঝতে হলে অতীতে ঘটে যাওয়া গণ-অভ্যুত্থানগুলো বুঝতে হবে। এ অঞ্চলে মোট পাঁচটি অভ্যুত্থান হয়েছে। শুরুর অভ্যুত্থানটি ছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন। দ্বিতীয় গণ-অভ্যুত্থান ১৯৬৯ সালে। তৃতীয়টি ছিল ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে। নব্বইয়ে এরশাদের বিরুদ্ধে চতুর্থ গণ-অভ্যুত্থান। এখন একটি ব্যাপক ও বৃহৎ গণ-অভ্যুত্থান আমরা দেখছি। এ গণ-অভ্যুত্থানের প্রকৃত চরিত্র, কারণ এবং এর সম্ভাব্য পরিণতি কী হতে পারে, এটি বোঝার জন্য এ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে যে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে, সেদিকে তাকাতে হবে। সেটি ছাড়া এ গণ-অভ্যুত্থানকে বোঝার উপায় নেই।
এবারের গণ-অভ্যুত্থান যত ব্যাপক হয়েছে, এর আগে কোনো অভ্যুত্থান এত ব্যাপক কখনো হয়নি। কেবল গণ-অভ্যুত্থানকে বিক্ষোভের আকার বিবেচনায় পরিমাপ করা যায় না। এর মধ্যে জনগণের আকাক্সক্ষা জোরালোভাবে প্রকাশ পাচ্ছে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। সারা দেশে এবং গ্রাম ও শহরে জনমানুষের অংশগ্রহণের যে চিত্র সবাই দেখছি, তার মধ্যে মানুষের ক্ষোভ ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক গতিশীলতা সবকিছুই তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। এখন আর আগের কায়দায় সব সম্পর্ক জারি রাখার সুযোগ নেই।
চার। অভ্যুত্থান-পরবর্তী আন্দোলনকে তরুণরা যেভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, এই মেজাজটা নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে। এটা কেবল কোটা আন্দোলন নয়, বৃহত্তর তরুণ সমাজের রাগ-হতাশা ও তৎপরতার মধ্যে সর্বাত্মক বিরোধিতা চলে এসেছে। এই তরুণরা এখন জাতির মুখপাত্রে পরিণত হয়েছে। তাদের ঘিরে এক ধরনের জাতীয় ঐক্যও ফুটে উঠছে। লেখাটি আগস্ট নিয়ে। ফলে সেখানেই ফিরি। ছাত্র-জনতার আন্দোলন যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই সময় সদ্য বিদায় নেওয়া হাসিনা সরকার রাষ্ট্রীয় শোক পালনের ঘোষণা দিলেন। কিন্তু, দেশ তখন কয়েক শত ছাত্র-জনতার লাশের দগদগে শোক দিয়ে স্বৈরাচার পতনের দাবিতে পয়েন্ট অব নো রিটার্নে দাঁড়িয়ে। ফলে তারা সরকারের এ কর্মসূচি প্রত্যাখ্যান করল। নতুন কর্মসূচি দিল, সর্বজনবিদিত শোকের কালো রঙ অস্বীকার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাল হয়ে গেল প্রোফাইল পিকচার। এটা খুব অভূতপূর্ব ব্যাপার। শহীদের রক্ত, প্রতিবাদ আর দ্রোহের প্রতীক হয়ে উঠল প্রোফাইলের লাল রঙ। দলমত নির্বিশেষে মানুষ এতে সাড়া দিয়েছে। অনেক আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের পরিবার এ আন্দোলনের প্রতি সংহতি জানাচ্ছে। সেটা হয়তো আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক দুর্বলতা। এ দুর্বলতা একদিনে হঠাৎ করে গজিয়ে ওঠেনি। অনেক দিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এখানে নিহিত রয়েছে।
শুধু ছাত্রদের ওপর নির্যাতনের কারণে জনগণ এ আন্দোলনে নেমেছে, এমন নয়। সারা দেশে জনগণের জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী। তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎসহ সবকিছুর দাম বেপরোয়াভাবে বেড়েছে। সরকার জনগণের মতপ্রকাশের ওপর, বাক-স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করেছে। এক অসহনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ায় সরকারের ওপর জনগণের আস্থা নেই।
এ দায় তো এড়ানো সম্ভব নয় আওয়ামী লীগের। তারা যেভাবে ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে, বিরাজনীতিকরণের দিকে দেশকে এগিয়ে নিয়েছে, তার বড় প্রভাব এখানে পড়েছে। ৭৫ বছরের পুরনো দলটির নেতৃত্বের গোঁয়ার্তুমি, ক্ষমতালিপ্সুতা ও ইতিহাসের একবর্গা দখলদারিতে জনতার বিপক্ষে চলে গেল। কোনো মানুষের জন্য এটা সুখকর নয়। প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ল মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু।
পাঁচ। নিঃসন্দেহে ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের অমোচনীয় কলঙ্ক। নিশ্চয় জাতি শ্রদ্ধাভরে বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করবে। একই সঙ্গে ১৭ আগস্ট শামসুর রাহমানের মৃত্যু দিন। তিনি লিখেছেন, ‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’। আজ বেঁচে থাকলে কী লিখতেন, ‘নিজ বাসভূমে পরবাসী স্বদেশ?’ আমাদের এখন দেখতে হচ্ছে- ক্ষমতা দেখিয়ে কল্পনাতীত বাজেটে হাসিনা সরকারের যত্রতত্র করা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হচ্ছে। আগস্ট মাসেই পুড়িয়ে দেওয়া হলো ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু জাদুঘর। প্রশ্ন ওঠে, সবাইকে বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর অতিমূল্যায়নই আজকের এই অবমূল্যায়নের কারণ কি না! ইতিহাস তো শুধু মার খাওয়ার নয়, আমাদের ইতিহাস হিসাব নেওয়ার, আমাদের ইতিহাস দ্রোহেরও। আশা করি সেই ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু ও ১৫ আগস্টকে তরুণরাই খুঁজে নেবে।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক
emonn.habib@gmail.com