সংকট আইনের নয়, দর্শনের

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩২ এএম

ফরাসি রাষ্ট্রচিন্তা ও ইতিহাসবিদ অ্যালেক্সিস দ্য টকভিল বলেছিলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় যেমন জ্ঞান ও বিজ্ঞানের বুনিয়াদ তৈরি করে, স্থানীয় সরকারও তেমনি নাগরিকের মনে গণতন্ত্রের প্রথম বীজ বপন করে।’ বস্তুত নাগরিক প্রথম রাষ্ট্রকে চিনতে শেখে জাতীয় সংসদ বা সচিবালয়ের মাধ্যমে নয় বরং ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা কিংবা সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে। এদিক থেকে স্থানীয় সরকারকে কেবল একটি প্রশাসনিক স্তর নয়; বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে আস্থার প্রথম সেতুবন্ধন বলা যায়। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতারা এই দর্শন গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন, তাই সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারকে বিকেন্দ্রীভূত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন। এর উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা রাজধানীর গ-ি ভেদ করে প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ রাখা, স্থানীয় মানুষকে নিজেদের উন্নয়নের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশীদার করা এবং জবাবদিহিমূলক শাসন নিশ্চিত করা। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পর ও সচেতন নাগরিকদের মনে একটা মৌলিক প্রশ্ন জাগে ‘আমরা কি সত্যিকারের অর্থে একটা কার্যকর স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি, নাকি কেবল স্থানীয় সরকারের একটি প্রশাসনিক কাঠামো নির্মাণ করেছি মাত্র।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশে স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে বড় সংকট আইনের নয়, সংকট এর দর্শনের। বর্তমান বাস্তবতার পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রচর্চার একটা গভীর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। এটা সত্য যে, স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের সংস্কার হয়েছে। উপজেলা ব্যবস্থা চালু হয়েছে, পুনর্গঠিত হয়েছে; সিটি করপোরেশনের পরিধি ও সংখ্যা বেড়েছে; প্রণীত হয়েছে বিভিন্ন আইন ও বিধিমালা। এসব উদ্যোগের অধিকাংশই স্থানীয় সরকারের কাঠামোগত সম্প্রসারণে অবদান রাখলেও ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রকৃতপক্ষে, বিকেন্দ্রীকরণ কেবল দায়িত্ব বণ্টনের বিষয় নয়; এটি ক্ষমতার পুনর্বিন্যাসের একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। যখন নির্বাচিত স্থানীয় প্রতিনিধিরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কর্তৃত্ব ভোগ করেন, তখনই বিকেন্দ্রীকরণ অর্থবহ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় সব সরকারের মধ্যেই একটি বিষয় লক্ষণীয়ভাবে মিল ছিল যে, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের প্রতি তাদের সবার ছিল প্রচ- রাজনৈতিক অনীহা। এই অনীহার কারণে প্রায় প্রতিটি সরকারই, স্থানীয় সরকারকে গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে পরিচালিত না করে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্প্রসারিত প্রশাসনিক শাখা হিসেবে পরিচালিত করে এসেছে। আর এই কারণেই এদেশে স্থানীয় সরকারের কাঠামো নির্মিত হয়েছে, কিন্তু তার আত্মা বিকশিত হয়নি।

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের উৎসাহ-উদ্দীপনা বেশ লক্ষ্য করার মতো। যদি তাদের এই উৎসাহ প্রতিষ্ঠানটিকে স্বাধীন ও স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে দেখা যেত তবে নাগরিকদের এত অরণ্য রোদন করতে হতো না। তাই, আজ প্রশ্নটি কেবল স্থানীয় সরকারের কার্যকারিতা নিয়ে নয়; প্রশ্নটি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও। গণতন্ত্রের ভিত্তি যদি স্থানীয় পর্যায়ে দুর্বল হয়, তবে জাতীয় পর্যায়ের গণতন্ত্রও দীর্ঘমেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি, জবাবদিহি এবং জনঅংশগ্রহণের ক্ষমতা হারাতে বাধ্য। যার প্রত্যক্ষ ফল ২০২৪-এর অভ্যুত্থানে প্রত্যক্ষ করেছি আমরা সবাই। রাজনৈতিক তাত্ত্বিক হান্না পিটকিনের মতে, ‘প্রকৃত প্রতিনিধিত্বের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা।’ একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি কেবল জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেই যথেষ্ট নয়, তার সিদ্ধান্ত ও কর্মকা-ে জনগণের প্রয়োজন ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হয়। আমাদের স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে এই প্রতিনিধিত্ব পালনে অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বলতা লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থার সংকটের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা হলো এর রাজনৈতিক অর্থনীতি। কারণ এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা অনেক সময় আইন, নীতিমালা বা প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার চেয়ে বেশি নির্ভর করে ক্ষমতার অদৃশ্য সম্পর্ক, পৃষ্ঠপোষকতামূলক নেটওয়ার্ক এবং দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবের ওপর। ফলে একজন জনপ্রতিনিধির নাগরিকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বা প্রশাসনিক দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ও ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে তার সম্পর্ক অধিক, গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় ধরে চলমান এই সংস্কৃতিতে স্থানীয় সরকার গণমানুষের প্রতিষ্ঠান হওয়ার বদলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিণত হয়। উন্নয়ন প্রকল্পের অগ্রাধিকার, সম্পদ বণ্টন কিংবা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নাগরিকের প্রয়োজনের পরিবর্তে রাজনৈতিক সমীকরণ ও দলীয় স্বার্থ অনেক সময় মুখ্য হয়ে উঠার রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু হয়। ফলে স্থানীয় সরকারের মৌলিক চরিত্র ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়ে নাগরিককেন্দ্রিক শাসনের বদলে ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রশাসনিক ব্যবস্থার রূপ নেয়। এই ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি স্থানীয় সরকারকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। কারণ দীর্ঘ সময় ধরে এদেশে রাজনীতির উদ্দেশ্য ছিল জনস্বার্থের পরিবর্তে ক্ষমতা ধরে রাখা, প্রভাব বিস্তার করা এবং দলীয় স্বার্থ রক্ষা করা। এমন পরিবেশ যোগ্য ও জনমুখী নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ সংকুচিত করে দেয়। যার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে গণতান্ত্রিক চর্চার ওপর। জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির কেন্দ্র ধীরে ধীরে জনগণের পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও দলীয় বলয়ের দিকে স্থানান্তরিত হয়। এতে স্থানীয় সরকার জনগণের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটানোর পরিবর্তে ক্ষমতার কাঠামো টিকিয়ে রাখার একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে। সংরক্ষিত নারী প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রে এই সংকট আরও স্পষ্ট।

দীর্ঘদিনের বিভিন্ন গবেষণায় প্রতীয়মান হয় যে, তারা আইনগতভাবে নির্বাচিত হলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় সমান অংশীদার হতে পারেন না। তাদের দায়িত্ব আছে কিন্তু ক্ষমতা নেই। ফলে তাদের রাজনৈতিক উপস্থিতি অনেক ক্ষেত্রেই প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। যা সুস্পষ্টভাবে স্থানীয় সরকারের অন্তর্নিহিত প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের প্রতিফলন। স্থানীয় সরকারের আরেকটি মৌলিক সংকট হলো এর আর্থিক নির্ভরশীলতা। একটি কার্যকর স্থানীয় সরকারব্যবস্থার পূর্বশর্ত হলো নিজস্ব রাজস্বের ব্যবস্থা কিন্তু বাংলাদেশে অধিকাংশ স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীল।

২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালীন স্থানীয় সরকার সংস্কারের উদ্যোগ আলোচনার সিংহভাগই কেবল নিয়মকানুন ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বরাবরের মতোই উপেক্ষিত ছিল ক্ষমতার প্রকৃত বিকেন্দ্রীকরণ, আর্থিক স্বাধীনতা এবং জনগণের প্রতিনিধিদের কার্যকর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মতো মূল প্রশ্নগুলো। ভারত, ব্রাজিল ও নর্ডিক দেশগুলোর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে যে, স্থানীয় সরকারকে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কর্তৃত্ব, আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা প্রদান করলে জনসেবা আরও কার্যকর হয়, নাগরিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায় এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী হয়। এসব দেশের অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট যে, বিকেন্দ্রীকরণ তখনই সফল হয়, যখন ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্রীয় সরকারের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও গণতন্ত্রকে গভীরতর করার একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করলে। (নর্ডিক দেশ বলতে আমরা জানি, উত্তর ইউরোপ এবং উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি অঞ্চল, যার প্রধান পাঁচটি দেশ হলো ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড এবং আইসল্যান্ড। এ ছাড়াও নরওয়ে ও সুইডেন। এই দেশগুলোর সঙ্গে কিছু স্বশাসিত অঞ্চল যেমন গ্রিনল্যান্ড ও ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জ যুক্ত রয়েছে।)

মহাত্মা গান্ধীর ভাষায়, ‘প্রকৃত গণতন্ত্র কেন্দ্রে বসে থাকা কয়েকজন মানুষের দ্বারা পরিচালিত হতে পারে না; এটি গড়ে উঠে নিচ থেকে, মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে।’ বাংলাদেশেও স্থানীয় সরকারকে কেবল কেন্দ্রীয় সরকারের একটি প্রশাসনিক কাঠামো হিসেবে নয়, বরং গণতন্ত্রের মৌলিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কারণ রাজধানীকেন্দ্রিক রাষ্ট্র শাসন কার্যক্রম পরিচালনা করলে, শক্তিশালী গণতন্ত্র নির্মাণ করা যায় না।

জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছাতে হলে স্বশাসিত, কার্যকর, গতিশীল স্থানীয় সরকারের বিকল্প নেই। একটি দেশ ও সমাজে কার্যকর স্থানীয় সরকার তৃণমূল থেকে গণতন্ত্রকে সুসংহত করে।

গণতন্ত্রের শিকড় যত গভীরে স্থানীয় পর্যায়ে প্রোথিত হবে, জাতীয় গণতন্ত্রও তত বেশি স্থিতিশীল, অংশগ্রহণমূলক, টেকসই ও জবাবদিহিমূলক হবে। তাই স্থানীয় সরকারকে রাষ্ট্রের প্রান্তিক প্রতিষ্ঠান নয়, গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে পুনর্বিবেচনা করার বিকল্প নেই। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নাগরিক হিসেবে সরকারের কাছে একটি মৌলিক প্রশ্ন রাখতে চাই সরকার কি স্থানীয় সরকারকে সত্যিকার অর্থে জনগণের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে চায়, নাকি কেন্দ্রীয় ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক সম্প্রসারণ হিসেবেই রেখে দিতে চায়? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কতটা অংশগ্রহণমূলক, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হবে।

পরিশেষে স্মরণ করি, খ্যাতিমান  ব্রিটিশ রাজনীতি, ইতিহাস ও আইনবিদ যিনি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ওপর লেখা ‘দ্য আমেরিকান কমনওয়েলথ’ বইটির জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত সেই লর্ড ব্রাইসকে। তিনি বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের সর্বোত্তম পাঠশালা হলো স্থানীয় স্বায়ত্তশাসন।’ 

লেখক : স্থানীয় সরকারবিষয়ক গবেষক ও শিক্ষক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত