ক্যান্টিনের অর্ধকোটি টাকা ছাত্রলীগ নেতাদের পেটে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হলগুলোতে টানা ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে আধিপত্য ছিল সম্প্রতি ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগের ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন ছাত্রলীগের। এ সময়ে হলগুলোতে নানান অনিয়ম হলেও ভয়ে মুখ খোলেননি কেউই। আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের ফাও খাওয়া ও বাকি খাওয়ার খবর পাওয়া যেত মাঝেমধ্যে। তবে এবার দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রায় অর্ধকোটি টাকা বাকি খেয়েছেন সরকার পতনের পর লাপাত্তা হওয়া ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। আর এতে অনেকটা দিশেহারা ক্যান্টিন ও দোকান মালিকরা। এ টাকা পাওয়ার আশায় দিন গুনছেন তারা। তবে কেউ কেউ বাকি টাকা পরিশোধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেদের ১০টি হলে অনুসন্ধানের প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিভিন্ন হলের ক্যান্টিন ও দোকান থেকে প্রায় ৪৯ লাখ টাকা বাকি খেয়েছেন ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া ৫ লাখ টাকার বেশি ফাও খেয়ে চলে গেছেন বলে অভিযোগ করেছেন মালিকরা। বাকি রাখা সবাই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও হল শাখার নেতাকর্মী। হলের শিক্ষার্থীরা বলছেন, ছাত্রলীগের এমন বাকি খাওয়া ও চাঁদাবাজি করার কারণে ক্যান্টিন মালিক খাবারের দাম বাড়িয়েছেন এবং খাবারের মান খারাপ করেছেন। যার ফল ভোগ করেছেন হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ টাকা ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবি জানান তারা।

শুধু স্যার এএফ রহমান হলের ক্যান্টিনে ছাত্রলীগ নেতাদের বাকির পরিমাণ ১৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বলে দাবি করেছেন হলের ক্যান্টিন মালিক। এর মধ্যে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি রিয়াজুল ইসলাম রিয়াজ ও সাধারণ সম্পাদক মুনেম শাহরিয়ার মুন দুজনের কাছেই পাওনা পৌনে ৬ লাখ টাকার মতো। এ ছাড়া ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশী আলী আহসান রিফাত ১ লাখ ১৮ হাজার, ছাত্রলীগ নেতা রবি ১ লাখ ১৮ হাজার, নাহিদ ও জুয়েল ১ লাখ ১৫ হাজার করে, উচ্ছল ৮৫ হাজার, হারুন ৭০ হাজার টাকা বাকি খেয়েছেন। তালিকায় ৪৮ জন ছাত্রলীগ নেতার নাম রয়েছে, যাদের কাছে ১৭ লাখ ৯৩ হাজার টাকা পাওনা।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের কবি জসীমউদদীন হলের ক্যান্টিনে চার মাসে ১ লাখ ২৩ হাজার টাকা বাকি খেয়েছেন ছাত্রলীগ শীর্ষ পদপ্রত্যাশী নেতারা। বাকি খাওয়ার একটা তালিকা এসেছে দেশ রূপান্তরের হাতে। সে তালিকা থেকে হিসাব করে দেখা যায়, চার মাসে ১ লাখ ২৩ হাজার ৩০০ টাকা বাকি খেয়েছেন ছাত্রলীগের ১১ জন নেতা। যার মধ্যে একজন হল ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও ছয়জন শীর্ষ পদপ্রত্যাশী ছিলেন। দোকানগুলোসহ এই হলে বাকির পরিমাণ ২ লাখ টাকা। মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের দুটি ক্যান্টিন ও দোকানে প্রায় ৪ লাখ টাকা বকেয়া রাখেন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। একটি ক্যান্টিনে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দামের অনুসারী তৌহিদ হোসেন অপূর্বের বকেয়া ৪৮ হাজার ৩৫, সাধারণ সম্পাদক ইনানের অনুসারী মাসুদ আমজাদের বকেয়া ২৬ হাজার ৪৬০ টাকা। তার আরেক অনুসারী আবদুল্লাহর বাকি ২৬ হাজার ২৬০ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সূর্য সেন হলের ক্যান্টিন ও দোকানে বাকি রেখেছেন সাড়ে ৩ লাখ, বিজয় একাত্তর হলের ক্যান্টিন ও দোকান মিলে প্রায় ৫ লাখ, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ক্যান্টিন ও দোকানে ২ লাখ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের ক্যান্টিন ও দোকানে আড়াই লাখ, হাজী মুহাম্মদ মহসিন হলের দোকানে ২ লাখ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, ফজলুল হক মুসলিম হল ও আমার একুশে হলে প্রায় ৫ লাখ এবং আইবিএ ক্যান্টিনের ৫ লাখ টাকা বাকি খেয়েছেন।

ছাত্রলীগ সূত্রে জানা যায়, বাকি খাওয়া সবাই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয়, ঢাবি ও হল ছাত্রলীগের নেতা এবং কয়েকজন হল ছাত্রলীগের শীর্ষ পদপ্রত্যাশী ও বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী। বাকি খাওয়া বেশিরভাগই কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান, ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়ন এবং সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকতের অনুসারী।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এএফ রহমান হলের এক ক্যান্টিনকর্মী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রলীগ নেতারা ইচ্ছেমতো খেয়ে চলে যেত। টাকা-পয়সা তাদের কাছে চাওয়া যেত না। চাইলেও অনেকে ধমক দিত। সাধারণ সম্পাদক মুনের জন্য নিয়মিত বিশেষ রান্না করা হতো।

এএফ রহমান হলের ক্যান্টিন মালিক বাবুল মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা আমার ক্যান্টিন থেকে ১৭ লাখ টাকার বেশি বাকি খেয়েছেন। আমাকে একদম পথে বসিয়ে দিয়েছেন তারা। আমরা গরিব মানুষ, ১ লাখ টাকাও তো অনেক বেশি। যেভাবে হোক আমার এ টাকা ফেরত চাই। আপনারাও একটু সহযোগিতা করুন।’

এতদিন কেন প্রকাশ করেননি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ছাত্রলীগের ক্ষমতার কাছে আমরা অসহায়। ভয়ে কিছুই বলতে পারতাম না। প্রভোস্ট স্যারসহ অন্যরা জিজ্ঞেস করলেও না বলতাম। কেননা প্রকাশ করলেই আর ব্যবসা করতে পারতাম না।’

সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের দোকানদার আজগর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘হল ছাত্রলীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ছাত্রলীগের নেতারা প্রায় ২ লাখ টাকা বকেয়া রেখেছেন। কয়েকজনকে টাকার কথা বলাই যেত না। বললেই গালাগালি করতেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ক্যান্টিন মালিক বলেন, প্রতিদিন অন্তত ৬০টা খাবার ফ্রিতেই চলে যেত। কাউকে কিছু বললে রাজনৈতিক প্রভাব দেখাত। এভাবেই চলছে কয়েক বছর। প্রায় প্রত্যেক হলেই এ চিত্র বলে জানান তিনি। অন্তত ৫ লাখ টাকা ফাও খাওয়াতেই গেছে বলে জানান তিনি।

শহীদুল্লাহ হলের ক্যান্টিন মালিক হাজি সাইদুল হোসেন জানান, তিনি ক্যান্টিন নেওয়ার সময় নেতাদের দিতে হয়েছে ৭ লাখ টাকা, এ ছাড়া ১৫ হাজার টাকা করে প্রতি মাসে দেওয়া লাগত। বাকিও রেখে গেছেন ৫০ হাজার টাকার বেশি।

জানতে চাইলে জসিমউদদীন হল ছাত্রলীগ নেতা অপু বলেন, ‘আমি চলে আসার আগে ৫ হাজার টাকা মতো বাকি ছিল, দিয়ে আসছি। আর কোনো টাকা আমার বাকি নেই। শুধু শুধু এ টাকার দায় দেওয়া হচ্ছে আমার ওপর।’

রাশেদুজ্জামান রনি বলেন, ‘বাকি আছে। তবে আমি সেটা দিয়ে দেব। যে পরিস্থিতিতে আমরা বের হয়ে আসছি তখন টাকা দেওয়ার মতো অবস্থা ছিল না। আমি কথা বলে খুব তাড়াতাড়ি টাকা দিয়ে দেব।’

এএফ রহমান হলের এক ছাত্রলীগ নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি, সেটা বলব না। তবে একটু বেশি হয়তো ক্যান্টিন মালিক বলেছেন। অনেকে জেলা, উপজেলা থেকে নেতাকর্মী এলে খাওয়াত আর নিজেরা টাকা না দিয়ে খেত।’

এ বিষয়ে জানতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ইনান, ঢাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মাজহারুল কবির শয়নের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এ ছাড়া তানভীর হাসান সৈকত গ্রেপ্তার আছেন।

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমরাও বিষয়টি জেনেছি। এটি অত্যন্ত নিন্দনীয়। এ টাকা ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থা করা জরুরি। আর এখন থেকে এ ধরনের কোনো সংস্কৃতি আর চলবে না।’

এএফ রহমান হলের আবাসিক শিক্ষক মুমিত আল রশিদ বলেন, ‘ক্যান্টিন মালিক বাবুল মিয়া বিষয়টি আমাকে অবহিত করেছেন। আমাদের হল প্রভোস্টকেও বিষয়টি জানিয়েছেন এবং একটি তালিকা দিয়েছেন।’

এএফ রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. রফিক শাহরিয়ার বলেন, ‘আমিও বিষয়টি দেখেছি। আমার কাছে সে অভিযোগ দেয়নি। এর আগেও আমি ক্যান্টিন ঘুরে তার খাবার মান নিয়ে জিজ্ঞেস করেছি, তার কাছে কেউ বাকি খায় কি না জানতে চেয়েছি। কিন্তু সে বরাবরই আমাকে বলেছে তার কাছে কেউ বাকি খায় না। আমি তাকে নেতাদের নাম দিতে বলেছিলাম, সে দেয়নি।’

তিনি বলেন, ‘এত টাকা বাকি খেলে সে কীভাবে ক্যান্টিন পরিচালনা করেছে আমি জানি না। সে আগের প্রভোস্টের কাছে কোনো অভিযোগ দিয়েছিল কি না, সেটাও দেখতে হবে। এত টাকা বাকি থাকার পরও সে কীভাবে ক্যান্টিন চালিয়েছে সেটাও দেখার বিষয়। তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।’