সংসারের দুঃখ দূর করা হলো না ইমনের

যমুনা নদীর ভাঙনের শিকার হয়ে বসতভিটা নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার পর পাশর্^বর্তী গোপালপুর উপজেলার হেমনগর ইউনিয়নের নলিন গ্রামের তার নানা কিতাব আলী শেখের বাড়িতে আশ্রয় নেয় ইমনের পরিবার। ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় ইমনের বয়স ছিল ১০। ভ্যানচালক বাবা জুলহাস হোসেন তখন মারা যান। মা রিনা বেগম মানুষের বাসায় কাজ করে সন্তানদের বড় করেন। ইমনকে নিয়ে অনেক আশা ছিল তার। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় হওয়ায় অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরতে হয় ইমনকে। টিউশনি করে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি সংসার চালিয়ে ছোট তিন ভাইবোনকেও স্কুলে ভর্তি করান। ইমন স্বপ্ন দেখতেন, একদিন সংসারের দুঃখ দূর করবেন। কিন্তু হলো না। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের গুলি বিদ্ধ হয় তার পেটে। ১৪ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে গতকাল রবিবার হার মানতে হলো তাকে।

ইমন টাঙ্গাইলের মনিরুজ্জামান খান বিএম কলেজের ছাত্র ছিলেন। গতকাল সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। এ নিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতায় ৫৩১ জন মারা গেছেন।

ইমনের সহপাঠী ইমরান জানান, টাঙ্গাইলের হেমনগর ইউনিয়নের ছাত্র অধিকার পরিষদের সমন্বয়ক ছিলেন ইমন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকেই সামনের সারিতে ছিলেন তিনি। ৪ আগস্ট বিকেলে টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের গোরাইয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। এ সময় পুলিশের একটি গুলি ইমনের বুকে আঘাত করে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায়। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় প্রথমে তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে হাসপাতালের আইসিইউর সামনে জ্ঞান হারান মা রিনা বেগম। স্বজনরা তাকে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা করান। ছেলের চিকিৎসার ব্যয় বহনে এরই মধ্যে সহায় সম্বল বিক্রি করেছেন। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না।

আমদের টাঙ্গাইল প্রতিনিধি আহমেদ রাসেল জানান, ইমনের নানা ও দাদার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে প্রতিবেশীরা ভিড় করছেন এবং স্বজনরা আহাজারি করছেন। ইমনের প্রতিবেশী বন্ধু রনি, রঞ্জু, সাইফুল, শাকিব, অন্তর, হৃদয়, ইমরান, রুবেল, নয়ন ও আশিক জানান, ইমন অনেক ভালো মনের মানুষ ছিলেন। পুরো পরিবার তার ওপর নির্ভরশীল। তিনি মারা যাওয়ায় সংসারের হাল ধরার আর কেউ রইল না। ইমনকে হারিয়ে পরিবারটি এখন একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেল।

ইমনের প্রথম জানাজা ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং নিজ গ্রামের নলিন আদর্শ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে দ্বিতীয় জানাজা শেষে দাদার বাড়ির পাশের একটি কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়েছে।

ইমনের মৃত্যুর খবরে গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দা ইয়াসমিন সুলতানা তার স্বজনদের সমবেদনা জানান।